১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দ। বিলেতের একটি জমজমাট ফুটবল খেলার মাঠ। অনেক দলই খেলায় অংশ নেবে। ভারত থেকেও একটি দল খেলায় অংশগ্রহণের জন্য গেছে। যথাসময়ে খেলা শুরু হলো। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভারত গ্রেট ব্রিটেনকে ৪-১ গোলে পরাজিত করলো। ভারতীয় খেলোয়াড়দের সেকি আনন্দ! জয়ের খবর পেয়ে উপমহাদেশের খেলাপ্রেমী মানুষরা দলের সবাইকে অভিনন্দন জানালো। অধিনায়ককে সবাই বাহবা দিলেন। শুধু ওই খেলাটিই নয়, সেবার ভারতীয় দলটি ইউরোপীয় টিমকে ২-১ গোলে পরাজিত করেছিলো। চতুর্দিকে ভারতীয় দলের জয়-জয়কার। এরপর আর একটি খেলা অনুষ্ঠিত হয়েছিলো ইংল্যান্ডের সার্ভিসেস একাদশের বিপক্ষে। সে খেলায়ও অসাধারণ ক্রীড়া নৈপুণ্য দেখিয়েছিলো ভারতীয় দল। সেবার ইংল্যান্ডবাসী ভারতীয় দলের অধিনায়ককে ফুলের মালা পরিয়েছিলো। সুখ্যাতি করেছিলো এই অধিনায়কের। হ্যাঁ, এই অধিনায়ক হলেন সামাদ। তাঁর পুরো নাম সৈয়দ আবদুস সামাদ। ফুটবলের জগতে তিনি জাদুকর আবদুস সামাদ নামে সুপরিচিত। জীবনের শেষ খেলায় তাঁর খেলা দেখে বিলেতের তত্কালীন সেরা খেলোয়াড় কম্পটন বলেছিলেন— ধারণা ছিলো না এমন খেলোয়াড় এদেশে দেখতে পাবো। ইংল্যান্ডের কৃতি ফুটবলার এলেক হোসি একবার বলেছিলেন— বিশ্বমানের যে কোন ফুটবল দলে খেলার যোগ্যতা আছে সামাদের। সামাদ সিংহল, সিংগাপুর, হংকং, ইন্দোনেশিয়া, চীন, বার্মা, অস্ট্রেলিয়া এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ফুটবল খেলায় অংশ নিয়েছেন।
ঊনিশ শতকের গোড়ার দিকে অপূর্ব ক্রীড়াশৈলী প্রদর্শন করে জাদুকর সামাদ ফুটবল জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। তার খেলার জীবন ২৩ বছর। ১৮৯৫ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। এই সময় তিনি ভারতীয় দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে খেলেছেন। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে উপমহাদেশ বিভক্ত হলে ভারত থেকে সামাদ পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন এবং রেলওয়ে বিভাগে চাকরি নিয়ে দিনাজপুরের পার্বতীপুরে বসবাস করেন। সামাদ বাংলাদেশের ভূখণ্ডে জন্ম না নিলেও এদেশকে তিনি প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতেন। তিনি ১৮৯৫ খিষ্টাব্দে বিহারের পূর্ণিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। পৈত্রিক নিবাস পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার ভুরী গামে। তিনি সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। সারাজীবন তিনি লেফট আউটে খেলেছেন।
সামাদের খেলোয়াড় জীবন নানা ঘটনায় উজ্জ্বল। ১৯১২ খ্রিস্টাব্দে তিনি কলকাতা টাউন ক্লাবে যোগদান করেন এবং মোহামেডান ক্লাবে যোগদান করেন ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে। কুচবিহার মাঠে আইএফ শিল্ড খেলায় মোহনবাগানের বিরুদ্ধে ২টি গোল করে সকলের দৃষ্টি কাড়েন। সাতচল্লিশে দেশ-বিভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানের রেলওয়ের ফুটবল দলের সংগে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। তিনি কালজয়ী ফুটবল প্রতিভা। তিনি বিশ্বের সেরা ফুটবল দলকে (গ্রেট ব্রিটেন) হারিয়ে উপমহাদেশের মুখ উজ্জ্বল করেছিলেন। খেলার মাঠে প্রতিনিয়ত অবিশ্বাস্য ঘটনার জন্ম দিতেন সামাদ। তেমনি একটি ঘটনা ঘটেছিল একবার ইন্দোনেশিয়ায়। সর্বভারতীয় ফুটবল দল গিয়েছিল ইন্দোনেশিয়ার জাভায়। খেলা চলাকালে ইন্দোনেশিয়ার বেশ ক’জন খেলোয়াড়কে কাটিয়ে গোলপোস্ট লক্ষ্য করে তীব্র শট করলেন সামাদ। বল গোলপোস্টের ক্রসবারে লেগে ফিরে এলো মাঠে। বিস্মিত হলেন তিনি। গোল হলো না কেন? কিছুক্ষণ পর আবারও সামাদের তীব্র শটের বল ইন্দোনেশিয়ার গোলপোস্টের ক্রসবারে লেগে ফিরে এল। এবার সামাদ রেফারিকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিলেন, ‘গোলপোস্টের উচ্চতা কম আছে। তা না হলে, আমার দুটি শটেই গোল হতো’। ফিতে দিয়ে মেপে দেখা গেল সত্যিই গোলপোস্টের উচ্চতা স্ট্যান্ডার্ড মাপের চেয়ে চার ইঞ্চি কম রয়েছে। আরেকবার মাঠের মধ্যস্থল থেকে বল নিয়ে সব খেলোয়াড়কে বোকা বানিয়ে বল ড্রিবলিং করে নিক্ষেপ করলেন গোলে, বল গোলে প্রবেশ না করে গোলপোস্টের কয়েক ইঞ্চি উপর দিয়ে বাইরে চলে গেলে রেফারি বাঁশি বাজিয়ে বলকে আউট ঘোষণা করলে সঙ্গে সঙ্গে সামাদ তা গোল হয়েছে বলে চ্যালেঞ্জ করে বসলেন। ‘আমার শটে নিশ্চিত গোল হয়েছে’। সামাদের শটের মেজারমেন্ট কোনোদিন ভুল হয়নি। গোলপোস্ট উচ্চতায় ছোট। মেপে দেখা গেল সত্যিই তাই। ফুটবল নিয়ে সেই কিশোর বয়স থেকে অনুশীলন করতে করতে সামাদ পরিণত হয়েছিলেন ফুটবলের এক মহান শিল্পীতে। একবার খেলার আগ মুহূর্তে মাঠের চারদিকে পায়চারি করে এসে সামাদ ক্রীড়া কমিটির কাছে অভিযোগ করলেন এ মাঠ আন্তর্জাতিক মাপ হিসেবে ছোট বিধায় এ মাঠে আমাদের টিম খেলতে পারে না। পরে মাঠ মাপার পর তার অভিযোগ সত্য বলে প্রমাণিত হয়। তাঁর খেলোয়াড়ী জীবনের এমন বহু ঘটনা আজও দেশ-বিদেশের ক্রীড়াঙ্গনে অগণিত সামাদ ভক্তের মুখে মুখে ঘুরে বেড়ায়।’ ফুটবল জাদুকর সামাদ এক কিংবদন্তী। যারা তাঁর খেলা দেখেছেন, তারাই বলতে পারবেন মাঠে গোলাকার বস্তুটিকে তিনি কি জাদুর বলে গোলপোস্টে ঢুকিয়ে দিতেন। তাঁর জীবনের আর একটি ঘটনা—
‘বিংশ শতাব্দীর তিরিশের দশকের কথা, একদিন বিকেলে কলকাতার ইডেন গার্ডেনের বিপরীত দিকের ফুটপাত ধরে হেঁটে যাচ্ছিলেন প্রায় ছয় ফুট লম্বা একজন লোক। হঠাত্ তার পাশে গাড়ি থামিয়ে নেমে এলেন স্বয়ং তত্কালীন বাংলার গভর্নর এবং তাঁর কন্যা। গভর্নর সোজা এগিয়ে গিয়ে আঁকড়ে ধরলেন। ঘটনার আকস্মিকতায় গভর্নরের সঙ্গী-সাথীদের সবাই হতভম্ব। লম্বা লোকটির হাত ধরে কুশল বিনিময় করলেন। তারপর নিজের মেয়েকে ডেকে বললেন, ‘এসো, ফুটবলের জাদুকরের সঙ্গে পরিচিত হও (Meet the wizard of football)।
ফুটবল জাদুকর সামাদ ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দের ২৭ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন। তাকে পার্বতীপুরের ইসলামপুরের কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দে এখানে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়েছে এবং পার্বতীপুর রেলওয়ে মিলনায়তনটির নামকরণ করা হয়েছে ‘সামাদ মিলনায়তন’। ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে তিনি খেলার কৃতিত্ব প্রদর্শনের জন্য প্রেসিডেন্ট পুরস্কার লাভ করেন। তার ছেলে গোলাম হোসেনও একজন ফুটবল খেলোয়াড় ছিলেন। উপমহাদেশের ফুটবল কিংবদন্তী জাদুকর সামাদকে আমরা গভীরভাবে স্মরণ করছি।
