ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদর দপ্তর ব্রাসেলসে কিছুদিন আগে স্বাগত জানানো হয়েছিল চীনের প্রেসিডেন্ট জি জিনপিংকে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদর দপ্তরে চীনের কোনো প্রেসিডেন্টের এটিই ছিল প্রথম সফর। কিন্তু এর সঙ্গে শুধু ইতিহাস সৃষ্টির বিষয় জড়িত ছিল না। বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি করাটাই ছিল জি জিনপিংয়ের সফরের মূল উদ্দেশ্য। যে কারণে তাঁর সঙ্গে ছিলেন দু’শ’রও বেশি ব্যবসায়ী নেতা। পুরোপুরি না হলেও জি জিনপিংয়ের সফর যে আংশিক সফল তা নির্দ্বিধায় বলা যায়। ফ্রান্স ও জার্মানী থেকে যথাক্রমে এয়ার প্লেন এবং গাড়ি কেনার জন্য মাল্টি-বিলিয়ন ডলারের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। সফরে চীন চেয়েছিল বিস্তৃত পরিসরের চুক্তিতে পৌঁছতে। পক্ষান্তরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন চীনকে উত্সাহিত করছিল বাজার পুরোপুরি উন্মুক্ত করে দিয়ে আরো বেশি সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করার ব্যাপারে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও চীনের মধ্যে প্রতিবছর পণ্য বিনিময় হয় ৫৮৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি মূল্যের। প্রতিদিনের হিসাবে এর পরিমাণ ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলাার। এসব জানা গেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন কর্তৃক প্রকাশিত সর্বশেষ উপাত্ত থেকে। কিন্তু চীন থেকে ইউরোপ যে পরিমাণ পণ্য কিনে তার চেয়ে অনেক কম বিক্রি করে সেখানে। গতবছর চীনের সঙ্গে ইউরোপের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ১৮০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এ অবস্থা কাটিয়ে উঠতে ইউরোপীয় বিনিয়োগকারীরা চীনের বর্ধিষ্ণু মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সেখানে আরো অনেক বেশি রপ্তানি করতে চায়। তাদের ২০ মিলিয়ন লোকের বার্ষিক আয় কমপক্ষে ১৩ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার। যা দিয়ে তারা গাড়ির মতো অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভোগ্যপণ্য ও সেবার ব্যয় নির্বাহ করতে পারে। এ তথ্য জানিয়েছে ইউরোপীয় কমিশনের ট্রেড ডিপার্টমেন্ট। সেজন্য চীনের বাজারে ভালভাবে ঢুকতে ইউরোপ মরিয়া। তাই তারা চীনকে উত্সাহিত করছে কম নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে।
বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসার সত্ত্বেও পারস্পরিক সরাসরি বিনিয়োগ তুলনামূলকভাবে এখন পর্যন্ত নিম্ন। ইউরোপীয় কমিশনের তথ্যা অনুযায়ী, চীনে যে পরিমাণ সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ ঘটছে তার মাত্র ২ শতাংশের বেশি ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর। অনেক বছর ধরে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো চীনের সস্তা শ্রমের সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে সেখানে প্রচুর ফ্যাক্টরি তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এখন যেনো মনে হয় পরিস্থিতির উল্টো রূপ নিয়েছে। চীনা বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি এখন পূর্ব ইউরোপ ভূমধ্যসাগরীয় দেশগুলোর দিকে। ইউরোজোনের সঙ্কটের কারণে এই দুই অঞ্চলে মজুরি ব্যয় অনেক নেমে এসেছে। তারা এখন বিদেশি বিনিয়োগের জন্য তৃষ্ণার্তের মতো তাকিয়ে থাকে। চীন এরই মধ্যে এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। ২০১৫ সাল থেকে প্রতিবছর পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলোতে তাদের বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়াবে অন্তত ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তারই নমুনাস্বরূপ ২০১২ সালে তারা প্রথম ফ্যাক্টরিটি স্থাপন করে বুলগেরিয়ায়— যার নাম এ গ্রেট ওয়াল মোটর এ্যাসেম্বলি লাইন। সেখানে তারা পাচ্ছে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীনা অর্থ ইউরোপকে অর্থনৈতিক মন্দা থেকে বেরিয়ে আসতে বেশ ভালভাবেই সাহায্য করতে পারে। উদাহারণস্বরূপ পিয়েরাস বন্দরের কথা বলা যেতে পারে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার কারণে গ্রীসের অর্থনীতি যে নাকানি-চুবানি খাচ্ছে, তা কাউকে নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। সে জায়গায় চীন-পরিচালিত তাদের পিয়েরাস বন্দর যে শুধুমাত্র ভালভাবেই চলছে তা নয়, ইউরোপের প্রধান শিপিং হাবগুলোর একটিতে রূপ নিয়েছে।
চীন বাণিজ্য ও বিনিয়োগে নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করায় ইউরোপের সাথে তাদের সম্পর্ক কিঞ্চিত্ তিক্ত হয়ে পড়েছিল। ঢিলের বদলে পাটকেল স্বরূপ চাইনীজ সোলার প্যানেলের উপর উচ্চ আমদানি শুল্ক আরোপ করেছিল ইউরোপের নানা দেশ। অভিযোগ ছিল, চীন ইউরোপীয় সোলার প্যানেলের বাজার নষ্ট করতেই তাদের সোলার প্যানেলের দাম ন্যায্যমূল্যের চেয়ে অনেক কমিয়ে রেখেছে। যদিও এসব বিতর্ক কিছুটা দূর হয়েছে। তবে ইইউর কথা মানলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য চীন এখনো অনেক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে রেখেছে। পরিবহন, টেলিযোগাযোগ ও স্বাস্থ্যসেবাসহ অনেক খাতেই বিদেশি কোম্পানিগুলোর প্রবেশাধিকার নেই।
ইইউ ইনভেস্টমেন্ট থিংক ট্যাংক ইসিআইপিইর মাইকেল ক্রোল জানিয়েছেন, জি জিনপিংয়ের সফরে বড় ধরনের চুক্তিতে পৌঁছা সম্ভব না হলেও একটি বিষয় কোনো পক্ষই এড়িয়ে যেতে পারেনি যে, বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরো মজবুত করার জন্য ইউরোপীয় ও চীনা ফার্মগুলোর একে অপরের বাজারে সমান প্রবেশাধিকার থাকা প্রয়োজন। চীনের দেয়া যৌথ উদ্যোগের প্রস্তাবকে উপেক্ষা করতে চায় ইইউ। কারণ এক্ষেত্রে তারা অনেক সমস্যার মুখোমুখি হয়। স্বাধীনভাবে কিছু করতে না পারায় অনেক ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলো ক্ষতির সম্মুখীন হয়। সম্প্রতি ইইউর একটি জরিপে উঠে এসেছে যৌথভাবে চীনে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া ফার্মগুলো ক্রমাগতই ব্যবসায়ের সুযোগ হারাচ্ছে।
চীন ইউরোপীয় ইউনিয়নের দ্বিতীয় বৃহত্ বাণিজ্য অংশীদার, যুক্তরাষ্ট্রের পরেই যার স্থান। ২০০১ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় যোগদানের পর থেকে ইইউর সঙ্গে দেশটির বাণিজ্য বৃদ্ধি পেয়েছে চারগুণ। চীনের সর্ববৃহত্ আমদানির উত্স হচ্ছে ইইউ এবং আমদানির সবচে’ বড় গন্তব্য। গাড়ি ও বিমান, রাসায়নিক ও বিলাসবহুল সামগ্রীর জন্য চীনের ক্ষুধা মিটাচ্ছে ইউরোপ এবং আমদানি করে প্রধানত টেক্সটাইল ও ইলেকট্রিক সামগ্রী। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ সালে পৃথিবীর সর্ববৃহত্ অর্থনীতিক দেশ বনে যাবে চীন। তখন চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য আরো যে বাড়বে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
