এক ঝাক উদ্যোমী তরুণের মঞ্চায়ন ‘যা নেই ভারতে’

আপডেট : ০৪ জুন ২০১৪, ২০:১১
সমসাময়িক সময় ও দর্শকপ্রিয়তার কয়েক দিনের ব্যবধানে সম্প্রতি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায় কণ্ঠশীলন প্রযোজিত নতুন নাটক ‘যা নেই ভারতে’-এর তৃতীয় মঞ্চায়ন হলো। মহাভারতের কাহিনী অবলম্বনে বর্তমান সময়কে ধারণ করে নাটকটি রচনা করেছেন প্রখ্যাত নাট্যকার, নির্দেশক, অভিনেতা মনোজ মিত্র এবং নির্দেশনার দায়িত্ব পালন করছেন কণ্ঠশীলন প্রশিক্ষক ও নির্দেশক মীর বরকত। মহাভারতের গল্পকে হঠাত্ এই সময়ে উপস্থাপন করার দরকার পড়ল কেন? প্রশ্ন উঠতেই পারে। বলা হয়ে থাকে নাটক জীবনের দর্পণ। নাট্যকারের মুন্সিয়ানা সেখানেই, যেখানে সমসাময়িক সময়, সমাজ ও নানা সামাজিক সমস্যা ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে উপস্থাপন ভঙ্গিতে। মহাভারতের গল্প অবলম্বন করেই নাট্যকার পরপর বলে গেছেন— নারী স্বাধীনতা, কন্যাসন্তানের প্রতি অবজ্ঞা, ধর্মের ধ্বজাধারী সমাজপতি অথবা শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর তৃতীয় বিশ্বের দেশের প্রতি চাপ সৃষ্টি ও বিদেশনীতি স্বাক্ষরের গল্প। বিদ্রুপ করেছেন—সমাজের উন্নাসিকতা ও ভোগবাদী দৃষ্টিভঙ্গিকে লক্ষ্য করে মহাভারতের গল্পের মোড়কে। নির্দেশক মীর বরকত বলেন, নাট্যকার মনোজ মিত্র নাটকের মূল কাহিনী নিয়েছেন ‘মহাভারত’-এর প্রথম দুটি খণ্ড থেকে। এর সঙ্গে বর্তমান সময়ের বৈশ্বিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে নারীবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ইত্যাদি বিষয়গুলোকে সন্নিবেশ করে লিখেছেন ‘যা নেই ভারতে’। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে রাঘব-বোয়ালদের ক্ষমতার দাপট, যুদ্ধোন্মাদনা, নারীর অবমাননা ইত্যাকার সমসাময়িক বিষয়াবলি প্রযুক্ত হয়েছে মূল নাটকের কিঞ্চিত্ সম্পাদনায়। নবীন আবৃত্তিকর্মীদের জীবনে প্রথমবারের মতো এমন একটি মঞ্চনাটকের অভিনয়ে অংশগ্রহণ করতে হচ্ছে যা মহাভারতের কাহিনী অবলম্বনে হলেও ব্যাখ্যা ভিন্নতর—আধুনিক। তিনি আরও জানান, পৌরাণিক গল্পের সঙ্গে আধুনিক সময়চিত্রের প্রতিচ্ছবি থাকায় এক ধারার সঙ্গে অন্য ধারার মিশ্রণ করতে হয়েছে। ‘নতুনত্ব আনতে’ নাটকের মঞ্চ সাজানো হয়েছে দাবা, সাপলুডু বা পাশা খেলার আদলে। মহাভারত আশ্রয় করে রচিত হলেও ‘যা নেই ভারতে’ নাটকে নাট্যকার গোটা ঘটনাপ্রবাহকে একটু অন্যরকমভাবে বর্ণনা করতে চেয়েছেন। কুরুবংশের রানি তথা হস্তিনাপুরীর রাজবাড়ির বধূদের কথাই ধরা যাক... তারা কেউ স্বেচ্ছায় মাল্যদান করেনি। ভীষ্ম যুদ্ধ করে তার ভাই বিচিত্রবীর্যের হাতে তুলে দেন দুই নারী অম্বিকা ও অম্বালিকাকে। কারণ তিনি বিবাহ করবেন না। কিন্তু ভাই তরুণ বয়সে মারা যান। দেখা দেয় অস্তিত্বের সঙ্কট বংশরক্ষায়। ভীষ্ম অম্বিকাকে অনুরোধ করেন পুত্রসন্তান ধারণ করতে। অম্বিকার আকাঙ্ক্ষা তিনি ভীষ্মের সন্তানের মা হতে চান। ভীষ্মের বক্তব্য তিনি প্রতিজ্ঞাভ্রষ্ট হবেন না। নারীকে সেই পুরুষের ইচ্ছার কাছে নতজানু হতে হয়। পুরুষের আদেশে, তার বিছানায় যাকে পাঠানো হবে তাকেই গ্রহণ করতে হবে। ব্যাসদেবের সঙ্গে অম্বিকার বলপূর্বক মিলন হয়। সে মিলনে ব্যাসদেবের প্রতি না তাকানোয় জন্ম হয় অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের। অম্বালিকার সঙ্গে মিলনে জন্ম নেন পাণ্ডু। দাসীর গর্ভে জন্মান বিদুর। ব্যাসদেব এদের সবার পিতা। গল্প এগিয়েছে এমনভাবেই মহাভারতের মূল কাহিনীর শরীর ছুঁয়ে। পরবর্তী সময়ে পাণ্ডুর পুরুষত্বহীনতা ও বনবাসের সিদ্ধান্ত, গান্ধারির জরায়ু বিনষ্টকরণ, এসবের ফলে সৃষ্ট সঙ্কট মোকাবেলায় আবির্ভূত হন ঘোর তমাশাবৃত জন্মকথার পঞ্চপাণ্ডব। এইসব মাতা, পুত্রদেরই আশা-আকাঙ্ক্ষা, জয়-পরাজয়, দর্শনের বিরোধ ও বৈপরিত্য নিয়েই ‘যা নেই ভারতে’। ১ ঘণ্টা ৪০ মিনিটের নাটকটির মঞ্চসজ্জা ও আলোক নির্দেশনা দিয়েছেন জুনায়েদ ইউসুফ। সংগীত পরিচালনা করেছেন অসীম কুমার নট্ট। পোশাক পরিকল্পনা করেছেন আইরিন পারভীন লোপা। কোরিওগ্রাফি করেছেন লিনা দিলরুবা শারমিন। নাটকের জন্য দুটি গানের কথা লিখেছেন এ. এফ. আকরাম হোসেন এবং কণ্ঠ দিয়েছেন হানিফ মোহাম্মদ রতন। এছাড়াও নেপথ্য কণ্ঠ দিয়েছেন গোলাম সারোয়ার। নাটকটির বিভিন্ন চরিত্রে রূপদান করেছেন :আব্দুর রাজ্জাক, একেএম শহীদুল্লাহ কায়সার, সোহেল রানা, সালাম খোকন, অনন্যা গোস্বামী, জেএম মারুফ সিদ্দিকী, নিবিড় রহমান, তনুশ্রী গোস্বামী, তাসাউফ-ই-বাকি বিল্লাহ রিবিন, সুমন কুমার দে, তৃপ্তি রানী মণ্ডল, ফারিয়া আক্তার সোমা, শামীম রিমু, মিজানুর রহমান, মাহমুদুল হাসান, শাহানা রহমান, মেহেরুন্নেছা অনীক, শরীফ আব্দুল ওয়াহাব, রুহুন ওয়াসাতা, অমিতাভ রায়, অনুপমা আলম, প্লাবন রব্বানী ও আফরিন খান।