ফিরে পেলাম মায়ের আঁচল

আপডেট : ০৫ জুন ২০১৪, ১৯:১৮
একসময় ঢাকায় বাংলা একাডেমির বইমেলায় যাওয়া একটা নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। পয়লা ফেব্রুয়ারি উদ্বোধনের পর প্রতি সপ্তাহে অন্তত দু-তিনটি দিন বইমেলায় ঘোরাঘুরি না করলে সপ্তাহটা ফাঁকা মনে হতো। ছুটির দিনের স্থানগুলো প্রায়ই ব্যস্ত থাকতে হতো নাটকের দলের মহড়া অথবা প্রদর্শনী নিয়ে। ফাঁকে ফাঁকে বাংলাদেশ টেলিভিশনে নাটকের রেকর্ডিং। বাকি সন্ধ্যা পূর্ণ বইমেলায়। বই কেনার চাইতে সবার সাথে মেলার আনন্দটাই ছিল বেশি আকর্ষণীয়। একুশে ফেব্রুয়ারির দিন প্রভাতফেরীর পর বাকি দিনটা প্রায় বইমেলার আড্ডাতেই কেটে যেত। তারপর বইমেলার ভিড় এবং নিজের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মেলায় যাতায়াত গেল কমে। ধুলোর ভয়ে মেলায় সর্বসাকুল্যে দু-তিন দিনের বেশি যাওয়া হতো না। হয়তো বড়জোর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান, কোনো বইয়ের প্রকাশনা উত্সব এবং মেলার শেষ দিকে গিয়ে কিছু বই কেনা—এই টুকুই। কিন্তু চেতনায় বইমেলা ছিল সদাজাগ্রত। ২০০৬-এর শেষে কন্যার অসুস্থতার কারণে ইমিগ্রেশন নিয়ে চলে আসতে হলো নিউ ইয়র্কে। ঢাকার জীবন, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল এবং সেই সঙ্গে বইমেলাকে পেছনে ফেলে প্রবাসে নতুন জীবনের জন্য যখন মানসিকভাবে তৈরি হচ্ছি, সেই সময় মুক্তধারা ফাউন্ডেশন থেকে আমন্ত্রণ পেলাম ২০০৭-এর বইমেলা ও বাংলা উত্সবে। স্থান লাগার্ডিয়া কলেজ, লং আইল্যান্ড সিটি নিউ ইয়র্ক, জ্যকসন হাইটস-এ। মুক্তধারা বই বিপণীর সঙ্গে পরিচয় তারও অনেক আগে থেকে। অনেক প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে উত্তর আমেরিকায় বিশেষ করে নিউ ইয়র্কে প্রতিষ্ঠা করার জন্য বিশ্বজিত সাহার মিশন সম্পর্কে আমি জানতাম। কিন্তু মুক্তধারার বইমেলায় এই প্রথম গিয়ে বুঝলাম যে তাঁর ভিশন আরও অনেক বড়। ঢাকা-কলকাতার পর নিউ ইয়র্ক-কে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই তাঁর লক্ষ্য। আয়োজন দেখে মুগ্ধ হলাম এবং তারপর থেকে আন্তর্জাতিক বাংলা উত্সব ও বইমেলার সঙ্গে জড়িয়ে গেলাম। বুঝলাম, বাংলাদেশ ছেড়ে এলেও বাংলার আঁচল আমাকে ছাড়তে হবে না। ২০১৩-এর আন্তর্জাতিক বাংলা উত্সব ও বইমেলার আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে আমাকে। তখন আরও প্রত্যক্ষভাবে উপলব্ধি করেছি যে, কী বিশাল পরিকল্পনা, বিপুল কর্মযজ্ঞ, নিষ্ঠা ও ভালোবাসার প্রয়োজন হয় বাংলাদেশ থেকে এত দূরে একটি ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির বাংলা উত্সব ও বাংলা বইমেলা আয়োজন করার জন্য। এতসব বিখ্যাত লেখক, প্রকাশক বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী, পাঠক ও দর্শকের প্রাণবন্ত সম্মিলন ঘটানো সহজ কাজ নয়। বিশেষ আমন্ত্রিত লেখকও বুদ্ধিজীবী আসেন মূলত বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে। যুক্তরাজ্য ও কানাডা থেকেও অনেকে আসেন আমন্ত্রিত হয়ে। ঢাকা ও কলকাতা থেকে উড়ে আসেন প্রখ্যাত ও জনপ্রিয় শিল্পীবৃন্দ। নতুন বইয়ের সম্ভার নিয়ে উপস্থিত হন বাংলাদেশ ও ভারতের প্রকাশকরা। এঁদের আমন্ত্রণ জানানো, আসা-যাওয়ার সমন্বয়, স্থানীয় আতিথেয়তা, সব মিলিয়ে এক বিশাল কর্মকাণ্ড। সেই সঙ্গে নিউ ইয়র্কের স্থানীয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য স্টেটের লেখক, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাটাও কম কঠিন কাজ নয়। কিন্তু সেই কঠিনকে ভালোবেসে গত ২৩ বছর ধরে বাংলা উত্সব ও বইমেলা অনুষ্ঠানের কাজটি করে যাচ্ছে মুক্তধারা ফাউন্ডেশন। হ্যাঁ ‘আন্তর্জাতিক বাংলা উত্সব ও বইমেলা’ ২৩ বছরে পা দিয়েছে। আগামী ১৩, ১৪, ও ১৫ জুন ২০১৪ নিউ ইয়র্কের কুইন্সে অনুষ্ঠিত হবে ২৩তম আন্তর্জাতিক বাংলা উত্সব ও বইমেলা। বরাবরের মতো এবারও মেলা আলোকিত করবেন প্রখ্যাত কবি, ঔপন্যাসিক ও গল্পকারগণ। উত্সব অলঙ্কৃত করবেন বরেণ্য বুদ্ধিজীবী, শিল্পী ও সাংস্কৃতিকর্মীবৃন্দ। বইয়ের ভাণ্ডার নিয়ে যোগ দেবেন বিখ্যাতসব প্রকাশনা সংস্থা। এই উত্সব ও সম্মিলনকে যারা যথার্থভাবে সার্থক করতে পারেন, সেই পাঠক ও দর্শকের বিপুল সমাগম অব্যাহত থাকবে বলে আশা করি। প্রিয় লেখক বা শিল্পীকে সামনাসামনি দেখার এবং তাঁদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ তারা নিশ্চয়ই হাতছাড়া করতে চাইবেন না। তাছাড়া নতুন বইয়ের গন্ধ কে উপেক্ষা করতে পারে? তাদের সবাইকে সাদর আমন্ত্রণ জানাই। এবারের উত্সব ও বইমেলার আহ্বায়ক প্রখ্যাত চিকিত্সক বুদ্ধিজীবী ডা. জিয়াউদ্দীন আহমেদ নিশ্চয়ই মেলায় নতুন মাত্রা যোগ করবেন। তাঁকে শুভেচ্ছা জানাই। ২৩তম ‘আন্তর্জাতিক বাংলা উত্সব ও বইমেলা’ সফল হোক এবং মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের জয়যাত্রা অব্যাহত থাকুক, এই কামনা করি।