যে লাউ সেই কদু!

আপডেট : ০১ জুন ২০১৪, ২১:৫২
ঘুরেফিরে সেই ‘সেনাশাসন’। পিরামিড এবং বিশ্বের প্রাচীন সভ্যতার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত মিসরে ২০১১ সালে রক্তের বিনিময়ে যখন স্বৈরশাসক হিসেবে পরিচিত হোসনি মোবারকের পতন ঘটে তখন গণতন্ত্রমনা মিসরবাসীর মনে আশা জেগেছিল এইবার হয়তো মিসরে সত্যিকার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হবে। তাদের অর্থনৈতিক দূরবস্থা তথা বহুকালের সামাজিক-সাংস্কৃতিক দুর্দশা ঘুচবে। তারা আবার তাদের হারিয়ে যাওয়া স্বাধীনতা ফিরে পাবে। কিন্তু তাদের সেই আশা গুড়েবালি। মোবারকের পর মোহম্মদ মুরসি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হলেন। কিন্তু জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় মাত্র ১৩ মাসের মাথায়ই বিদায়। মিসরের জনগণের ভাগ্যটাই এ রকম। স্বৈরশাসককে হটিয়ে আবার সেই স্বৈরশাসকের কবলেই তাদের পড়তে হলো। তবে এটা মিসরে নতুন নয়। অনেক আগে থেকেই মিসরে এই প্রথা চলমান এবং এই আধুনিক যুগেও সেটা শুরু হলো। এ যেন নতুন বোতলে পুরানো মদ। অর্থাত্ শাসন ব্যবস্থা একই, কেবল ব্যক্তির পরিবর্তন! কেন বার বার সেনাবাহিনী ১৯৫২ সালে মিসরে এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর জেনারেল মোহাম্মদ নাগিব ক্ষমতায় আসেন। সেই থেকে শুরু। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি সেনাবাহিনীকে। হয় সরাসরি না হয় বেসামরিক প্রশাসনকে সমর্থন দিয়ে ক্ষমতার কলকাঠি নেড়েছে সেনাবাহিনী। মাত্র দুই বছরের মাথায় ক্ষমতা কুক্ষিগত করেন গামাল আবদেল নাসের। তার ক্ষমতারও মূল উত্স ছিল সেনাবাহিনী। এরপর আসেন আনোয়ার সাদাত। তার ক্ষমতায় টিকে থাকার ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর একটা সমর্থন ছিল। তবে ইসরাইলের সঙ্গে ক্যাম্প ডেভিড তথা শান্তি চুক্তি করার মূল্য জীবন দিয়ে দিতে হয়। এরপর ক্ষমতায় আসেন হোসনি মোবারক। ১৯৬৭ সাল থেকে মিসরে জরুরি অবস্থা জারি ছিল। মোবারক এসেও সেই জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার করেননি। সেনাবাহিনীকে সমস্ত সুযোগ-সুবিধা দিয়েই ক্ষমতায় টিকে থাকেন মোবারক। তিউনিশিয়ার আন্দোলনের উত্সাহে জেগে ওঠে মিসরবাসী। তারা তাহরির স্কয়ারকে আন্দোলনের মূল কেন্দ্র হিসেবে বেছে নেয়। মানুষের মনের আকাঙ্ক্ষা বুঝতে পারে সেনাবাহিনী। তাইতো মোবারকের ওপর থেকে সেনাবাহিনী সমর্থন প্রত্যাহার করে। পতন হয় বেসামরিক শাসনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা স্বৈরাচারী এক শাসকের। আশায় বুক বাঁধে মানুষ। সেনাবাহিনী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করে। ক্ষমতায় টিকে আকাঙ্ক্ষা থাকলেও আবারো গণআন্দোলনে নির্বাচন দিতে বাধ্য হয় সেনাবাহিনী। এরপর নির্বাচনে জয়লাভ করে ক্ষমতার মসনদে আরোহণ করেন ইসলামপন্থী দল মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতা মোহাম্মদ মুরসি। নির্বাচিত হয়েই মুরসি ঘোষণা দেন, মিসর এখন সবার। সবার মতামতকে প্রাধান্য দেয়া হবে। গণতন্ত্র শক্তিশালী করা হবে। কিন্তু তিনি সেই কথা রাখেননি। কয়েক মাসের মাথায় সংবিধান সংশোধন করে প্রেসিডেন্ট নিজের ক্ষমতা বাড়িয়ে নেন। ক্ষেপে যায় মিসরের জনগণ। ইসলামপন্থিসহ বিভিন্ন বাম ও ধর্মনিরপেক্ষ দল আন্দোলনে নেমে পড়ে। আবার সেই পুরানো ঠিকানা তাহরির স্কয়ার। আবার মুরসির পতন হয় গত বছরের জুলাইয়ে। তবে ব্রাদারহুডের মতে, গণআন্দোলনে নয়, সেনা অভ্যুত্থানেই মুরসির সরকারের সমাপ্তি ঘটে। যদিও সেনাবাহিনী বরাবরই রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের কথা অস্বীকার করে আসছে। গঠিত হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। সরকার নির্বাচনী রোডম্যাপ তৈরি করে। আইন অনুযায়ী পার্লামেন্ট নির্বাচন আগে হওয়ার কথা। কিন্তু চলতি বছরের জানুয়ারিতে সংবিধান সংশোধন এই সুযোগ রহিত করা হয়। আগে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়। সংবিধানে একজন একটানা দুই বারের বেশি প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না বলে এমন ধারা সংযুক্ত করা হয়। সিসি তার সমর্থনের গণমাধ্যম ছাড়া সবগুলোই নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন। বিশেষ করে ব্রাদারহুডের সমর্থিত গণমাধ্যম। অবশেষে ক্ষমতায় আসছেন সেনাবাহিনীর সাবেক প্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি। তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার জন্যই সেনাবাহিনীর প্রধানের পদ থেকে অবসর নেন। গত জানুয়ারিতে দেশটির সংবিধানে আবার পরিবর্তন আনা হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে সেনাক্ষমতা। সেনাবাহিনীর অনুমতি ছাড়া কোনো প্রতিরক্ষামন্ত্রী নিয়োগ করতে পারবে না সরকার। এমনকি প্রতিরক্ষামন্ত্রী সেনাবাহিনীর মধ্যেই কাউকে হতে হবে। এমনকি আইন, শাসন ও বিচার বিভাগেরও ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে সেনাবাহিনী। মিসরে সিসির প্রতি জনসমর্থন যতোটা না আছে তার চেয়ে বেশি আছে প্রাতিষ্ঠানিক। সেনাবাহিনীসহ ব্যবসায়ীদের একটি বিরাট অংশ সিসিকে সমর্থন দেয়। আছে আদালতের একটা অংশের সমর্থনও। বিশ্লেষকের মতে, মিসরে গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা এখনো কল্পনাবিলাস! নির্বাচন নিয়ে নানা প্রশ্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী ব্যক্তি আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি জনসম্মুখে একটি সভাও করেননি। কোনো নির্বাচনী প্রচারণাও চালাননি। কেবল কিছু সাক্ষাত্কার এবং অভ্যন্তরীণ সভা করেছেন। তাও আবার কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে। নির্বাচনী প্রচারণাটাই চলেছে গোপনে! সিসি ৫৪ মিলিয়ন নিবন্ধিত ভোটারের মধ্যে ৪০ মিলিয়ন ভোটারের সমর্থন পেতে চেয়েছিলেন। তাহলে তিনি হয়তো সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থনের বিষয়টি দেখাতে পারতেন। ২৫ মিলিয়ন ভোটার ভোট দিয়েছে। ২০১২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় ৫২ শতাংশ ভোট পড়েছিল। আর এবার ৪৬ শতাংশ। আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের তথ্য অনুসারে ৯৬ দশমিক ২ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। তাঁর একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী সাবাহি পেয়েছেন ৩ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট। গত ২৬ ও ২৭ মে তারিখ দেশটিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু দুই দিনে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ভোট না পড়ায় ভোট গ্রহণের সময়সীমা আরও এক দিন বাড়ানো হয়। নির্বাচন কমিটির একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নির্বাচনে দুই কোটি ৫০ লাখ ভোটার ভোট দিয়েছেন; যা মোট ভোটারের ৪৬ শতাংশ। দেশটির মোট ভোটার পাঁচ কোটি ৪০ লাখ। ভোট শেষ হওয়ার পরও নির্বাচনের সময় বাড়ানোর কারণে নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পর্যবেক্ষক সংস্থা ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল জানায়, নির্বাচন কর্মকর্তার স্বাধীনতা, সরকারের নিরপেক্ষতা এবং মিসরের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সমন্বয় নিয়ে অনেক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট প্রার্থী সাবাহিও সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। বামপন্থি রাজনীতিবিদ হামদিন সাবাহি জানান, তিনি ২০১২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তৃতীয় অবস্থানে ছিলেন। তিনি এবারও নির্বাচন করছেন। কিন্তু তিনি প্রচারণা ঠিকমতো চালাতে পারছেন না। নানা বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। এটা ভাল নয়। কিন্তু তারপরও তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াননি। আদর্শগত দিক থেকে আমি মোকাবেলা করছি। কারণ তিনি ছাত্রজীবন থেকেই নির্বাচন করছেন। প্রকৃত গণতন্ত্র পেতে আমাদের আমাদের সংগ্রাম করতে হবে এবং গণতন্ত্রের একটা অংশ আমাদের হস্তগত করতে হবে। পশ্চিমা বিশ্বের নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী মূল সংস্থাগুলোই পর্যবেক্ষণ করেনি। মার্কিন কার্টার সেন্টার পর্যন্ত নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেনি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন কেবল নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেছে। আরবলীগও প্রায় একশ’র মতো পর্যবেক্ষক পাঠিয়েছে। আফ্রিকান ইউনিয়নের পক্ষ থেকেও কিছু পাঠানো হয়েছে। ক্ষমতার লোভের মূল্য দিচ্ছে জনগণ মিসরে আর যাই হোক গণতন্ত্রের প্রতি তাদের তেমন একটা আগ্রহ নেই বলেই মনে হয়। গ্রামের অধিকাংশ মানুষই দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করে। সামপ্রতিক বছরগুলোতে রাজনৈতিক পরিবর্তন জনগণের ভাগ্যের তেমন একটা পরিবর্তন আনতে পারেনি। দেশটির ভবিষ্যত্ প্রেসিডেন্টের জন্য তাদের সমস্যার এক বড় তালিকা তারা তৈরি করেছেন। খুব কম সময়ই বিদ্যুত্ থাকে। এমনও সময় আছে যে শহরে একটানা চারদিন পানি থাকে না। এমদাদ নামের ২৭ বছর বয়সী নাগরিক জানান, তার পরিস্থিতি এমন খারাপ যে অর্থের অভাবে তিনি বিয়ে করতে পারছেন না। তাই তিনি ভোট দিতেও যাননি। কারণ তিনি ভোট প্রদানকে খুব একটা গুরুত্ব দেন না। তিনি কেন ভোট দেবে সেটাই বুঝতে পারেন না বলেও উল্লেখ করেন এমদাদ। তাই কাউকে দিয়েই তাদের আর আশা নেই। সামপ্রতিক মাসগুলোতে প্রায় এক হাজার নিহত এবং ২০ হাজার আটক হয়েছেন যাদের বেশিরভাগই ইসলামপন্থি। মোবারকের শাসনের অবসান ঘটাতে যারা মূল ভূমিকায় ছিলেন তাদের বেশিরভাগই আটক আছেন। পারবেন কি সিসি? নতুন প্রেসিডেন্ট সিসিকে ভঙ্গুর অর্থনীতি, সন্ত্রাস এবং বিভক্ত জাতির মুখোমুখি হতে হবে। পশ্চিমা কূটনৈতিকদের মতে, মিসরে উদ্বেগের অনেক কিছু্ই রয়েছে। সিসি ইসলামপন্থী এবং ধর্মনিরপেক্ষ অনেকের ওপর অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করেছেন। নির্বিচারে অনেককে হত্যা করা হয়েছে। মুসলিম ব্রাদারহুডের সমর্থকদের গণহারে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। এগুলো সিসিকে কাটিয়ে উঠতে হবে। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ড. এইচএ হেলার জানান, সিসি চায় আন্তর্জাতিক সমর্থন। সেটা পেলে হয়তো তার জন্য কিছুটা সুবিধা হবে। তিনি বলেছেন, তিনি নির্বাচনের পর তার ভিন্ন বিষয়ে মনোযোগ দেয়ার সুযোগ আছে। তিনি কৃষি, শিক্ষা, আবাসন এবং কর্মসংস্থানে ব্যাপক পরিবর্তন আনবেন। কিভাবে তহবিল সংগ্রহ করা যায় সেই বিষয়ে নজর দিচ্ছেন সিসি। তিনি রাষ্ট্রের এবং বেসরকারি কোম্পানির মুনাফা কমিয়ে দেবেন। তিনি তার নির্বাচনী প্রচারের শ্লোগান দিয়েছেন, ‘মিসর দীর্ঘজীবী হোক’। কিন্তু এরকম কোনো শুভসংকেত এখনো পাওয়া যায়নি। অধিকাংশ মিসরবাসী মনে করছেন, তাদের আর একটা রাজা ফারাওয়ের সম্মুখীন হতে হবে। তাই বিশেষজ্ঞরা হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন, সিসি যদি অর্থনীতির যথাযথ উন্নত না করতে পারেন তাহলে এক অথবা দুই বছর পর আবার গণঅভ্যুত্থানের পরিস্থিতি মিসরবাসী তথা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দেখতে হবে। এই দেশটির সমস্যা সমাধানের জন্য আলাদীনের কোনো চেরাগ নেই। তবে মিসরবাসীর একটা অভ্যাস আছে। সেটা হলো প্রতিবাদ করার। নতুন প্রেসিডেন্ট যদি তাদের এই দুঃসহ জীবন পরিবর্তন করতে না পারেন তাহলে তাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে যাবে এবং আবার হয়তো তাদের ঠিকানা হবে তাহরির স্কয়ার।