আসছে ১৩, ১৪ এবং ১৫ জুন নিউ ইয়র্কে শুরু হচ্ছে মুক্তধারা ফাউন্ডেশন আয়োজিত আন্তর্জাতিক বাংলা উত্সব এবং বইমেলা। আসন্ন এই বইমেলাকে ঘিরে নিউ ইয়র্কের বাঙালিদের আনন্দ আর আহ্লাদের যেন সীমা নেই। তাই তো বইমেলাকে কেন্দ্র করে জ্যাকসন হাইটস-এর আশপাশে শুনতে পাই বাঙালির গুঞ্জন আর দেখতে পাই উত্তেজনার দীপ্তিময় আভা। বলার অপেক্ষা রাখে না যে প্রতি বছরের মতো এ বছরেও বাংলাদেশ, পশ্চিম বঙ্গ এবং উত্তর আমেরিকার লেখক-প্রকাশকদের উপস্থিতিতে এই মেলা সরগরম হয়ে উঠবে। বাংলাদেশ থেকে এ বছর এই বইমেলায় যোগ দিচ্ছেন—কবি মহাদেব সাহা, ফরিদুর রেজা সাগর, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, মঈনুস সুলতান, মাসুদা ভাট্টি এবং কাজী আরিফ। পশ্চিমবঙ্গ থেকে যোগ দিচ্ছেন সমরেশ মজুমদার, আলোলিকা মুখোপাধ্যায়, তনুশ্রী ভট্টাচার্য্য। জার্মানি থেকে আসছেন দাউদ হায়দার, নাজমুন নেসা পিয়ারী। কানাডা থেকে আসছেন সালমা বাণী, জসিম মল্লিকসহ এক ডজন শিল্পী-লেখক-সাহিত্যিক-আবৃত্তিকার। আমেরিকার বিভিন্ন স্টেটসহ বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, ইউরোপ, কানাডা থেকে এবারের বইমেলায় যোগ দিচ্ছেন ৫০-এর বেশি লেখক। তবে বইমেলাকে ঘিরে বাঙালির এই উন্মাদনা নতুন কোনো ঘটনা নয়। বাংলাদেশ, কলকাতা, লন্ডন সবখানেই সেই একই চিত্র। বইমেলাকে সামনে রেখে বাঙালিরা হাজার রকম আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন। বইয়ের প্রতি বাঙালির এই ভালোবাসা আর অনুরাগ সত্যি অতুলনীয়। কিন্তু খুব ভয় হয়, বই এবং বইমেলার প্রতি বাঙালির এই নিপাট ভালোবাসাটা অদূর ভবিষ্যতেও থাকবে তো?
ইদানিং মুদ্রিত আকারে প্রকাশিত বইয়ের ভবিষ্যত্ এবং এর অস্তিত্ব নিয়ে অনেকের কপালেই চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। ভবিষ্যতের পৃথিবী থেকে এই ছোট্ট বই নামের বস্তুটি কি হারিয়ে যাবে? বই কি সত্যিই এখন অস্তিত্বের সংকটে? তবে এ কথা সত্য যে বইয়ের জায়গা এখন দখল করে বসে আছে ফেসবুক, ইন্টারনেট চাট, ভিডিও গেম, রং-বেরং-এর টিভি চ্যানেল। দেখতে পাই, বই এখন বাসা বেঁধেছে আইপ্যাডে, কিন্ডেলে কিংবা গোগল বুকে। আর কাগজের বইগুলো এখন নীরবে ঘুমোচ্ছে বাড়ির ড্রইংরুমের আলমারিতে অথবা বস্তাবন্দি হয়ে। আলমারিতে বই এর মলাটে এখন মাকড়সার জাল, ধুলোর আস্তরণ। বই এখন ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু বই কি সত্যি ঘুমিয়ে পড়েছে? ‘না, বই কখনো ঘুমোতে পারে না। বই জেগে আছে আর জেগে থাকবে চিরদিন। এই বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির যুগে বই হয়তো ভিন্ন চেহারায় ভিন্নভাব নিয়ে পাঠকের সামনে এসেছে বা আসছে কিন্তু বই কখনো মুছে যাওয়ার নয়, হারিয়ে যাওয়ার নয়। বইয়ের অস্তিত্ব আগেও যেমন ছিল, এখনো আছে আর ভবিষ্যতেও থাকবে।’ অত্যন্ত প্রত্যয় আর দৃঢ়তার সাথে কথাগুলো বললেন নিউইয়র্ক মুক্তধারার কর্ণধার বিশ্বজিত্ সাহা। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, মুক্তধারা ফাউন্ডেশন এবং বিশ্বজিত্ সাহা গত কুড়ি বছর ধরে এই নিউইয়র্কের মতো কঠিন বাংলা বিবর্জিত শহরে বইমেলা করে আসছেন। খুব স্বাভাবিকভাবেই বইয়ের প্রতি তাঁর দরদ আর আশাবাদ একটু বেশি থাকবেই। ‘আমরা যখন নিউইয়র্কে প্রথম বইমেলা শুরু করি তখন নিউইয়র্কে বাঙালির সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। সময়টা ছিল সত্যি কঠিন। কিন্তু আমরা কখনো হাল ছাড়িনি। বাংলা ভাষা, বাংলা সংস্কৃতির প্রতি আমাদের নিগূঢ় ভালোবাসায় এতটুকু ভাটা পড়েনি। শত বাধা পেরিয়ে, কাঠখড় পুড়িয়ে, আজকে এই কুড়ি বছর পরও আমরা খুব জাঁকজমক আর ভালোবাসার সাথেই বইমেলা করে আসছি এবং ভবিষ্যতেও করবো।’ বললেন বিশ্বজিত্ সাহা।
এ কথা স্বীকার না করে উপাায় নেই যে, শুধু বইয়ের ওপর নির্ভর করে নিউ ইয়র্কের মতো কঠিন এক জায়গায় একটি বইয়ের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা চাট্টিখানি কথা নয়। মুক্তধারা এই দিক থেকে সফল একটি নাম। শত বাধা বিপত্তিতেও তিনি বইকে ছেড়ে যাননি, পরম মমতায় আঁঁকড়ে ধরে রেখেছেন এই প্রতিষ্ঠানকে।
আবারো মুখোমুখি হই বিশ্বজিত্ সাহার—‘এ কথা ঠিক যে এখন বাঙালি বইয়ের পাশাপাশি তাদের বিনোদনের জন্য টিভি, ইন্টারনেট এসবের ওপর বেশি ঝুঁকে পড়েছে। কিন্তু তাই বলে বাঙালির পাত থেকে বই উঠে যাচ্ছে বা এর আদর কমে যাচ্ছে—এ কথা আমি বলব না। যদি বাঙালির বইয়ের প্রতি ভালোবাসা কমেই যেত তাহলে সাত সমুদ্র তের নদী পেরিয়ে লেখক-পাঠক-প্রকাশকরা বিপুল উত্সাহ আর উদ্দীপনা নিয়ে নিউ ইয়র্কের এই বই মেলায় অংশগ্রহণ করতেন না।’
না, বইয়ের মৃত্যু নেই। বই থাকবে আমাদের আশে পাশেই। পাঠকের অন্তরের তৃষ্ণাই বইকে বাঁচিয়ে রাখবে। তবে এর জন্য এগিয়ে আসতে হবে সবাইকে। শুধু বাংলাদেশ, পশ্চিম বঙ্গ কিংবা নিউ ইয়র্কের মুক্তধারার বইমেলার দিকে চোখ রেখে বসে থাকলে চলবে কেন? বইমেলা হোক পৃথিবীর সর্বত্রই। বই এর জয় হোক। নিউ ইয়র্কের মুক্তধারা ফাউন্ডেশন আয়োজিত আসন্ন বইমেলার জয় হোক।
