প্রথমেই সবাইকে ধন্যবাদ। আমার গ্র্যাজুয়েশনের দিনের কথা মনে পড়ার আগ পর্যন্ত এই গ্র্যাজুয়েশন অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দেয়াটাকে খুব কঠিন আর দায়িত্বপূর্ণ মনে হচ্ছিল। আমার গ্রাজুয়েশন অনুষ্ঠানে দেয়া ব্রিটিশ দার্শনিক ব্যারোনেস মেরী ওয়ারনকের একটা কথাও আজ মনে নেই। তাই আমি এটুকু নিশ্চিত যে, আমার আজকের বক্তৃতা অন্তত তোমাদের রাজনীতি, ব্যবসা কিংবা আইন ছেড়ে জাদুকর হতে প্ররোচনা দেবে না।
আমার গ্রাজুয়েশন একুশ বছর আগে শেষ করেছি, তাই তোমাদের সামনে কী কথা বলবো তা হাতড়ে বেড়িয়েছি বেশ কিছু দিন। শেষ পর্যন্ত দুটি উত্তর পেয়েছি। তোমাদের সাফল্য উদযাপনের দিনে আজ আমরা জীবনে ব্যর্থ হওয়ার গুরুত্ব সম্পর্কে জানাবো। তোমাদের বাস্তব জীবনে কল্পনা শক্তির প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে শোনাবো তোমাদের। ছোট বেলা থেকেই আমার অতি কল্পনাশক্তি বাবা-মা’র কাছে হাস্যকর মনে হয়েছিল। আমার মা-বাবা শিক্ষিত নন এবং প্রচণ্ড গরিব। ফলে তাদের বিবেচনায় আমার এই কল্পনাশক্তি দিয়ে না যাবে পেনশন যোগানো, না ধার শোধ করা! আমার ইংরেজি সাহিত্য পছন্দ, তাদের কারিগরি ডিগ্রি। শেষ পর্যন্ত আমি পড়েছি আধুনিক ভাষা নিয়ে।
আমি আমার বাবা মাকে নিয়ে সমালোচনা করছি না। আমরা ছিলাম গরিব, অভাব নিত্যসঙ্গী। অভাবের সাথে আসে ভয়-ভীতি, দুশ্চিন্তা, মানসিক চাপ। নিজের চেষ্টায় অভাবকে জয় করা নিঃসন্দেহে গর্বের, কিন্তু দারিদ্র্য নিয়ে কল্পনাবিলাসু সেটা কেবল বোকাদের পক্ষেই সম্ভব। তবে একটা বয়সে নিজের সিদ্ধান্ত নিজেকেই নিতে হয়। আমি অভাবকে ভয় পায়নি, ভয় পেয়েছি ব্যর্থতাকে। ক্লাসের লেকচার না শুনলেও পাস করেছি ঠিকই। ক্লাসের লেকচারের সময় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমি কফি বারে বসে গল্প লিখতাম। তোমরা হার্ভার্ডে পড়েছো, বয়সে তরুণ, আর শিক্ষিত। তাই বলে তোমরা কখনো ব্যর্থতার মুখোমুখি হওনি, এমনটা ভাবার মতো বোকা আমি নই। ব্যর্থতার ভয়, আর সাফল্যের আকাঙ্ক্ষা এ দুটো তোমাদের মাঝে সমানভাবেই আছে।
ব্যর্থতা নিজেকেই উপলব্ধি করতে হয়। গ্র্যাজুয়েশনের সাত বছরের মাঝেই আমি শিকার হয়েছি বিশাল এক ব্যর্থতার। বিয়ে করলাম, ভেঙে গেলো, চাকরিটা গেলো, একটা ছোট্ট মেয়ে আমার কোলে- মা বাবার ধারণাই যেন সঠিক হল। তখন আমি পৃথিবীর সবচাইতে ব্যর্থ মানুষ! আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর সময়। ব্যর্থতা কখনই আনন্দের ব্যাপার নয়, তবে তোমাদের ব্যর্থতার গুণগান শুনাচ্ছি কেন? কারণ, ব্যর্থতা জীবন থেকে অপ্রয়োজনীয় সবকিছু ঝেড়ে ফেলতে সাহায্য করে। ওই সময়টাতে ব্যর্থতার উপলব্ধি থেকেই একমাত্র আদরের মেয়ে, একটা পুরনো টাইপরাইটার আর দারুণ সব আইডিয়া এসবের ওপরেই আমার নতুন জীবনের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেছিলাম। আমার মতো এতো ব্যর্থতা হয়তো তোমাদের জীবনে আসবে না, কিন্তু ব্যর্থতাকে তুমি পাশ কাটিয়ে যেতে পারবে না। মানুষের জীবনে ব্যর্থতা আপনা আপনিই চলে আসে।
ব্যর্থতা আমাকে যা দিয়েছে, ক্লাসের পরীক্ষা তা দিতে পারেনি। ব্যর্থতা আমাকে দিয়েছে দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি, আশাতীত শৃঙ্খলাবোধ আর অসাধারণ কিছু বন্ধু। খারাপ সময় তোমাকে টিকে থাকার ক্ষমতা দিবে। ব্যর্থ না হলে কখনোই তুমি নিজেকে ভালোভাবে চিনতে পারবে না। ব্যর্থতা সইতে কষ্ট হলেও, তার পুরস্কার অতি মূল্যবান। জীবনের সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতার তালিকা খুঁজে বের করতে পারলেই ব্যক্তিগত সুখের সন্ধান মিলবে। যদিও আমার এই কথা অনেকেই গুলিয়ে ফেলতে পারে। কারণ জীবন জটিল এবং আমাদের নিয়ন্ত্রণের আওতাধীন নয়। তবে ব্যর্থতা মেনে নেয়ার শক্তিই তোমাকে জীবনে উত্থান পতনগুলো মোকাবিলার শক্তি যোগাবে। আমি বক্তব্য শেষ করবো। তবে তোমাদের কাছে একটাই চাওয়া, তোমরা একে অপরের ভালো বন্ধু হও। যেমনটি আমি পেয়েছি ২১ বছর বয়সে। তাঁরা সব সময় আমার পাশে থেকেছে। আমার জীবনের উত্থান পতন সব সময়ই আমার বন্ধুরা আমার সাথে ছিল। আজ তোমাদের জন্য অমন বন্ধুত্বের চাইতে ভালো আর কিছু চাওয়ার নেই আমার। সকলের সফল জীবন কামনা করছি। সবাইকে অনেক ধন্যবাদ।
(সংক্ষেপিত)..................................
