মফস্বলের কলেজগুলোতে শিক্ষক সংকটের সহসা সমাধান হচ্ছে না। পদের চেয়ে সাড়ে তিন হাজার শিক্ষক কম। এছাড়া অবসরে যাচ্ছেন শিক্ষক, শূন্য হচ্ছে পদ। সংযুক্তির মাধ্যমে রাজধানীর ১১ কলেজ, ৭ বিভাগীয় শহরের কলেজ, শিক্ষা অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্পে প্রায় ৭শ’ শিক্ষক সংযুক্ত রয়েছেন। এছাড়া ‘ইনসিট্যু’ রয়েছেন প্রায় ৫শ। এসব শিক্ষককে দেশের বিভিন্ন কলেজে বদলি করা হলে কোন কলেজ কোন বিষয় একেবারেই শূন্য হতো না। অথচ ২০-এর অধিক কলেজ রয়েছে যেখানে কোনো কোনো বিষয়ে একজন শিক্ষকও নেই। আর নতুন পদ সৃষ্টি না করেও নতুন কলেজ সরকারি করা হচ্ছে। গ্রামের কোনো কোনো কলেজ খালি করে নতুন ওই কলেজেও শিক্ষক দেয়া হচ্ছে। এসব কারণে সংকট সমাধানের পরিবর্তে আরো ঘনীভূত হচ্ছে।
একাধিক কলেজের অধ্যক্ষ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, শিক্ষার মান পিছিয়ে যাচ্ছে, এ ক্ষেত্রে দায় নিতে হবে মন্ত্রণালয়কে। বছরের পর বছর ধরে একজন শিক্ষক ছাড়াই কোনো কোনো বিভাগ চলছে। সমাধান হবে না, এটা হতে পারে না। এছাড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয় আন্তরিক হলে শিক্ষায় বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ নিতে পারে। তারা বলেন, কলেজে শিক্ষার অব্যবস্থাপনা দূর করতে না পারলে শিক্ষার মান পিছিয়ে যেতে বাধ্য।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) শিক্ষার মানে আপস করতে না চাইলে সংকট কিছুটা হলেও সমাধান সম্ভব। মাউশি’র মহাপরিচালক অধ্যাপক ফাহিমা খাতুন এ প্রসঙ্গে ইত্তেফাককে বলেন, শিক্ষকরা সংযুক্ত হয়ে আসার কারণে কোনো কোনো কলেজ শিক্ষকশূন্য হয়ে পড়ছে— এমন খবর পাচ্ছি। তবে সংযুক্তি অধিদপ্তর করে না, করে মন্ত্রণালয়। তিনি বলেন, একজন শিক্ষক প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি কলেজে কতদিন থাকবেন এ বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন। তিনি বলেন, ৩৩তম বিসিএসের মাধ্যমে ১ হাজার প্রভাষক নিয়োগ দেয়া হবে। তখন কলেজগুলোতে শিক্ষক সংকট কিছুটা হলেও দূর হবে।
বর্তমানে সরকারি কলেজগুলোতে ১৫ হাজার পদের মধ্যে সাড়ে ৩ হাজার শিক্ষকের পদ শূন্য আছে। শূন্য পদের মধ্যে বাংলায় ২৩৯, ইংরেজিতে ১৯১, রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ১৬৬, ব্যবস্থাপনায় ১৭৫, দর্শনে ১২২, অর্থনীতিতে ১৮৩, হিসাব বিজ্ঞানে ১২৬, প্রাণী বিদ্যায় ৫১, ইতিহাসে ৭৬, সমাজকল্যাণে ৪৮, রসায়নে ১৩২, ইসলাম শিক্ষায় ৩২, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে ১৮৮, পদার্থবিদ্যায় ১৮৮, উদ্ভিদবিদ্যায় ৭০, সমাজবিজ্ঞানে ২৪, গণিতে ১শ, ভূগোলে ২০, আল কোরআনে ৩, মৃত্তিকাবিজ্ঞানে ১০, আরবী ও ইসলাম শিক্ষায় ৭, মার্কেটিংয়ে ২৪, মনোবিজ্ঞানে ১১, কৃষিবিজ্ঞানে ১৯, জীববিজ্ঞানে ৭, আল হাদিসে ৪, পরিসংখ্যানে ১০, আল-আকাইদে ১, সংস্কৃততে ১১, গার্হস্থ্য অর্থনীতিতে ৬, আল-ফিকাহ্ ১, আরবী ৩, পালি ২, উর্দু ৪, কম্পিউটার ৭, ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং ১৭, আত-তাফসিরে ২ জন শিক্ষক রয়েছেন।
কলেজের অধ্যক্ষরা জানিয়েছেন, শিক্ষক সংকট ও অব্যবস্থাপনা কমাতে হবে। তদ্বিরের কারণে শিক্ষকরা উপজেলা পর্যায়ের কলেজে থাকছেন না, ঢাকা বা বিভাগীয় শহরের কলেজগুলোতে চলে যাচ্ছেন, এ প্রবণতা রোধে মন্ত্রণালয়কে কঠোর হতে হবে। মাউশির এক কর্মকর্তা বলেন, শিক্ষকদের বড় কলেজ ও রাজধানীতে আসার ক্ষেত্রে কঠোর নীতিমালা করতে হবে। কিছু বদলির আবেদনে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, সচিব, মন্ত্রীর পিএস-এর ভিজিটিং কার্ড সংযুক্ত করে দেয়া হয়। কোনো কোনো বদলির আবেদনে মন্ত্রীর লিখিত সুপারিশও দেয়া হয়। কখনো ফোন করেন। এ কারণে সুপারিশ না মেনে পারা যায় না। তবে এর সুযোগও নিচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাউশির কিছু কর্মকর্তা। তারা অনেক সময় বদলি বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েন।
ঢাকায় বা বড় কলেজে বদলি বা সংযুক্ত হবার জন্য আর্থিক লেনদেন হয়, এমন অভিযোগ রয়েছে। মাউশির পরিচালক (কলেজ) অধ্যাপক আতাউর রহমান বলেন, গ্রামের কলেজে শিক্ষকরা থাকতে চান না, এটা ঠিক। তবে এ অবস্থার উত্তরণ দরকার। আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
