ঢাকায় বোশেখের প্রচণ্ড গরমের মাঝেই কালো মেঘের আভাস। বর্ষণ আসছে আসছে ভাব। বর্ষণ আসে না। একটা টিভি চ্যানেলের কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে কখন যে মাঝ রাত পার হয়ে গেছে টেরই পাইনি। বিজয় সরণী পেরোতেই রাস্তায় বৃষ্টির ফোঁটা দেখলাম। কাজী পাড়ায় পৌঁছাতেই ঝড়ো বৃষ্টির শুরু। আমার মাথায় লাইভ প্রোগ্রাম ‘ফ্রাইডে স্পেশাল’-এর থিম। পল্লবী সাড়ে এগারো থেকে বামের মোড়ে বাঁক নিতেই গাড়ির স্টার্ট বন্ধ হয়ে যায়। বাইরে প্রত্যাশিত সেই ভারী বর্ষণ। ড্রাইভারের অসহায় মুখ। দুবার বিফল চেষ্টার পর গাড়ির হেড লাইট জ্বলে উঠল। রাস্তার পাশের বন্ধ শপিংমলের সিকিউরিটি গার্ডও এ ঝড়ো বৃষ্টিতে উধাও। বাংলা সিনেমার হিরোর মতো এক যুবক এগিয়ে আসছে আমার গাড়ির দিকে। তার হাতে জোনাকির মতো আলো। গাড়ির পাশে যুবকটি আসতেই তার হাতের আলো নিভে যায়, চেনা কণ্ঠ। আমার কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে।
—কোনো সমস্যা বস?
—আরে পলাশ, এত রাতে তুমি? গাড়ির স্টার্ট বন্ধ হয়ে গেছে।
—নো প্রব্লেম। সারা রাত এখানে আপনার গাড়ি থাকলেও কেউ ধরবে না। ও চেষ্টা করুক। আপনি একটু চা খান।
—এত রাতে?
—আপনার সমস্যা না থাকলে চলে আসতে পারেন।
আঁকাবাঁকা গলির পথ পেরিয়ে অনেকটা বস্তি সদৃশ একটা খুপড়ি ঘরে যখন ঢুকলাম তখন প্রায় ভিজেই গেছি। সামনে পলাশ। কেরোসিনের টিনের বাতি। বারো-তেরো বছরের এক কিশোর চা বানাচ্ছে। পাশে তিন জন ঝিমানো যুবক।
কামাইল্লা, আমার কাপটায় চা দে। চিনি কম দিবি। হাইব্বা ওঠ। বস, মাথাটা মোছেন। আমাকে দেখে যুবক তিন জন দূরে সরে যায়। দোকানি কামালের মুখে আলতো হাসি। পলাশের হাত থেকে গামছাটা নিয়ে শরীরটা মুছলাম। একটু হিমেল পরশ। আমার হাতে একটা চায়ের মগ। কেরোসিনের আলোয় মুখোমুখি আমি আর পলাশ। বাইরে বৃষ্টির শব্দ। নীরবতা আমিই ভাঙলাম।
—কখন বাসায় ফিরবে পলাশ?
—ফিরব।
—তোমার ঘুমানো উচিত।
—ঘুম আসে না, বস।
—সামনে তাকাও পলাশ।
হঠাত্ আমার সেল ফোন বেজে ওঠে। গাড়ি ঠিক হওয়ার খবর পেলাম। বৃষ্টির তেজ কমে গেছে।
—আমাকে উঠতে হবে, পলাশ।
—একটা কথা বলব, বস।
—বলো
—নির্জনা। না থাক, অন্যদিন বলব।
বাসায় পৌঁছলাম, তখনো বৃষ্টি থামেনি। আমি যে এলাকায় থাকি সেখানে পলাশদের পরিবার বেশ দাপুটে বিত্তবান। পলাশের সাথে আমার রাস্তায় দেখা হতো। ও সালাম দিত। আমি উত্তরে বলতাম, ভালো আছেন? একবার ব্যাংককের বামুন গ্রাদে ট্যাক্সি থামিয়ে হাঁটতেই দেখি মোটা মতো এক বয়েসি লোকের হাত ধরে হাঁটছে এক মাঝ বয়েসি। পরিচিত মুখ। অনেকক্ষণ তাকাবার পর ছেলেটি প্রায় দৌড়ে এসে আমার হাত ধরে। আরে আপনি। এখানের সব বাঙ্গাল চোর। ঢাকায় পাইলে হালাগো হাড্ডি ভাইঙ্গা হালামু। সেই পরিচয়ে জানলাম, ওর বাবার ঢাকায় কয়েকটা গার্মেন্টস আছে। চিকিত্সা থেকে শুরু করে থাকার জায়গার ব্যাপারে আমি পলাশকে কিছু হেলপ করলাম। ব্যাংককেই সে আমার মাথা ছুঁয়ে বলেছিল—সারা জীবন কাউকে বস বলিনি। আপনি আমার রিয়াল বস।
চার দিন হয়েছে নির্জনা আমেরিকা থেকে ঢাকায় এসেছে। দেখে একদম বোঝার উপায় নেই নির্জনার বড় মেয়ে লামিনার বয়স বারো। রাঙানো সিল্কি ছড়ানো এলো চুলে চেহারায় এখনো মাধুরী মাধুরী ভাব। থাকে ‘সান ভেলী’ বাবার বাড়িতে। সান ভেলীর তিনতলা এখান থেকে স্পষ্ট দেখা যায়। একটা সেলুন যার নাম ‘বরিশাল বারবার শপ’। পলাশের অস্থায়ী নিবাস আপাতত ওখানেই। ১৯৮৬-এর এক বিকেলে মিরপুর চৌদ্দ নম্বরের এক ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের শেষের দিকের ছাত্র পলাশ আহমেদ। ছেলেটির গান শোনার জন্য অপেক্ষায় থাকে নির্জনা। বন্ধুদের কাছ থেকে শুনেছে নির্জনা ছেলেটির কথা। ভালো গায়, ক্রিকেটও ভালো খেলে। নির্জনা জেনেছে, ছাত্র হিসেবেও ছেলেটি মন্দ নয়। মনে মনে তার ছবি আঁকে নির্জনা। ... তখন ক্লাস সেভেনে পড়ে সে। বসন্তের এক ফাংশানেই পলাশের কণ্ঠে নির্জনা শোনে ‘তুমি রোজ বিকেলে আমার বাগানে ফুল নিতে আসতে’। কী কষ্ট মনের মাঝে। এই ছেলেটিকেই তো দেখার অস্ফুট বেদনা। পল্লবীতে একদিন এক প্রাইভেট টিউটরের বাসা থেকে সন্ধ্যায় ফিরছে নির্জনা। গালে তেল ধরে রাখা যাবে এরকম টাইপের কয়েকজন পিছু নেয় নির্জনার। মুখে বিভিন্ন প্রেমবাণী। নির্জনার চোখে প্রায় জল এসে গেছে। ক্রিকেটের ব্যাট হাতে ফিরছে পলাশ। চোখে চোখ পড়ে।
—ভাইয়া।
এ যেন লতাজীর কণ্ঠ। ফিরে তাকায় পলাশ। স্কুলেও দেখেছে মেয়েটিকে। আজ পাড়ায়। মুখের দিকে তাকাতেই নির্জনার চোখের জল দেখতে পায় পলাশ। প্রথম নায়কের পিঠে ব্যাট পড়তেই দ্বিতীয় নায়ক ওশান ব্লোট হয়ে যায়। তৃতীয় জন শিয়ালের মতো একটু দেখে, আবার দৌড়। ছেলেগুলো আগেই চিনত পলাশ আহমেদকে।
সেই তো শুরু। পলাশের জীবনে প্রথম প্রেম প্রথম কবিতার মতো। লাল টকটকে মোটরবাইকের পরিবর্তে লাল স্পোর্টস কারের ড্রাইভিং সিটে পলাশ। পাশের সিটেই নির্জনা। পলাশ তাকে ডাকে কখনো মাধুরী কখনো ডায়না। কাছে আসে, আরো কাছে। অবারিত স্বপ্নে বিভোর দুজন। কখনো লং ড্রাইভ, কখনো বা দামী রেস্টুরেন্টে সময় কাটে শুধু পলকহীন চোখে। ঢাকা কলেজের কমার্স ব্যাক গ্রাউন্ড নিয়ে শুরু হয় পলাশের দ্বিতীয় জীবন। আর এখানেই নির্জনার গোলাপি স্বপ্নের ফিকে হওয়া শুরু। স্টুডেন্ট পলিটিকসে জড়িয়ে পড়ে পলাশ। ঢাকা কলেজের গন্ডি ছাড়িয়ে পলাশের নাম ছড়িয়ে পড়ে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে। সামনে পলাশের অনার্স পরীক্ষা। প্রিপ্রারেশন ভালো না। তারপরে মাঝে মাঝে হোস্টেলে পুলিশী হানা। কয়েকটা নোটস নিয়ে পলাশ বাসায় চলে আসে। একটু রাত করেই ঘুমিয়েছে পলাশ। বোন আদুরীর ডাকে ঘুম ভাঙে পলাশের—এ দাদা ওঠ শিগগির। তোর শাশুড়ি এসেছে। ফল আর মিষ্টি নিয়ে। মুখে কোনো রকম জল চাপিয়ে পলাশ ড্রইংরুমে গিয়ে দেখে, মাঝ বয়েসি দুই মহিলা পলাশের মা’র সাথে গল্প করছে। নির্জনার মাকে চিনতে পারে পলাশ। সালাম দেয়। উত্তরে মাথা নেড়ে নির্জনার মা বলে, বাবাজি, শতায়ু হও তুমি। এ হলো আমার ছোট বোন। চোখটা লাল কেন? খুব পড়ার চাপ বুঝি। পলাশ শোনে শুধু। মহিলা ননস্টপ বলে যাচ্ছে। একদম শেষে মহিলা বলে ওঠে, পলাশ বাবাজির সাথে আমি একটু একা কথা বলতে চাই। আচমকা বুকে চাপ অনুভব করে পলাশ। নির্জনার মাকে নিয়ে নিজের ঘরে আসে।
—বাবা আমি তোমার মায়ের মতো। আমার কথা রাখবা কথা দাও। মাথা নাড়ে পলাশ।
—আমাকে ছুঁয়ে বলো।
—বললাম।
—জান বাবাজি, ভালোবাসার মানুষকে বিয়ে করতে নেই। তাকে শুধু ভালোবাসা যায়। কাছে পেলে ভালোবাসা নষ্ট হয়ে যায়।
জনা শুধু কাঁদছে। ওর মুখটা যদি তুমি দেখতে। এক ডাক্তার ওকে পছন্দ করেছে। জনা কিছুতেই বিয়েতে রাজি নয়। পরে আমি তোমার কাছে ছুটে আসলাম। তুমি যদি বলো, পরশু জনার গায়ে হলুদ।
চোখে জল এসে যায় পলাশের। কই, কাল নির্জনার সাথে নিউমার্কেটে আইসক্রিম খেয়েছে সে, কিছুই তো বলেনি ও। সব ওলট পালট হয়ে যায় পলাশের।
জানো বাবা, বিয়ের ঘটক হলো সামরিক কর্মকর্তা আমিন। এবার বুঝতে পারে পলাশ। ইনডিরেক্টলি থ্রেটও দিচ্ছে মহিলা।
বাবা, তোমার হাত ধরে বলছি, আমার মেয়েটাকে ভুলে যাও তুমি। আর তুমি না চাইলে এ বিয়ে হবে না। প্রায় মিনিট পাঁচেক পরে মহিলা শুনতে পায়—
—আমি ভুলে গেলাম।
—ফ্যানের স্পিড কি আর বাড়ে না বাবাজি?
—জি বাড়ে।
—না থাক আর বাড়ানোর দরকার নেই আমি চলেই যাচ্ছি।
—দরজাটা বন্ধ করতে করতেই পলাশ শুনতে পায়, কী আফা বলছি না সামরিক কর্মকর্তার নাম বলো...
—এই চুপ! বের হ তাড়াতাড়ি।
রাতে নির্জনার ফোন আসে। যে ফোনে রাত একদিন ভোর হতো। তা আজ নিতান্ত ভদ্রতার। পলাশের প্রত্যাশার সাথে ছিটেফোঁটাও মিল নেই এ ফোনের।
—তুমি নাকি হলুদে আসছ? আসবা কিন্তু। আমি তোমাকে দেখব পলাশ।
পলাশ আরো কিছু শুনতে চাচ্ছিল। লাইনটা কেটে যায়। সান ভেলীর আলোকসজ্জা শেষ হওয়ার আগের দিন পলাশ আহমেদকে পুলিশ নিউমার্কেট এলাকা থেকে গ্রেফতার করে ঢাকা ইউনিভার্সিটির ডাকসু নির্বাচনপরবর্তী কনক হত্যা মামলার আসামী হিসেবে।
রিমান্ডে শুধু পলাশ নির্জনাকেই দেখেছে। তিন দিন পরে তাকে আনা হলো ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে। কী এক স্বস্তি। তীব্র গরমে এক গ্লাস বরফ মেশানো জলের মতো, নিজেকে নিজে বলে পলাশ—যাক সান ভেলীর আলোক সজ্জা তাকে আর দেখতে হবে না। কী সুখ। সমস্ত শরীরে ব্যথার নীল আঁচড়। তবু চোখভরা জল। কার বিহনে? পলাশ ভুলতে চায় সব। রাতে পুরান ঢাকার কালা ঠান্ডু তার সেলে ঢোকে। বস, এই সিরাপটা খাও ব্যথা ভালো অইয়া যাইবো। গাটা একটু টিপে দেই। কী এক মেডিসিন বাবা, ওটা খেলেই শুধু নির্জনার মুখটা দেখতে পায় না পলাশ। কেউ বলে ডাইল কেউ বলে ফেন্সি। পলাশ বলে সিরাপ। সেবার জেল থেকে বের হয়েই বদলে যায় পলাশ। অনার্সটা আর পাশ করা হয় না তার। সেই সিরাপ আর ঠিকাদারি নিয়ে তার নতুন জীবন। এখন এ সিরাপের মধ্যেই সে নির্জনাকে দেখতে পায়। মেয়ে ছেলের কোনো দোষ নেই তার। পৈত্রিক সম্পত্তি আর নিজের ব্যবসার জোরে পলাশ আহমেদ এখন কোটিপতি। কারো সমস্যার কথা বললেই পলাশ আহমেদের পকেটে হাত ঢুকে যায়।
আশির দশকে বরিশাল উদয়ন স্কুলে গিয়েছিলাম ভাইজির একটা কাজে। সাদা কানাডিয়ান ফাদারকে ভারী সজ্জন বলে মনে হচ্ছিল। কথায় কথায় বলেছিল, আমার সন্ন্যাসী জীবন ভাই। প্রায় চল্লিশ বছর ধরে আছে এ বাংলায়। হূদয়ে ভেসে উঠেছিল তখন মাদার তেরেসার মুখ, আজ ভেসে উঠছে ব্যাংককের এইচআইভি আক্রান্তদের নিয়ে গড়ে ওঠা সুবর্ণ হোমস। মাঝে মাঝে নিজেকে কাজ ছাড়া একাকী মনে হয় খুব। এখন একটু শীত ঢাকায়। অফিসে আমার সামনে রাইনা। অনর্গল বলে যাচ্ছে। আমি কখনো শুনছি, শেয়ার করছি বা তাকিয়ে ওকে দেখছি। আমি রাইনাকে বললাম বরিশালের সেই ফাদারের কথা। তার অনেক প্রশ্নের জবাব না পেয়ে আমার দিকে তেড়ে আসে। আমি হাসি। আমাকে ধমকের সুরে বলে, এই যে মিস্টার, শেষ জীবন আপনার কিভাবে কাটবে?
—কেন বরিশালের ওই ফাদারের মতো। মানে সন্ন্যাসী জীবন। হাসে রাইনা।
এর মাঝেই পলাশের ভিজিটিং কার্ড পেলাম। আমি তাকে ভেতরে পাঠাতে বললাম। রাইনা চুপ হয়ে যায়। তার হাসিও নিমিষে বিলীন। পথের পরিচয়ে অনেকে আপন হয়ে যায়, যেমনি পলাশ তেমনি রাইনা। আজ দুজনেই আমার সামনে বসা। রাইনার কথা ছোট্ট একটা গল্প হয়ে গেছে। এবার বুঝি পলাশের পালা।
হঠাত্ পরিবেশটা একটু নীরব হওয়াতে পলাশ একটু ইতস্তত বোধ করে। চলে যেতে চায়। আমি ইশারায় বসতে বলি। রাইনার সাথে পরিচয় করিয়ে দিই। পলাশকে আজ নিখাদ পরিপাটি একজন স্বতঃস্ফূর্ত মানুষ মনে হচ্ছে।
—বসের কাছে আসলে মনটা ভালো লাগে ম্যাডাম। আপনার বস বোধহয় জাদু জানে। হেসে জবাব দেয় রাইনা।
—আমারও তা-ই মনে হয়।
—জানো রাইনা, পলাশ কিন্তু ঢাকা কলেজের স্টুডেন্ট ছিল।
—তাই?
—ভালো গিটার বাজায়, গায়ও ভালো।
—বস বাড়িয়ে বলছে। ম্লান হাসে পলাশ। চিতল মাছের কোপতায় মধ্যাহ্নভোজ সেরে ক্ষণিকের আড্ডা।
শেষ বিকেল। রাইনা চলে গেছে। হাতের কিছু কাজ সেরে পলাশকে নিয়ে বেরোব—এমনটাই ভাবছি।
—এ সময়টা খুব ভালো কেটেছে বস। বাসায় ফিরলেই যেন কেমন লাগে। একা থাকলেই ফেন্সিডিল খেতে ইচ্ছে করে। আর খেলেই নির্জনা কাছে চলে আসে। যত খাই, তত। আমি পলাশের মাথায় হাত রাখলাম, সামনে তাকাও পলাশ।
পলাশের চোখে জল। আমাকে আপনার স্বপ্নচূড়ায় নিয়ে চলেন বস। আমি আর ফেন্সিডিল খাব না। নির্জনাকেও আর কাছে পেতে চাই না।
—অবশ্যই তুমি যাবে এবং ওসব আজে বাজে জিনিস তুমি খাবে না।
—আমি সারা জীবন ওখানেই কাটাব। আর ফিরব না।
—আচ্ছা তোমাকে ফিরতে হবে না পলাশ।
—সত্যি?
—হ্যাঁ সত্যি।
বাতাসের সাথে ভারী বৃষ্টি। ক্রমেই বাড়ছে। দোকানপাট খোলা নাই বললেই চলে। বরিশাল বারবার শপের মালিক কার্তিক একটু চিন্তিত, ঝড়ের জন্য নয়, তার বস পলাশ আহমেদের জন্য। ঝড়ো হাওয়া বইছে, মাঝ রাত। সেই সন্ধ্যে থেকেই পলাশ খেয়ে চলছে।
—কর্তিক, আর একটা বোতল দে রে ভাই।
—বস, বাইরে অনেক বাতাস।
—নির্জনা তুমি এত দেরিতে এলে কেন? পাঁচ নম্বর বোতলটা আর খোলা হয় না কার্তিকের। পলাশ আর কথা বলছে না। রাত তিন টার দিকে পলাশের শরীরে হাত রাখে কার্তিক, শরীরটা বেশ ঠান্ডা ও শক্ত মনে হয় তার কাছে। কার্তিক হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। বন্ধ মুঠোর কাগজটি যত্ন করে পকেটে রাখে যেখানে লেখা ‘তোমার মনকে ছোঁব একদিন’।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁত ব্রাশ করছে নির্জনা। বৃষ্টিস্নাত নীল আকাশ। ওই তো সেই দূরের কাশবন ঝিলের স্বচ্ছ নীল জল। সেই ঝাপসা পুরোনো অতীত। চোখ পড়ে বরিশাল বারবার শপের ওপর। মানুষের ভিড়।
—কার্তিকের সেলুনে এত ভিড় কেনরে সাবিনা? মুখে পেস্টের ফেনা নিয়েই বলে নির্জনা।
—পলাশ মস্তান পটল তুলছে আফা। তুলবো না, যে ডাইল খাইতো আফা। নির্জনা আরো কিছুক্ষণ তাকিয়ে ভেতরে চলে যায়। ব্রেকফাস্টের টেবিলে রুটিতে বাটার মাখতে মাখতে নির্জনার মা একা একা বলে যায়, মরবো না আবার যে ডাইল খাইতো, তয় একটা ভালো দিক ছিল পোলাডার, কোনো মাইয়া ছেলেকে ডিস্টার্ব করত না। কফির কাপে চুমুক দেয় নির্জনা। ঠান্ডা স্বরে বলে, সাবিনা পেপার দিতে এত দেরি কেনরে আজ?
