বৃষকাষ্ঠ

লোকবিশ্বাসের শিল্পকৃতি

আপডেট : ০৫ জুন ২০১৪, ১৯:১৯
মানুষ আজীবন তার অহংবোধ নিয়ে বেঁচে থাকে। মৃত্যুর পরও যেন এর শেষ নেই। মানুষের মৃত্যুর পর পারলৌকিক ক্রিয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধর্মে ভিন্ন-ভিন্ন আঙ্গিক, বৈশিষ্ট্য, বিধিবিধান ও পরম্পরা রয়েছে। তেমনি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পারলৌকিক ক্রিয়ার একটি বিশেষ অংশ হলো ‘শ্রাদ্ধ’। ‘শ্রাদ্ধ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো—‘হিন্দুধর্ম মতে মৃতের আত্মার কল্যাণ কামনায় পিণ্ডদানাদি অনুষ্ঠান। মৃতের উদ্দেশে শ্রদ্ধাপূর্বক অন্নাদি দান।’ অর্থাত্ মৃতব্যক্তির আত্মার মঙ্গলার্থে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান। শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের ক্ষেত্রে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিভিন্ন বর্ণ বা সমপ্রদায়ভেদে দিনক্ষণের বিভিন্নতা রয়েছে, তবে সকল ক্ষেত্রে অশৌচকাল ন্যূনতম ১০দিন। শুধুমাত্র আত্মহত্যা ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে মৃত ব্যক্তির ক্ষেত্রে অশৌচকাল ৩দিন। সনাতন ধর্মাবলম্বী সকল সমপ্রদায়ের মৃতব্যক্তির সত্কারের পর শ্রাদ্ধানুষ্ঠান প্রযোজ্য। বিভিন্ন অঞ্চল, বর্ণ, সমপ্রদায় ও প্রথাভেদে, শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের পূজা এবং আচার-অনুষ্ঠানে বেশকিছু তারতম্য থাকলেও সকল ক্ষেত্রে ৭টি বিষয় অবশ্যকরণীয়। যেমন—ক. বৃষোত্সর্গ, খ. তিল-কাঞ্চন, গ. ষোলদান, ঘ. আদ্য একোদ্দিষ্ট, ঙ, অঙ্গ প্রায়শ্চিত্ত, চ. সূর্যার্ঘ্যদান, ছ. বৈতরণী পার। ‘বৃষোত্সর্গ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো—‘হিন্দুদের দ্বারা অনুষ্ঠিত একপ্রকার শ্রাদ্ধ, যাতে ষাঁড় উত্সর্গ করা হয়।’ অর্থাত্ সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষের মৃত্যুর পর পশুপতি মহাদেব শিবের বাহন বৃষকে (ষাঁড়কে) বিভিন্ন পূজা ও আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রকৃতিতে উত্সর্গ করাকে বৃষোত্সর্গ বলে। আর বৃষ উত্সর্গ করে অনুষ্ঠিত শ্রাদ্ধানুষ্ঠানকে ‘বৃষোত্সর্গ শ্রাদ্ধানুষ্ঠান’ বলে। বৃষোত্সর্গ শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের মাধ্যমে মৃতব্যক্তির স্বর্গবাস নিশ্চিত হয়। ‘বৃষকাষ্ঠ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো—‘হিন্দুদের বৃষোত্সর্গ নামক শ্রাদ্ধে ব্যবহূত ষাঁড় বাঁধার খুঁটি।’ অর্থাত্ বৃষকাষ্ঠ হলো—বৃষোত্সর্গ শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে বৃষকে বেঁধে রাখার কারুকাজখচিত কাঠের খুঁটি। চিত্রে ব্যবহূত বৃষকাষ্ঠটি কলকাতার রাজ্য প্রত্নতত্ত্ব সংগ্রহশালায় সংগৃহীত আছে। দীর্ঘ পথপরিক্রমায় বৃষোত্সর্গ শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে এই ‘বৃষকাষ্ঠ’। অতীতকালে মৃতব্যক্তির বাড়ির উঠানে যজ্ঞবেদীর ঈশানকোণে ৪টি কাঠের খুঁটি পুঁতে, ঈশানকোণে ১টি ষাঁড় ও অন্য তিন কোণে ৩টি গাভী বাঁধা হতো। পূজা ও আচার-অনুষ্ঠান শেষে উল্লিখিত ষাঁড় এবং গাভীগুলো প্রকৃতিতে উত্সর্গ করা হতো। কালপরিক্রমায় ধর্মীয় সংস্কার ও আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে বর্তমানে শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে শুধুমাত্র ১টি ষাঁড়কে পূজা ও আচার-অনুষ্ঠান শেষে উত্সর্গ করা হয়। প্রথমদিকে এই খুঁটিতে তেমন শিল্পশৈলীর প্রভাব ছিল না। ধীরে-ধীরে এর আকার-আকৃতির পরিবর্তন হয়েছে এবং এতে ধর্মীয় অনুভূতিস্নাত অনুষঙ্গ, মানুষ, বৃষ, শিব, রথ, ত্রিশূল, বিভিন্ন নকশা ও শিল্পীর মননশীলতা যুক্ত হয়ে নাম হয়েছে ‘বৃষকাষ্ঠ’। হাজার বছর ধরে প্রাচীন বাংলার সর্বত্র শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে এই বৃষোত্সর্গ ও বৃষকাষ্ঠ বিশেষ উপাদান হিসেবে ব্যবহূত হয়ে আসছে। বাংলাদেশে বৃষকাষ্ঠ নির্মাণের প্রচলন প্রায় বিলুপ্ত। তবে ভারতের পুরুলিয়া, হুগলি, হাওড়া, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা, বাঁকুড়া, বর্ধমান, মেদিনীপুর, পশ্চিমবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গে এখনো এর ব্যবহার লক্ষণীয়। প্রতীয়মান যে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরে ১টি, সোনারগাঁ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন জাদুঘরে ২টি, কলকাতা রাজ্য প্রত্নতত্ত্ব সংগ্রহশালায় ২টি, কলকাতা আশুতোষ সংগ্রহশালায় ৫টি বৃষকাষ্ঠ সংগৃহীত আছে। গঠনশৈলীর বৈশিষ্ট্যে বৃষকাষ্ঠ সাধারণত ৩টি কাঠামোতে নির্মিত হয়—ক. আয়তাকৃতি বৃষকাষ্ঠ, খ. বর্গাকৃতি বৃষকাষ্ঠ, গ. গোলাকৃতি বৃষকাষ্ঠ। কোনো গাছখণ্ডকে চারপাশ থেকে কেটে-চেঁছে এর ছাল, গিঁট, ঠেম ফেলে দিয়ে নির্দিষ্ট মাপের লম্বায় কেটে আয়তাকৃতি, বর্গাকৃতি ও গোলাকৃতি কাঠামো নির্মাণ করে তাকে বৃষকাষ্ঠে রূপ দেওয়া হয়। আয়তাকৃতি বৃষকাষ্ঠের সাধারণ মাপ হলো—২৪৪ x ২৫ x ২১ সে.মি.; ২২৯ x ২০ x ১৬ সে.মি. । বর্গাকৃতির বৃষকাষ্ঠের সাধারণ মাপ হলো—২৪৪ x ২৫ x ২৫ সে.মি.; ২২৯ x ২০ x ২০ সে.মি.। গোলাকৃতি বৃষকাষ্ঠের সাধারণ মাপ হলো—উচ্চতা : ২৪৪ সে.মি., বেড় : ৭৯ সে.মি.; উচ্চতা : ২২৯ সে.মি., বেড় : ৬৪ সে.মি.। বৃষকাষ্ঠ তৈরির ক্ষেত্রে সূত্রধরশিল্পীর স্বকীয়তাই প্রাধান্য পায়। সেজন্য বিভিন্ন অঞ্চলভেদে, মানুষের রুচিবোধ, আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট, চিরায়তধারায়, বিভিন্ন গঠনশৈলী, আকার-আকৃতি ও রূপবৈচিত্র্যের বৃষকাষ্ঠ নির্মাণ করা হয়। তবে সকল ক্ষেত্রে বৃষকাষ্ঠের একটি নির্দিষ্ট স্বতন্ত্র পরিচয় আছে তা হলো—‘বৃষকাষ্ঠের মূলত পাঁচটি শিল্প-ভাগ। ... একটি বৃষকাষ্ঠ মোট ৬ থেকে ৭ ফুটের বেশি হয় না। মনুষ্যপ্রমাণ সাইজ। যদি সমস্ত কাঠটি ভাগ করে নিই, সর্বাগ্রে ত্রিশূল থেকে ভূমিতে পোঁতা পর্যন্ত, তবে গঠনের দিক থেকে মোট ছয়টি ভাগ : ভূমি-মানব আকৃতি-ষাঁড়-শিবলিঙ্গ-রথের চূড়া-ত্রিশূল। ... বৃষকাষ্ঠে রঙের ব্যবহার পাওয়া গেছে শুধুমাত্র হুগলি ও হাওড়া জেলায়। ... আগে কী রঙ ব্যবহার হতো জানা যায়নি। এখন কোম্পানির কেনা তেলরঙেরই ব্যবহার। মাত্র চারটি রঙ। লাল, কালো, সাদা ও হলুদ।’ বিভিন্ন স্থানে সংগৃহীত বৃষকাষ্ঠগুলোর গঠনশৈলী ও বিষয়বস্তু প্রত্যক্ষ করে প্রতীয়মান হয়েছে যে, বিভিন্ন অঞ্চলভেদে, শিল্পীভেদে, চাহিদাভেদে বিচিত্র গঠনশৈলী এবং ৬-১১টি বিষয়বস্তুর সমন্বয়ে বৃষকাষ্ঠ নির্মিত হয়। এখানে আয়তাকৃতির একটি আদর্শ বৃষকাষ্ঠের বর্ণনা তুলে ধরা হলো। উল্লিখিত আয়তাকৃতির বৃষকাষ্ঠের মাপ হলো—উচ্চতা : ২৪৪ সে.মি., আয়তন : ২৫ x ২১ সে.মি। উল্লিখিত আয়তাকৃতির বৃষকাষ্ঠটি ৬টি বিষয়বস্তুর সমন্বয়ে নির্মিত। যেমন—ক. ভূমি বা বেস, খ. মানবাকৃতি বা মৃতব্যক্তির আকৃতি, গ. বৃষপ্রকোষ্ঠ বা মন্দিরপ্রকোষ্ঠে বৃষ, ঘ. শিবপ্রকোষ্ঠ বা মন্দিরপ্রকোষ্ঠে শিব (শিবলিঙ্গ), ঙ. রথ, চ. ত্রিশূল। ক. ভূমি বা বেস : বৃষকাষ্ঠের সর্বনিম্নের যে অংশটি মাটির নিচে পুঁতে দেওয়া হয় সে অংশটিকে ‘ভূমি বা বেস’ বলে। এই অংশে কোনো কারুকাজ করা হয় না। মাটিতে পুঁতে রাখার প্রয়োজনে এই অংশের ছাল, গিঁট, ঠেম কেটে-চেঁছে ফেলে দিয়ে ক্রমশ নিচের দিকে সরু করা হয় মাত্র। খ. মানবাকৃতি বা মৃতব্যক্তির আকৃতি : ভূমি বা বেসের ওপর একটি চৌকো আয়তাকৃতির পাটাতন, এই পাটাতনের ওপর মৃতব্যক্তির দণ্ডায়মান আকৃতি খোদাই করে ফুটিয়ে তোলা হয়। এ ক্ষেত্রে মৃতব্যক্তি পুরুষ হলে পুরুষ আকৃতি এবং নারী হলে নারী আকৃতি নির্মাণ করা হয়। মানবাকৃতির সম্মুখভাগই বৃষকাষ্ঠের সম্মুখভাগ। বৃষকাষ্ঠে মৃতব্যক্তির আকৃতি হুবহু নির্মিত হয় না, শুধুমাত্র মৃতব্যক্তির লিঙ্গপার্থক্যের (পুরুষ ও নারী) প্রধানতম অঙ্গগুলোর অবয়ব ফুটিয়ে তোলা হয়। ভূমির ওপর প্রথমেই একটি সলিড আয়তাকার ‘পাটাতন’ নির্মাণ করা হয়, যার ওপর নির্মিত মানবাকৃতি দাঁড়িয়ে থাকে। গ. বৃষপ্রকোষ্ঠ বা মন্দিরপ্রকোষ্ঠে বৃষ : মানবাকৃতির ওপর একটি চৌকো আয়তাকৃতি মন্দিরপ্রকোষ্ঠ, এই মন্দিরপ্রকোষ্ঠের ভেতরে ১টি বৃষ নির্মাণ করা হয়। বৃষপ্রকোষ্ঠের ভেতর শিংওয়ালা বৃষকে বৃষকাষ্ঠের সম্মুখমুখী করে নির্মাণ করা হয়। প্রকৃতির বাস্তব বৃষ তেজি, উচ্ছৃঙ্খল হলেও বৃষকাষ্ঠে বৃষকে নম্র, ভদ্র, অবনত মুখে ও উত্তেজনাহীনভাবে নির্মাণ করা হয়। মন্দিরপ্রকোষ্ঠে বৃষকে এমন ভঙ্গিতে নির্মাণ করা হয় যেন প্রকোষ্ঠ থেকে বৃষটি বাইরে বেরিয়ে আসছে। ঘ. শিবপ্রকোষ্ঠ বা মন্দিরপ্রকোষ্ঠে শিব (শিবলিঙ্গ) : বৃষপ্রকোষ্ঠের ওপর বৃষপ্রকোষ্ঠের চেয়ে সর্বাঙ্গীণভাবে একটু ছোট চৌকো আয়তাকৃতি মন্দিরপ্রকোষ্ঠ, এই প্রকোষ্ঠের ভেতর ১টি শিব নির্মাণ করা হয়। এখানে মূলত শিবকে উপলক্ষ করে শিবের প্রতীকরূপে শিবলিঙ্গ নির্মাণ করা হয়। কোনো ক্ষেত্রে শিবপ্রকোষ্ঠের ওপরের পাটাতন অপরাপর সমতল ছাদের মতো না করে দৃশ্যত বাংলার চিরায়ত দোচালা কুঁড়েঘরের আদলে নির্মাণ করা হয়। ঙ. রথ : শিবপ্রকোষ্ঠের ওপর শিবপ্রকোষ্ঠের চেয়ে সর্বাঙ্গীণভাবে একটু ছোট চৌকো আয়তাকৃতির মুক্ত-প্রকোষ্ঠ, এই প্রকোষ্ঠের ওপর থাক-থাক বিন্যাসে রথের চূড়া নির্মাণ করা হয়। এখানে রথের সার্বিক কাঠামো নির্মিত না হলেও এর আঙ্গিকগত সকল বৈশিষ্ট্য সমুন্নত রেখেই বৃষকাষ্ঠের এই রথ অংশটি নির্মিত। রথের স্থাপত্যশৈলীতে ২টি ভাগ রয়েছে—প্রথমত : রথপ্রকোষ্ঠ, দ্বিতীয়ত : রথচূড়া। চ. ত্রিশূল : রথের শীর্ষচূড়ায় লোহার তৈরি ১টি ত্রিশূল পুঁতে দেওয়া হয়। ত্রিশূল মহাদেব শিবের সার্বক্ষণিক প্রহরণ। ত্রিশূলটি দৃশ্যত একটি লম্বা দণ্ডের শীর্ষচূড়ায় অর্ধচন্দ্রাকৃতি ফর্মের ওপর বর্শাফলকযুক্ত অস্ত্রবিশেষ। এখানে ত্রিশূলটি ধর্মীয় অনুভূতিতে বৃষকাষ্ঠের পাহারায় স্থাপিত হয়েছে। স্থান, কাল, পাত্র, মানুষের সামর্থ্য ও রুচিভেদে মাপ, বিষয়বস্তু, কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য, নির্মাণশৈলীর ভিন্নতায় বৃষকাষ্ঠে ভিন্নতর বিষয়বস্তু সংযোজিত হয়, যেমন—জগন্নাথপ্রকোষ্ঠে জগন্নাথ, বলরামপ্রকোষ্ঠে বলরাম, সুভদ্রাপ্রকোষ্ঠে সুভদ্রা ও যক্ষপ্রকোষ্ঠে যক্ষ নির্মাণ করা হয়। এই সবগুলোই শিবপ্রকোষ্ঠে শিবলিঙ্গের মতো প্রতীকরূপে নির্মাণ করা হয়। উল্লিখিত বিষয়বস্তুগুলো কখনোই একত্রে একটি বৃষকাষ্ঠে সংযোজিত হয় না। একইসাথে বিভিন্ন প্রকোষ্ঠের ছাদ এবং খুঁটির গায়ে রিলিফ পদ্ধতিতে বাঘের মুখ, হাতির মুখ, মহাদেব, যুগল রাধা-কৃষ্ণ ও তালপাতার পাখা নির্মাণ করা হয়। বৃষকাষ্ঠ নির্মাণের ক্ষেত্রে এর প্রতিটি বিষয়বস্তুর ওপরে ও নিচে ১টি করে পাটাতন নির্মাণ করা হয়। এই পাটাতন প্রতিটি বিষয়বস্তুকে একটি থেকে অন্যটিকে পৃথক করে এবং প্রতিটি বিষয়বস্তুর চারপাশে ফ্রেমের মতো কাজ করে। কোনো ক্ষেত্রে এই পাটাতনে প্রাকৃতিক দৃশ্য চিত্রায়িত করা হয় এবং মৃতব্যক্তির নাম, ঠিকানা, জন্মতারিখ, মৃত্যুতারিখ লিখে দেওয়া হয়। বৃষকাষ্ঠ তৈরির ক্ষেত্রে এর পবিত্রতা রক্ষার্থে প্রথাগত কিছু নিয়মকানুন রয়েছে, যেমন—সূত্রধর শিল্পীর বংশীয় কেউ মারা গেলে অশৌচকাল পর্যন্ত তিনি বৃষকাষ্ঠ নির্মাণ করেন না। তার স্ত্রী সন্তান জন্মালে আঁতুড়কাল পর্যন্ত তিনি বৃষকাষ্ঠ নির্মাণ করেন না। বৃষকাষ্ঠ সাধারণত বেলকাঠ ও নিমকাঠ দিয়ে তৈরি করা হয়। ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে অন্যান্য কাঠ ব্যবহারের প্রচলন থাকলেও ব্রাহ্মণদের ক্ষেত্রে নিমকাঠ অত্যাবশ্যক। কাঠের প্রাচীন ধর্মীয় ভাস্কর্য নির্মাণের মতো বৃষকাষ্ঠ নির্মাণের ক্ষেত্রেও এর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ধর্মীয় ও সামাজিক প্রথাগত (শুদ্ধাচার) নিয়মকানুন রয়েছে। গাছ কাটার পূর্বে ব্রাহ্মণ প্রথম গাছকে পূজা দেবেন, তারপর গাছের গায়ে কুঠার পরিচালনা করবেন (কোপ দেবেন), শেষে সূত্রধর কুঠার দিয়ে গাছ কাটবেন। একইভাবে বৃষকাষ্ঠ নির্মাণের ক্ষেত্রেও ব্রাহ্মণ প্রথম কোপ দিয়ে বৃষকাষ্ঠের নির্মাণ প্রক্রিয়া শুরু করবেন, পরে যথারীতি সূত্রধর ও তার সহযোগীরা নির্মাণকাজ সম্পন্ন করবেন। সূত্রধর নিজ হাতে বৃষকাষ্ঠের তুলনামূলকভাবে বড় অংশে উজ্জ্বল এবং ছোট অংশগুলোতে গাঢ় ও সর্বশেষে কালো রং ব্যবহার করে রঙের কাজ সম্পন্ন করেন। যেসকল বৃষকাষ্ঠ বেল ও নিমকাঠে নির্মিত সেসকল বৃষকাষ্ঠে কোনো রঙের ব্যবহার করা হয় না। এ ক্ষেত্রে বৃষকাষ্ঠের সমস্ত শরীরে হলুদবাটা মেখে দেওয়া হয় মাত্র। পূর্বে পাঠিয়ে দেওয়া সাজ-সজ্জার নতুন কাপড়, বিছানা, মাদুর ইত্যাদি দিয়ে বৃষকাষ্ঠকে সজ্জিত করে শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের দিন প্রাতঃকালে শকটে শুইয়ে সূত্রধর নিজে মৃতব্যক্তির বাড়িতে পৌঁছে দেন। এসময় বাড়ির প্রবীণ ও অভিজ্ঞ নারীগণ বৃষকাষ্ঠকে চিনি, বাতাসা ও পানি দিয়ে আপ্যায়নের সাথে গ্রহণ করেন। তারপর বাড়ির প্রবীণ ও অভিজ্ঞ পুরুষগণ বৃষকাষ্ঠকে কাঁধে করে মৃতব্যক্তির ঘরের মেঝেতে মাদুরের ওপর শুইয়ে দেন। বৃষকাষ্ঠের গোসল ও সাজসজ্জা সম্পন্ন করেন বাড়ির প্রবীণ, অভিজ্ঞ নারী, এয়ো ও কিশোরীরা। প্রথমে প্রবীণ ও অভিজ্ঞ নারীগণ বৃষকাষ্ঠের শরীরে হলুদবাটা মাখিয়ে গোসল করান। গোসল শেষে বৃষকাষ্ঠের (পুরুষের ক্ষেত্রে) মাথায় শোলার টোপর, (নারীর ক্ষেত্রে) শোলার সীতা ময়ূর, বৃষের মাথায় শোলার টোপর, পায়ে সিঁদুরের ফোঁটা, পুরুষ মানবাকৃতির কোমরে সুতোর বাঁধন, গলায় কাঁচা ফুলের মালা, নারী মানবাকৃতির কপালে সিঁদুরের ফোঁটায় সাজানো হয়। অঙ্গসজ্জা শেষে বাড়ির প্রবীণ ও অভিজ্ঞ পুরুষগণ বৃষকাষ্ঠকে কাঁধে করে বাড়ির উঠানে যজ্ঞবেদীর ঈশানকোণে পুঁতে দেন এবং সেখানে বাড়ির প্রবীণ ও অভিজ্ঞ নারীগণ পান, সুপারি, হলুদ দিয়ে বরণ করেন। বরণ শেষে বাড়ির সকল প্রবীণ, অভিজ্ঞ নারী, এয়ো ও কিশোরীরা বৃষকাষ্ঠকে কেন্দ্র করে বৃত্ত রচনা করে চার পাশে পাক দেন, উলুধ্বনি দেন ও প্রণাম দেন। শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের সার্বিক পূজা ও আচার-অনুষ্ঠান শেষে বৃষকাষ্ঠকে নির্ধারিত স্থানে স্থাপনের পূর্বে যজ্ঞমঞ্চের ঈশানকোণে পোঁতাবস্থায় একাধারে ১-৩ দিন-রাত্রি রেখে দেওয়া হয়। এসময় মৃতব্যক্তির রক্তের সম্পর্কীয় বা নিকটাত্মীয় কেউ একে পাহারা দেন, যেন বৃষকাষ্ঠের কোনো অঙ্গহানি বা ক্ষতি না হয়। বিশেষ করে বৃষকাষ্ঠের শরীরের কাপড় (চাদর, গামছা, নামাবলী), ডানহাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি, নাক যেন চুরি না হয়। উপর্যুক্ত অঙ্গ ও দ্রব্যগুলো চুরি বা ক্ষতি হলে মৃতব্যক্তির স্বর্গযাত্রা ব্যাহত হবে। এভাবে ১-৩ দিন-রাত্রির পরদিন প্রাতঃকালে বৃষকাষ্ঠকে তেমাথা, চৌমাথা, মন্দিরের উঠান, চাতাল, শ্মশান বা পুকুরপাড় ইত্যাদি সচল স্থানে স্থাপন করা হয়। যেন মৃতব্যক্তি সহজে সর্বসাধারণের দৃষ্টিতে থাকেন, তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষী, পথচারীগণ তাঁকে স্মরণ করেন, তাঁর মঙ্গল কামনা করেন ও স্বল্প সময়ে সবার কাছ থেকে তিনি যেন হারিয়ে না যান।