ভারত-পাকিস্তানের সম্পর্কের বরফ গলছে! ভারতের নতুন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর শপথ অনুষ্ঠানে পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের যোগদান ও পরেরদিন ফলপ্রসূ বৈঠকের দাবির পর এমনটা অনেকেই মনে করছেন। বিস্তারিত তথ্য জানা সম্ভব না হলেও এটা সত্যি যে দীর্ঘদিন পর দুই পরমাণু শক্তিধর প্রতিবেশী দেশের উচ্চপর্যায়ের এই বৈঠকে সদিচ্ছামূলক মনোভাবের পরিচয় মিলেছে। ২০০৮ সালে ২৬ নভেম্বরের আগ পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যে কম-বেশি সংলাপ চালু ছিলো। বিরোধপূর্ণ ইস্যুগুলোর নিষ্পত্তিতে দুই দেশের মধ্যে কিছুটা হলেও আগ্রহ ছিলো। কিন্তু মুম্বাইয়ে সন্ত্রাসী হামলার কারণে দুই দেশের সম্পর্কে ভাটা পড়ে। এ হামলার জন্য ভারত বরাবরই পাকিস্তানের জঙ্গি সংগঠনকে দায়ী করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আহবান জানিয়েছে। পাকিস্তান এ বিষয়ে ভারতের কাছে তথ্য-প্রমাণ চেয়েছে। কিন্তু সন্দেহভাজনদের বিচারে গুরুত্বপূর্ণ তেমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। যে কারণে এই ঘটনার পর থেকে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান বিরোধপূর্ণ ইস্যুও নিরসনে তেমন কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। বরং তিনবার যুদ্ধে জড়ানো দেশ দু’টির সম্পর্কে কোনো কোনো ক্ষেত্রে তিক্ততা আরো বেড়েছে।
পাকিস্তানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ ক্ষমতায় আসার আগে অঙ্গীকার করেছিলেন তিনি ভারতের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে জোর চেষ্টা চালাবেন। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের পর ভারতে তিনি আমন্ত্রণ পাননি। এবার সে সুযোগটাই করে দিলেন নতুন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। প্রথমবারের মতো ভারতের কোনো প্রধানমন্ত্রীর শপথ অনুষ্ঠানে অন্য রাষ্ট্রের সরকার প্রধানদের আমন্ত্রণ জানানো হলো। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে যোগদানের জন্য সার্কভুক্ত দেশের নেতাদের আমন্ত্রণের জন্য আগ্রহ দেখান মোদী নিজেই। শেষ পর্যন্ত সেই আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে ২৬ মে নরেন্দ্র মোদীর শপথ গ্রহণের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফও। বলা হচ্ছে, ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর চিরবৈরী এই দুই দেশের মধ্যে এই প্রথমবার এমন ঘটনা ঘটছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেতা নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় আসার পর এ অঞ্চলের মুসলিমদের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি বা অনাস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এই অনাস্থা কাটাতেই শপথ অনুষ্ঠানে মোদী সার্কভুক্ত দেশের নেতাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। যদিও তার মূল উদ্দেশ্য ছিলো মুসলিম প্রধান পাকিস্তান ও বাংলাদেশ! কিন্তু এই দুই দেশকে আমন্ত্রণ জানালে বিষয়টি সবার নজরে পড়তো। যে কারণে মোদী সার্ক অঞ্চলের রাষ্ট্রপ্রধানদের সবাইকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
নিরাপত্তা ইস্যুর পাশাপাশি দু’পক্ষই বাণিজ্য নিয়েও আলোচনা করেছে এবং প্রধানমন্ত্রী মোদী বলেছেন, দু’দেশ অবিলম্বে বাণিজ্য সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে এগোতে পারে। লোকসভা নির্বাচনে মোদীর বিজয় নিশ্চিত হওয়ার পর তাকে অভিনন্দন জানান নওয়াজ শরীফ। দু’দেশের সম্পর্ক জোরদারের আশাবাদী মধ্য-ডানপন্থি এই নেতা। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, ডানপন্থি বিজেপির সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ির সঙ্গে তাঁর কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। এর আগে দ্বিতীয় দফায় নওয়াজ যখন ক্ষমতায় ছিলেন, ভারতে তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন বাজপেয়ি। ১৯৯৯ সালে তিনি বাসে চেপে লাহোর গিয়েছিলেন একটি শান্তিচুক্তি সই করতে।
বাজপেয়ির পর কংগ্রেস সরকার দুই মেয়াদে ক্ষমতায় থাকলেও দু’দেশের সম্পর্কের পালে হাওয়া লাগেনি। দিল্লির সাপ্তাহিক মেইনস্ট্রিম পত্রিকার সম্পাদক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক সুমিত চক্রবর্তী সম্প্রতি বিবিসিকে বলেন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ অবশ্যই তাত্পর্যপূর্ণ একটি ঘটনা। মোদী নেতা হিসেবে পাকিস্তান বিরোধী বলেই পরিচিত। তারপরও তিনি যে প্রতিবেশীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক চান এই আমন্ত্রণে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। বিজেপি সরকার আসলে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো হবে না এটা ভাবার কোনো কারণ নেই।
