আগামী অর্থবছরের বাজেট হোক নারীবান্ধব। এমনটাই প্রত্যাশা সবার। নারীদের জন্য উদ্যোক্তা বান্ধব বাজেট প্রণয়নের দাবি নারী উদ্যোক্তাদের। এর মধ্যে রয়েছে নতুনদের জন্য বিশেষ প্রণোদনার পাশপাশি সুদের হার এক অঙ্কের ঘরে রাখা ও বিশেষায়িত ব্যাংক প্রতিষ্ঠা। এছাড়া নারীদের জন্য আলাদা শিল্প পার্ক স্থাপনেরও তাগিদ দিয়েছেন বিভিন্ন নারী উদ্যোক্তা। দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদের একটি বড় অংশ নারী। তাই দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাদের অংশগ্রহণ বাড়াতে গত বাজেটে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য আলাদা বরাদ্দ রাখা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ কিছুটা কমিয়ে ৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয় সরকার। কিন্তু নানা কারণে অর্থবছরের একেবারে শেষ মুহূর্তে অর্থছাড় করায় এর সুফল ভোগ করতে পারেনি তৃণমূল পর্যায়ের নারী উদ্যোক্তারা। তাই আগামীতে এ বরাদ্দ বহাল রাখার পাশাপাশি দ্রুত অর্থছাড়ের ওপর জোর দিচ্ছেন নারী উদ্যোক্তারা। এছাড়া নারী উদ্যোক্তাদের আয়করের সীমা বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মেলায় বিশেষ সুবিধারও দাবি করছেন তারা।
একাধিক উদ্যোক্তা বলেন, যখন ফান্ড হবে সেটা যেন বছরের শুরুতেই রিলিজ হয়ে যায়। তাহলে আমরা ১শ’ কোটি টাকা দিয়ে মহিলাদের জন্য অনেক কাজ করতে পারবো। আমরা চাচ্ছি যে, সাড়ে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত আমাদের ক্রয়সীমা ধার্য করা হোক। তারপরে যেটা আসবে তখন আমরা কর দিতে চাই। বাজেটে ই-কমার্সের জন্য একটা স্পেস রাখা দরকার।
আসছে বাজেটে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়ক ব্যবসা-বান্ধব বাজেট প্রণয়নের দাবি নারী উদ্যোক্তাদের। এছাড়া নারী উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা এডিপির আওতায় আনারও তাগিদ তাদের। এফবিসিসিআইয়ের এক নেত্রী বলেন, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য একটি শিল্প পার্ক খুবই দরকার। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য আলাদা একটি ব্যাংক দরকার। আমি আশাবাদী, নারীরাও খুব তত্পর যে একটা ব্যাংক তারা করবে। নারী উদ্যোক্তাদের উন্নয়নের ধারাটা যদি এডিপির আওতায় চলে আসে তাহলে আমি আশা করি যে, নারী উদ্যোক্তাদের সামগ্রিক উন্নয়নের বিষয়টি একটি পদ্ধতিগতভাবে লক্ষ্য রাখা হবে। তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বাজেটে বরাদ্দ দেয়া থেকে শুরু করে এ অর্থ ব্যবহারের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সাথে নারীর সম্পৃক্ততা আরও বাড়ানো উচিত। তবেই এর দ্বারা উপকৃত হবেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি নারী উদ্যোক্তারা।
এছাড়া নারী উন্নয়ন নীতি বাস্তবায়ন করতে হলে বাজেটেও তার প্রতিফলন থাকতে হবে। নারীর উন্নয়ন ও জাতীয় বাজেটের ব্যাপারে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক এক উপদেষ্টা জানান, বাস্তবতা হচ্ছে, অঙ্গীকারে একরকম আর অর্থ বরাদ্দ, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম এবং এসব ক্ষেত্রে নারীর অগ্রাধিকার থাকছে না। নারীর উন্নয়নে সবগুলো বিনিয়োগ কমানো হলো। বিনিয়োগ কমানোর আগে সরকারের দেখা দরকার প্রকৃত অর্থে নারী উন্নয়নে কোথায়, কোন্ জায়গায় অগ্রাধিকার এসেছে। অনেক ক্ষেত্রেই জাতীয় বাজেটে নারীর জন্য গ্রহণ করা প্রকল্পগুলোর উদ্দেশ্য ও কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নারীর প্রয়োজনের বাস্তব মিল থাকে না। আমরা মিল চাই। চাই চাওয়া অনুযায়ী পাওয়া পেতে। এক্ষেত্রে সবার আগে প্রয়োজন নারী বান্ধব বাজেট করা। কেননা, নারী নতুন মত, নতুন পথ ধরে হেঁটে চলেছে।
অন্যদিকে একজন নারী নেত্রী জানান, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। এই বিশাল জনগোষ্ঠী শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, সম্পদের মালিকানা, নীতি-নির্ধারণ ও রাজনীতিতে অংশগ্রহণ ও শ্রমের মূল্যায়নসহ সকল ক্ষেত্রে ব্যাপক বৈষম্যের শিকার। এই বৈষম্য দূরীকরণে নারীর জন্য সরকারি প্রণোদনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই নারীর ক্ষমতায়নে ও নারী উন্নয়নে নারীর জন্য সুনির্দিষ্ট বাজেট সময়ের দাবি।
নারী উন্নয়ন নীতিতে নারীর ক্ষমতায়নের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, সেখানে পৌঁছতে হলে নারীর প্রজননভার কমিয়ে এনে সামাজিক ও উপার্জনমূলক কর্মকাণ্ডে তাদের কার্যকর অংশগ্রহণের লক্ষ্যে স্বাবলম্বী নাগরিক হিসাবে বিকাশে নারীর জন্য সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। এজন্য জরুরি ভিত্তিতে নারীবান্ধব জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ও সেবা, স্বাস্থ্যসেবা এবং শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রের মতো কার্যক্রম প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সর্বত্র যাতে মানসম্পন্ন ও নিরাপদ জন্মনিয়ন্ত্রণ সেবা সহজলভ্য হয় সে ব্যাপারেও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। এমডিজি দলিলে ২০১৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যুর হার প্রতি লক্ষে ১৪৪ জনে নামিয়ে আনবার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ এই লক্ষ্য অর্জনে অনেকটা পিছিয়ে আছে।
ছবি: শামসুদ্দিন আহমেদ চারু ও সুজন মন্ডল
