একালের রূপকথা

আপডেট : ০৫ জুন ২০১৪, ১৯:১৯
পার্সিনেট-এর গল্প জানো? মিশকালো ত্বক আর প্রপাতের মতো ছড়িয়ে থাকা ঝলমলে সোনালি চুলের মেয়ে। ছোট্ট পার্সিনেটকে গোথেল কুড়িয়ে পেয়েছিল শস্যক্ষেতে আর বন্দি করে রেখেছিল উঁচু মিনারের এক দুর্গে। কেন জানো? গোথেল ছিল ডাইনি। ওর আত্মা অমর কিন্তু তাকে আশ্রয় দেবার জন্য প্রয়োজন মানুষের শরীর। বয়সের সাথে সাথে চোখ ক্ষয়ে যায়, দাঁত পড়ে, শিরদাঁড়া ন্যুব্জ হয়ে যায়। গোথেল বৃদ্ধ ভঙ্গুর দেহকে ত্যাগ করে প্রবেশ করে তরুণ সজীব দেহে। যুগের পর যুগ এভাবে মৃত্যুহীন থাকে গোথেল। পার্সিনেটকে গোথেল লালন করছিল ভবিষ্যতের নতুন আশ্রয় হিসেবে। কিন্তু গোথেল জানত না পার্সিনেটের আছে জাদুর শক্তি। পার্সিনেট ওর চুলকে যেভাবে ইচ্ছে নিয়ন্ত্রণ করতে পারত। গোথেল ঘুমিয়ে পড়লে পার্সিনেট চুল দিয়ে পাখা বানিয়ে উড়ে বেড়াত দূর থেকে দূরে। এভাবে উড়তে উড়তে পার্সিনেটের পরিচয় হলো এক রাজপুত্রের সাথে। বিশাল গাছের নিচে জ্যোত্স্নার আলো মেখে ওরা ভালোবাসার গল্প করত। কিন্তু লুকোনো সম্পর্ক কি বেশিদিন ঢেকে রাখা যায়? গোথেল টের পেয়ে গেল একদিন। অন্ধ আক্রোশে পার্সিনেটের সব চুল কেটে দিল কুচকুচ করে। পার্সিনেট আর বের হতে পারে না। মিনারের জানালায় বসে দীর্ঘশ্বাসের সাথে দিগন্তের দিকে তাকিয়ে থাকে রাজপুত্রের অপেক্ষায়। আর রাজপুত্র খুঁজে মরে পার্সিনেটকে। অরণ্যে, পাহাড়ে, নদীতীরে। দীর্ঘদিন ঘুরতে ঘুরতে রাজপুত্র একদিন এসে দাঁড়াল মিনারের নিচে। দেখল, জানালায় মন ভার করে বসে আছে পার্সিনেট। কিভাবে উদ্ধার করবে পার্সিনেটকে? দুর্গের লোহার দরজা ভাঙার কোনো উপায় যে রাজপুত্রের জানা নেই। কিন্তু পার্সিনেটের আছে জাদুশক্তি। সেই শক্তিতে ক্ষুদে ক্ষুদে চুল বড় করে তুলতে লাগল পার্সিনেট। প্রথমে হাঁটু অব্দি। সেখান থেকে পা। আরো অনেক লম্বা। জানালা খুলে সেই চুল নিচে এলিয়ে দিল পার্সিনেট। রাজপুত্র চুপি চুপি উঠে এল চুলের মই বেয়ে। তারপর ঘুমন্ত গোথেলের হূদপিণ্ডে ছুরি বসিয়ে পালিয়ে গেল পার্সিনেটকে নিয়ে। রাজার প্রাসাদে রাজপুত্র আর পার্সিনেট সুখে দিন কাটাতে লাগল। ঘুমাতে যাবার আগে শারমিনের পাশে শুয়ে শুয়ে বই পড়ে শোনাচ্ছিল রাহেলা। রাজপুত্র আর পার্সিনেটের সুখের রেশ নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল শারমিন। শারমিনের চুলে হাত বুলিয়ে আদর করল রাহেলা। খুব লক্ষ্মী মেয়ে। দশে পড়ল। এখনো রাতের বেলা মা-র কাছে গল্প না শুনলে ঘুমাতে পারে না। শারমিনের গায়ের কাঁথাটা ঠিক করে দিল রাহেলা। বিছানা থেকে নেমে মশারি ভালো করে গুঁজে দিল। তারপর দরজার দিকে ঘুরে দাঁড়াতে গিয়ে আয়নায় নিজের প্রতিফলন দেখে রাহেলার পা থমকে গেল। পার্সিনেটের মতো ওর গায়ের রঙ কালো। চুল সোনালি নয়। তবে ঘন কালো চুল ছড়িয়ে আছে হাঁটু ছাড়িয়ে। পার্সিনেটের মতো রাহেলাও কি বন্দি নয় সংসার নামের দুর্গে? শুধু তফাত্ একটাই। রূপকথার গল্পের মতো রাহেলার মুক্তি মিলবে না। কোনো রাজপুত্র এসে ওকে উদ্ধার করবে না এই কারাগার থেকে। রাহেলার মন খুব খারাপ হয়ে গেল। ছড়ানো চুল খোঁপায় গুছিয়ে নিয়ে ঘোমটায় মাথা ঢেকে রাহেলা শারমিনের ঘর থেকে বের হয়ে এল। খাবার টেবিলে বসে ফেরদৌস সামিকে অঙ্ক করাচ্ছিল। সামি ক্লাস টেনে উঠল এবার। প্রতিরাতে খাবার পর ফেরদৌস সামিকে নিয়ে বসে। সামি পড়াশোনায় ভালো। তবে মাঝে মাঝে ভুল করে ফেলে। আর ফেরদৌসের বকা খায়। বকাবকি কান্নাকাটি চলে কিছুক্ষণ। আজকেও সে-রকম একটা পরিস্থিতি তৈরি হতে চলেছে। সামি মাথা নিচু করে চুপ করে আছে। আর ফেরদৌস ভুরু কুঁচকে দেখছে সামির অঙ্কের খাতা। নিশ্চয়ই কোনো ভুল করেছে সামি। তাই ফেরদৌসের মুখ এত গম্ভীর। রাহেলা জানে এখন বেশ কিছুক্ষণ ধরে চলবে বাবা-ছেলের টানাপোড়েন। কাছে থেকে ফেরদৌসের কঠিন কঠিন কথা আর সামির ফোঁস ফোঁস কান্না শুনতে রাহেলার আর ভালো লাগে না। বাইরের ঘরে এসে খুব অল্প শব্দে টিভি চালায়। সব চ্যানেলে এখন খবর হচ্ছে। হরতাল আর ভাঙচুরের খবর ছাড়া আর কিছু নেই। রাহেলার ভালো লাগে না দেখতে। হিন্দি সিরিয়াল হচ্ছে একটা চ্যানেলে। রাহেলার বিরক্ত লাগে। শুধু বউ আর শাশুড়ির ঝগড়াঝাঁটি। তাছাড়া ফেরদৌস পছন্দ করে না। রাহেলা দেখলে হয়তো বকবে না, কিন্তু মুখ গম্ভীর করে রাখবে। তার চেয়ে না দেখাই ভালো। টিভি বন্ধ করে রাহেলা নিজের ঘরে চলে আসে। ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে মাথা থেকে ঘোমটা সরায়। খোঁপা খুলে চুল সামনে নিয়ে আসে। ঘন মোলায়েম চুল রাহেলার। রাহেলা সুন্দরী নয়। গায়ের রঙ কালো। তবে ঘিরে থাকা চুলের বাহার ওর মুখশ্রীকে অন্যরকম মাত্রা দিয়েছে। ছোটবেলায় কে যেন বলেছিল ওর চুল খুব সুন্দর। তখন থেকে চুলের অনেক যত্ন করে রাহেলা। ম্যাগাজিন ঘেঁটে ঘেঁটে আবিষ্কার করে চুলের যত্নের বিভিন্ন উপায়। কতরকমভাবে যে রাহেলা চুল সাজাতে পারে! ওর ঘন চুল সামান্য হাতঘোরানো এলো খোঁপাতেই বাহারি হয়ে ওঠে। তাছাড়াও কত দেশি-বিদেশি স্টাইল শিখেছে রাহেলা! ছোট ছোট রিং ঘেরা খোঁপা। ডাবল ফ্রেঞ্চ, ফ্রেঞ্চ টুইস্ট। হিন্দি ছবির নায়িকাদের মতো কোঁকড়ানো একগুচ্ছ চুল খোঁপার পাশে দুলিয়ে দেওয়া। রাহেলা বেণি বাঁধতে পারে তেত্রিশ রকমের! জলপ্রপাতের মতো, মত্স্যকন্যার মতো, গোয়ালিনীর মতো! তার পর সেই বেণি দিয়ে আবার খোঁপা বাঁধে। উত্সবে, অনুষ্ঠানে সবাই অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে রাহেলার চুলের দিকে। হাজার টাকা খরচ করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার্লারে বসে অন্যরা যে চুলবিন্যাস করে, রাহেলার নিজের হাতে সাজানো চুল তারচেয়েও বেশি সুন্দর হয়ে সবার চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। রাহেলা বেশি সাজে না। ছোট দুল, গলায় ছোট লকেট। কোনো জমকালো শাড়ি নেই ওর। নরম রঙের সিল্কের শাড়ি। শুধু ওর চুলের সজ্জায় সে সবার মাঝে উজ্জ্বল হয়ে ফুটে থাকে। এই চুলের টানেই ফেরদৌস কাছে এসেছিল রাহেলার। কলা ভবনের সিঁড়িতে বসে ওরা কয়েক বন্ধু গান গাইছিল। ঘাড়ের পাশ দিয়ে সামনে এনে বুকের ওপর চুল ছড়িয়ে থাকা মেয়েটি দৃষ্টি কেড়েছিল তরুণ প্রভাষক ফেরদৌসের। কিছুদিন পর বিয়ের প্রস্তাব এল বাড়িতে। অপ্সরার মাথার মুকুটের মতো চুলের বেণি আর গলার মিষ্টি গান দিয়ে রাহেলা খুব সহজে জয় করে নিয়েছিল ওকে দেখতে আসা ফেরদৌসের ফুফু-খালাদের মন। আর ফেরদৌসের স্বপ্নে নিজের জায়গা তো করে নিয়েছিল প্রথম দর্শন থেকেই। বিয়ের পর ওর চুল নিয়ে কত যে পাগলামি করত ফেরদৌস! কাজ থেকে ফিরে রাহেলাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে চুলে মুখ ডুবিয়ে সুবাস নিত অনেকক্ষণ। রাতে খাবার পর সোফায় রাহেলার কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে থাকত ফেরদৌস। ওর মুখ ঢেকে রাখত রাহেলার চুলে। আর রাহেলা বুকের ভেতর থেকে সব আবেগ নিবিষ্ট করে গাইত ভালোবাসার গান। কখনো রাহেলার চুল দিয়ে নিজের দুহাত বেঁধে ফেলত ফেরদৌস। বলত, ‘আমাকে বন্দি করে রাখ তোমার ভালোবাসায়।’ রাহেলা হাসতে হাসতে বলত, ‘আমার চুল কি তোমার একমাত্র ভালোবাসা? আমি যদি চুল ছোট করে ফেলি তখন আর ভালোবাসবে না?’ ফেরদৌস সাথে সাথে কপট গম্ভীর কণ্ঠে বলত, ‘খবরদার, এই চুলের মালিক এখন আমি। ওতে একদম হাত দেবে না।’ কী আনন্দঘন ছিল সেই দিনগুলো! সামি এল, শারমিন এল। রাহেলার সংসার পরিপূর্ণ হয়ে উঠল। তারপর সময়ের সাথে সাথে কখন যেন ছন্দ কেটে যেতে থাকল। বদলে যেতে থাকল ফেরদৌস। রাহেলাও কি বদলে গেছে? ওকি আগের চেয়ে বেশি অসহিষ্ণু, অধৈর্য হয়ে গেছে? তাই অস্থির লাগে, ফেরদৌসের সাথে মানিয়ে নিতে পারে না? খোলা, উদার মনের মানুষ ছিল ফেরদৌস। খেলাধুলা করত। হলে টেবিলটেনিস চ্যাম্পিয়ন ছিল। আবার ভরাট গলায় আবৃত্তি করত। পারিবারিক অনুষ্ঠানগুলো রাহেলা আর ফেরদৌস গান আর কবিতা দিয়ে মাতিয়ে রাখত। প্রভাষক ফেরদৌস এখন সমাজবিজ্ঞানের পরিপূর্ণ অধ্যাপক। অনেক দায়িত্ব, সম্মান ওর। ফেরদৌসের লেখা বই বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তক। কর্মক্ষেত্রে ব্যস্ততা বাড়ার সাথে সাথে অন্তর্মুখী, মিতভাষী হয়ে যেতে থাকল ফেরদৌস। কাজ থেকে ফিরে আগে রাহেলার সাথে কবিতার বই পড়ত। দুজন গান শুনতে শুনতে গলা মেলাত। বাচ্চাদের নিয়ে বাইরে বেড়াতে যেত। গত কয়েক বছর সেগুলোর কোনো কিছুই আর ফেরদৌসের করা হয় না। বাড়ি ফিরে মসজিদে চলে যায়। ঘণ্টা দু’য়েক কাটিয়ে বাড়ি ফিরে রাতের খাবার খেয়ে সামিকে পড়াতে বসে। তারপর টিভিতে রাতের খবর দেখে ঘুমাতে চলে যায়। তার মানে এই নয়—ফেরদৌস সংসারবিমুখ হয়ে গেছে। বরং সংসারের প্রতি তার দায়িত্ব-কর্তব্য আরো বেশি নিষ্ঠার সাথে পালন করে ফেরদৌস। শুধু ওর কাজের গুরুত্ব আর অধিকারগুলো বদলে গেছে। সংস্কৃতির চর্চা ওর কাছে আর প্রয়োজনীয় নয়। রাহেলার পাশে বসে গল্প করাটা ফেরদৌসের কাছে এখন সময়ের অপচয় মাত্র। পুণ্য আর পরকালের পাথেয় অর্জন দখল করে রেখেছে ফেরদৌসের চিন্তা-ভাবনা-বোধ। রাহেলা বোঝে, ফেরদৌস চায় রাহেলা নিজেকে রক্ষণশীলতার বাঁধনে বেঁধে ফেলুক। সরাসরি এখন পর্যন্ত কিছু বলেনি ফেরদৌস, কিন্তু পরোক্ষ তির্যকভাবে ইঙ্গিত দিয়েছে। রাহেলাকে খোলা চুলে বাইরে বের হতে দেখলে বলেছে, ‘তোমাকে বাঁধা চুলে বেশি ভালো লাগে।’ অথবা বলেছে, ‘মাথায় ঘোমটা দিও। ছেলেমেয়ে বড় হচ্ছে। মায়ের সম্মানটা যেন ওদের কাছে থাকে।’ যত দিন যায় ফেরদৌসের বিধিনিষেধ ইঙ্গিত ছাড়িয়ে আইনে পরিণত হতে থাকে। কাঁচা বাজার করা রাহেলার প্রিয়। বাজারে ঘুরলে অনেক সময় নতুন কিছু চোখে পড়ে, যা প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় পড়ে না। নতুন উপকরণ আবিষ্কার আর তা দিয়ে নতুন কোনো রান্নার আনন্দ রাহেলার মন ভরিয়ে রাখে। রাতে খেতে বসে ফেরদৌসের তারিফ রাহেলাকে ভরাট করে রাখে। এখন ফেরদৌস আর রাহেলাকে বাজারে যেতে দেয় না। বলে, ‘এত লোকের ভিড়ে তোমাকে ধাক্কাধাক্কি করতে হবে না।’ রাহেলা প্রতিবাদ করতে চায়, ‘কেন, এত বছর ধরে তো আমিই করলাম?’ ফেরদৌস ওকে থামিয়ে দিয়ে বলে, ‘আগে করেছ বলে এখন করতে হবে তার তো কোনো মানে নেই। আমি তো বলছি আমি বাজার করে দেব।’ ভোরে উঠে অফিস যাবার আগে ফেরদৌস বাজার করে দিয়ে যায়। খুঁজে খুঁজে নতুন কিছু কেনার সময়টুকু দিতে পারে না ফেরদৌস। ওদের টেবিল থেকে তাই বৈচিত্র্য আর অবাক বিস্ময় বিতাড়িত হয়ে আটকা পড়ে গেছে একঘেয়েমিতে। রাহেলার মাঝে মাঝে মনে হয়, বাচ্চারা স্কুলে চলে গেলে বাজারে গিয়ে নতুন কিছু কিনে আনে। কিন্তু তার ফলে ফেরদৌসের কী প্রতিক্রিয়া হবে তা বুঝতে না পেরে সাহস করে না। ছোট ছোট এমনি অনেক স্বাধীনতা হারিয়ে গেছে রাহেলার জীবন থেকে। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ফুচকা খাওয়া, হকার্স মার্কেটে ঘামে চুপচুপে হয়ে শাড়ির দরদাম করা, মহিলা সমিতির মঞ্চে গিয়ে নাটক দেখা—এর কোনোকিছুই আর করা হয় না রাহেলার। রাহেলার খুব কষ্ট হয়। মাঝে মাঝে মনে হয়, ফেরদৌসের সাথে কোমর বেঁধে ঝগড়া করে। কিন্তু জানে, সেই ঝগড়ায় রাহেলা কোনোদিন জিততে পারবে না। ধর্মনিষ্ঠা আর বিশুদ্ধতার লক্ষণরেখায় ফেরদৌস নিজেকে বেষ্টন করে রেখেছে। তা অতিক্রম করার কোনো যুক্তি রাহেলার অভিধানে নেই। এ বছর ফেরদৌস হজ করে এল। তিন সপ্তাহ বাচ্চাদের নিয়ে রাহেলা একা রইল বাড়িতে। মুণ্ডিত মস্তকে ফিরে-আসা ফেরদৌসের মুখ থেকে বিচ্ছুরিত হতে থাকল অভাবনীয় প্রাপ্তির জ্যোতি। উচ্ছসিত কণ্ঠে ফেরদৌস গল্প করতে থাকল হজের অভিজ্ঞতার। আর তার পর থেকে মসজিদে ফেরদৌসের থাকার সময় আরো দীর্ঘায়িত হয়ে গেল। সেদিন ছিল রাহেলার জন্মদিন। এখন ফেরদৌসের কাছে এই দিনটার আর কোনো গুরুত্ব নেই। কাজ থেকে ফিরে চলে গেল মসজিদে। রাহেলা ভারী মনে এক কাপ চা নিয়ে বসেছিল খাবার টেবিলে। ভাবছিল, আঠার বছর আগে ওর জন্মদিনে রাতের স্টিমারে করে ফেরদৌস ওকে নিয়ে গিয়েছিল বরিশালে ওদের গ্রামের বাড়িতে। স্টিমারের কেবিনের দুলুনির সাথে ফেরদৌস আদরে আদরে দুলিয়ে দিয়েছিল রাহেলার প্রতিটি অনুভব। কোথায় হারিয়ে গেল সেই দিনগুলো? সেই অনুভব? রাহেলার ভাবনাকে কেটে দিয়ে টুংটাং বেজে উঠল দরজার বেল। রাহেলা দরজা খুলে অবাক আনন্দে চিত্কার দিয়ে উঠল। জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে এসেছে ওর স্কুলের দুই বন্ধু রুমা আর মিতা। বহুদিন পর ওদের সাথে দেখা হলো রাহেলার। কত কথা জমে আছে তিন জনের বুকের ভেতর! কত স্মৃতি রোমন্থন! বিছানায় শুয়ে গল্প করতে করতে সময়ের কোনো হিসাব রইল না। তিন জন গলা মিলিয়ে গান ধরল একের পর এক। গান আর গল্পের জোয়ার যখন ওদেরকে ভাসিয়ে রেখেছিল তখন শারমিন উঁকি দিল দরজায়, ‘মা, বাবা ফিরেছে।’ রুমা আর মিতা তড়িঘড়ি করে উঠে পড়ে বাড়ি চলে গেল। রাহেলার মন জুড়ে তখনো ছিল সুরের রেশ। তা কেটে গেল ফেরদৌসের কথায়, ‘তোমরা দেখছি আসর বসিয়েছ বাড়িতে।’ ‘আসর আর কী। একটু গলা মিলিয়ে গান গাইছিলাম।’ রাহেলা হেসে কাটিয়ে দেবার চেষ্টা করে। ‘তোমাদের গান গলির মোড় থেকে শোনা যাচ্ছিল। ছি ছি। তোমাদের বয়স কি শারমিনের সমান হয়ে গেছে নাকি? সবার সামনে আমার মাথা হেঁট হয়ে গেল। আমি মসজিদে বসে ধর্মের আলোচনা করছি আর আমার বউ বাড়িতে মাহফিল বসিয়েছে! এগুলো না করে কোরান শরিফটা নিয়ে তো বসতে পারতে। শারমিন আর সামি বেলেল্লাপনার বদলে ভালো কিছু শিখত। তোমার মেয়ে যে বড় হচ্ছে সে খেয়াল নেই তোমার? কী শিখল ও আজ তোমাদের কাছে? তোমার মতো এ রকম উদাহরণ থাকলে তো শারমিন উচ্ছন্নে যাবে। তুমি নিজে যদি সংযম না করো তাহলে তোমার বাচ্চারা কী করবে? আজকে মসজিদে একজন বলল, আমি হজ করে এসেছি আর আমার বউ খোলা চুলে রিক্সা করে ঘুরে বেড়ায়। এসব শুনতে কি আমার ভালো লাগে? একটু পর্দা করলে কী সমস্যা হয় তোমার?’ রাহেলা চুপ করে রইল। কত কথা বলতে ইচ্ছে করল ওর, ‘যে গানগুলো আমরা গাইছিলাম সেগুলো শুনেই তুমি আমাকে বিয়ে করেছিল। এই গানগুলোর সাথে আমরা কত গলা মিলিয়েছি। আমার খোলা চুল এখন তোমাকে অপমানিত করে। আর এই চুল ছিল তোমার সবচেয়ে আদরের ধন। তুমি কেন এত বদলে গেলে ফেরদৌস?’ কিন্তু ক্ষোভে, অভিমানে গলা ধরে এল রাহেলার। ওর গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। বাথরুমের আয়নার সামনে খোলা চুলে দাঁড়িয়েছিল রাহেলা। ফেরদৌস অফিসে। বাচ্চারা স্কুলে। বাড়িতে রাহেলা একা। একটু আগে ফেরদৌসের ছোট বোন নাসরিন এসেছিল রাহেলার সাথে দেখা করতে। নাসরিনের বিয়ে হয়েছে খুবই রক্ষণশীল পরিবারে। নাসরিন বাইরে যায় বোরখা পরে। রাহেলাকে নাসরিন বলল, ‘ভাবী, ভাইয়া হজ করে এসেছে। এখন তোমার পর্দা করা উচিত। কত সুন্দর ডিজাইনের হিজাব পাওয়া যায়। কী সুন্দর, মার্জিত লাগে হিজাব পরা মেয়েদের। ভাইয়া মসজিদ কমিটির সেক্রেটারি। তুমি পর্দা না করলে ভাইয়ার অবস্থা কোথায় থাকে বলো তো? সবাই বলবে হাজির বউ পাজি। দেখো, তোমার জন্য এই হিজাবটা আমি নিয়ে এসেছি। তুমি পরে দেখ খুব সুন্দর লাগবে।’ রাহেলা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে আয়নায় প্রতিফলিত ওর খোলা চুলের দিকে। ওর হাতে স্যামন পিংক রঙের নিখুঁত সুতোর কাজ করা মাখনের মতো নরম কাপড়ের হিজাব। কী অপূর্ব সুন্দর! এই সুন্দর কাপড়ে ঢেকে ফেলতে হবে ওর পার্সিনেটের মতো দিঘল চুল। চুল যদি ঢেকেই ফেলে তবে তা রেখে লাভ কী? রাহেলার এক হাতে হিজাব। অন্য হাতে কাঁচি। রাহেলার বোধের গহন থেকে গোথেল বের হয়ে দখল করে নেয় কাঁচিটাকে। বাথরুমের মেঝেতে জমে ওঠে কুচকুচ করে কাটা রাহেলার কাজলকালো চুল।