ঢাকার একুশে বইমেলা ছাড়া পৃথিবীর বড় কোনো বাংলাদেশের বইয়ের মেলা বলতে এখন নিউ ইয়র্কের মুক্তধারার বইমেলাকেই বোঝায়। পাশ্চাত্যে জন্মগ্রহণকারী নতুন প্রজন্মে বাঙালি সংস্কৃতি প্রবাহের সংকল্পে বর্ণাঢ্য আয়োজনে নিউ ইয়র্কে প্রতিবছর তিন দিনের বইমেলার আয়োজন করে মুক্তধারা। অনেকবার এই মেলায় যাবার ইচ্ছা থাকলেও যেতে পারিনি। কিন্তু যেবার গেলাম সেটি ছিল কুড়ি বছর পূর্তি উপলক্ষে বিশেষ আয়োজন। সেবার কুড়ি জন লেখক-কবি-সাহিত্যিককে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিয়ে মেলার উদ্বোধন করার জন্যে। আমার ব্যক্তিগত অনুভূতি ছিল সেই ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ যখন প্রথমবার ফ্রাঙ্কফুর্ট আন্তর্জাতিক বইমেলায় অংশ নিয়েছিল, সেই অনুভূতির মতো। সেই বছর বাংলাদেশ থেকে অনেকের সঙ্গে আমারও যাবার সৌভাগ্য হয়েছিল। লেখকদের মধ্যে ছিলেন মুনতাসীর মামুন, মফিদুল হক, প্রকাশক মেজবাহ উদ্দীন আহমেদ, মহিউদ্দীন আহমেদ আর বার্লিন থেকে এসেছিলেন কবি দাউদ হায়দার। এই বইমেলা নিয়ে অনেকবার লিখেছি; লিখেছি প্রথমবার বিশ্বের অন্যতম প্রধান মেলায় বাংলাদেশের বইয়ের স্টল, বাংলা বই দেখে কেমন অনুভূতি হয়েছিল সেইসব কথা। কিন্তু নিউ ইয়র্কের মুক্তধারার মেলার এই সম্মিলন হয়ে উঠেছিল এক ঐতিহাসিক মিলনকেন্দ্র। আর মিলনকেন্দ্রের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন ভারতীয় সাহিত্যিক তপন রায় চৌধুরী যিনি এ মেলার উদ্বোধন করেন।
পদ্মভূষণ উপাধিপ্রাপ্ত সাহিত্যিক তপন রায় চৌধুরী একজন বাঙালি ইতিহাসবেত্তা যিনি ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতবর্ষের ইতিহাস রচনার জন্য প্রসিদ্ধ। তিনি দীর্ঘকাল অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতীয় ইতিহাস ও সভ্যতা বিষয়ে শিক্ষকতা করার পর বর্তমানে অক্সফোর্ডের সেইন্ট এন্টনী কলেজে এমিরিটাস ফেলো হিসেবে সংযুক্ত আছেন। এই পণ্ডিততুল্য মানুষটির আদি জন্ম এবং আদি নিবাস বাংলাদেশে, ভাবতেই ভালো লাগে। বরিশাল থেকে মাত্র সতের মাইল দূরে ঝালকাঠিতে কীর্তিপাশা জমিদার বাড়ির কথা কে না জানে? এ বংশের রোহিনী রায় চৌধুরী যেমন এলাকায় খ্যাতিমান ছিলেন, এখন তাঁর নাতি তপন রায় চৌধুরী তেমনি খ্যাতিমান গবেষক, লেখক। ‘বাঙালনামা’ গ্রন্থ তাঁর অমর সৃষ্টির একটি। তপন রায় চৌধুরীর উপস্থিতি মেলায় আগত সকল লেখক, কবি, সঙ্গীতশিল্পী, পাঠক, আয়োজকদের যেন এক অভিনব আবেগের সুতোয় বেঁধে দিয়েছিল।
মেলায় উপস্থিত ছিলেন আরো অনেকেই যাদের কথা না বললেই নয়। কবি শহীদ কাদরী, ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, এই মেলার আদি থেকে পৃষ্ঠপোষক লেখক ডক্টর জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, লেখক পূরবী দত্ত, মমতাজ উদ্দীন আহমদ, হাসান ফেরদৌস, দিলারা হাশেম, ফেরদৌস সাজেদিন, এবং সঙ্গীতশিল্পী মণিকা রশিদ।
উপস্থিত লেখকদের মধ্যে ড. আলী আনোয়ার আজ আর আমাদের মধ্যে নেই। কালের পরিক্রমায় এরকম কত জন হারিয়ে যাবেন আমাদের মাঝে থেকে। হয়তো অনেকেই এই মেলার পর আর উপস্থিত হবার সুযোগ পাবেন না। কিন্তু মুক্তধারা বইমেলার মধ্য দিয়ে যে সাহিত্য, সংস্কৃতির প্রবহমানতা সৃষ্টি করেছে দেশে এবং প্রবাসে তা অম্লান রয়ে যাবে চিরদিন; একে আরো ঋজু, সংহত এবং স্থায়ী করার দায়িত্ব আমাদের সকলের। এই মেলা আমাদের প্রাণের হয়ে জেগে থাকুক অন্তরে—এই হোক আজকের কামনা।
