প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, জিয়াউর রহমান বেঁচে থাকলে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলার আসামি হতেন। কারণ বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা ছিল। আর তাই বঙ্গবন্ধুর খুনী মোশতাক ক্ষমতায় গিয়ে জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধান বানিয়েছিলেন। জিয়া মরে গিয়ে বিচারের হাত থেকে বেঁচে গেছেন বলে তিনি জানান।
গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় গণভবনে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ ও সংসদীয় দলের এক যৌথ সভায় সূচনা বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর এটাই আওয়ামী লীগের সবপর্যায়ের নীতিনির্ধারক নেতাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম যৌথ বৈঠক।
বিগত সংসদ নির্বাচন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অনুষ্ঠান নিয়ে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের সাম্প্রতিক সমালোচনার জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ড. কামাল ১৯৭০ ও ৭৩’র নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর ছেড়ে দেয়া আসন থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। আর এখন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন, আদালতে ওকালতি করছেন। কিন্তু বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচনের বিষয়টি আইনসম্মত।
প্রধানমন্ত্রী কথিত সুশীল সমাজের কিছু প্রতিনিধির সমালোচনা করে বলেন, দেশের কিছু চিন্তাবিদ আছেন দেশের কোন ভাল কাজই যাদের চোখে পড়ে না। অসাংবিধানিক ও অগণতান্ত্রিক শক্তি ক্ষমতায় আসলে কদর বাড়ে, টাই-কোট পড়ে ভালই গুরুত্ব পান। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সব শ্রেণি-পেশার মানুষ নির্যাতনের শিকার হলেও তারা ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ‘টেককেয়ারে’। তখন তাদের অনেক গুরুত্ব ছিল। গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে জনগণের গুরুত্ব বাড়ে, তাদের গুরুত্ব কমে। তাই গণতান্ত্রিক শাসনামলে তাদের কোন কিছুই ভাল লাগে না। মানুষ ভাল থাকলে তাদের গায়ে জ্বালা করে। অগণতান্ত্রিক ও অসাংবিধানিক সরকার আসলেই তারা স্যুট-কোর্ট নিয়ে রেডি থাকেন। তারা এখন চিন্তার খোরাক খুঁজে না পেয়ে অন্যদিকে যাচ্ছেন। শুধু সরকারের ছিদ্র খুঁজতে থাকেন। কিন্তু যে যতই সমালোচনা বা চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র করুক, বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। দেশের এই অগ্রযাত্রা কেউ বাধাগ্রস্ত করতে পারবে না। সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উন্নয়ন কাজ যাতে যথাযথভাবে হয় সেজন্য প্রত্যেককে তার নিজ নিজ এলাকায় তদারকি করতে হবে। মানুষের সুখ-দুঃখের সাথী হতে হবে, তাদের আস্থা অর্জন করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারের সফলতা জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর সূচনা বক্তব্যের পর তার সভাপতিত্বে নেতৃবৃন্দের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয়। সূত্র জানায়, রুদ্ধদ্বার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রী-নেতা-এমপিদের উদ্দেশে কঠোর হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করে বলেন, কোন ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ডে কেউ জড়িত হয়ে পড়লে সে যত বড়ই নেতা হোন না কেন, কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না। দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নকারী কারোরই আওয়ামী লীগে স্থান হবে না। তিনি সম্মেলনের মাধ্যমে সারাদেশে কমিটি পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রীয় নেতাদের সহযোগিতা করার জন্যও দলীয় সংসদ সদস্যদের প্রতি নির্দেশ দেন।
পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০১ সালে আমরা পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেও বিএনপি ক্ষমতায় এসে তা বন্ধ করে দেয়। এবার নির্মাণ কাজ শুরু করার আগেই শুরু হয় নানা ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত। সরকার ও আমার পরিবারকে হেয় করতে পদ্মা সেতু নিয়ে অনেক ষড়যন্ত্র চলেছে। আমরা সকল ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত মোকাবিলা করেই নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু করেছি। যারা পদ্মা সেতু নিয়ে সরকার ও আমার পরিবারকে অসম্মান করার চেষ্টা করেছিল তারা ব্যর্থ হয়েছে, আমরা সফল হয়েছি। পদ্মা সেতুও সম্পন্ন হবে ইনশাল্লাহ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপির অনেকে বলে জিয়া নাকি বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা! অস্ত্রহাতে সায়েমকে হটিয়ে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের পর প্রতি রাতে কারফিউ দিয়ে দেশ চালিয়েছেন এই জিয়াউর রহমান। জিয়া গণতন্ত্র নয়, কারফিউ গণতন্ত্র দেশবাসীকে উপহার দিয়েছিলেন। অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে তিনি ১৯টি ক্যুর মাধ্যমে হাজার হাজার সেনাবাহিনীর অফিসার ও সৈনিককে হত্যা করেছেন। অবৈধভাবে শুধু ক্ষমতা দখলই নয়, অবৈধভাবে বিএনপিরও জন্ম দেন। দেশের হত্যা-ক্যু ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতিরও জন্মদাতা এই জিয়া। যে দলেরই জন্ম অবৈধ, তারা সবকিছুতে অবৈধ দেখবে এটাই স্বাভাবিক। বর্তমান সরকারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপনকারীদের কঠোর সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শত ষড়যন্ত্র, নির্বিচারে মানুষ হত্যা, ধ্বংসযজ্ঞ-নাশকতা চালিয়েও ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ঠেকাতে পারেনি। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও ৪০ ভাগেরও বেশি ভোটার নির্বাচনে ভোট দিয়েছে। অবৈধভাবে অস্ত্রহাতে ক্ষমতা দখল তাদের কাছে অবৈধ হয় না, ৪০ ভাগেরও বেশি ভোট পড়ার নির্বাচন তাদের কাছে অবৈধ হয়! আসলে এরা জ্ঞানপাপী।
বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়া প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, কোন দল নির্বাচনে আসবে কী আসবে না, এটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ব্যাপার। আমরা গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল বলেই নির্বাচনে অংশ নিয়েছি। কোন আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না থাকলে নির্বাচন হবে কীভাবে? প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না থাকলে একমাত্র প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করাই তো নির্বাচন কমিশনের আইন। তিনি বলেন, আদালতের রায় ও নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত অংশ নিতে পারেনি। নির্বাচনে স্বাধীনতা বিরোধী দোসর নেই, এই দুঃখে-কষ্টে বিএনপি নেত্রী বেগম জিয়া নির্বাচনে আসেননি।
গণমাধ্যমের কিছুৃ কিছু ভূমিকার সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগে কোন বেসরকারি টিভি চ্যানেল ছিল না। আওয়ামী লীগ স্বাধীন গণমাধ্যমে বিশ্বাস করে বলেই এতোগুলো টিভি চ্যানেলের অনুমতি দিয়েছে। বহু মানুষের চাকরির সংস্থান হয়েছে, সাংবাদিকদেরও কদর বেড়েছে। কিন্তু ওইসব টিভি চ্যানেলে টকশো’র নামে যে যা ইচ্ছা বলে যাচ্ছে। প্রতিদিন আমাদের পেছনে লেগেই আছে। হাসতে হাসতে তিনি বলেন, উপকারীকে বাঘ খাওয়া প্রবাদের মতোই হয়েছে আমাদের অবস্থা।
সূত্র জানায়, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন - কিছু লোক আছে যারা যে দলের সরকার ক্ষমতায় থাকে সেই দলেরই হয়ে যায়। এরা মূলত স্থায়ী সরকার পার্টির লোক হিসেবে পরিচিত। এদের ব্যাপারে সকলকে সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী যেই হোক তাকে রক্ষা করা হবে না।
যৌথ সভার মূল মঞ্চে অন্যান্যের মধ্যে সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, সাহারা খাতুন, সতীশ চন্দ্র রায়, চিফ হুইপ আসম ফিরোজসহ প্রায় সকল সংসদ সদস্যই উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে সবাইকে নৈশভোজে আপ্যায়িত করা হয়।
