পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে দিন-মজুরি ও রিকশা চালিয়ে অনেকেই পেয়েছে জিপিএ-৫। বাড়িতে বিদ্যুত্ না থাকায় কুপিবাতির আলোয় চলেছে তাদের লেখাপড়া। এসব মেধাবী মুখের খবর তুলে ধরেছেন আমাদের প্রতিনিধি ও সংবাদদাতারা।
দিনমজুর বাকি বিল্লাহ
পেয়েছে জিপিএ-৫
বড়াইগ্রাম (নাটোর) \ উপজেলার বড়দেহা গ্রামের বাকি বিল্লাহ দিন-মজুরের কাজ করে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে। বাকি বিল্লাহর বাবার ভিটাবাড়ি ছাড়া কোন জমি-জমা নেই। বড়ভাই শাকিউল করিম পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে অনার্স পড়ে। বয়স আর অসুস্থতার জন্য বাবা কোন কাজ করতে পারেন না। তাই লেখাপড়া আর সংসার চালানোর জন্য বাধ্য হয়ে দুই ভাই অন্যের জমিতে দিন-মজুরের কাজ করে। যেদিন ফল প্রকাশ হয়, সেদিনও অন্যের জমিতে কাজে ব্যস্ত ছিল সে। বাকি বিল্লাহ বড় হয়ে কলেজ শিক্ষক হতে চায়।
ডাক্তার হতে চায় গরিব
মেধাবী ছাত্র দেবঞ্জন
বটিয়াঘাটা (খুলনা) \ উপজেলার বটিয়াঘাটা গ্রামের গরিব মেধাবী ছাত্র দেবঞ্জন সরকার গোল্ডেন এ+ লাভ করে ভবিষ্যতে ডাক্তার হতে চায়। বাবা নসিমুন চালক শ্যামল সরকার ও মা শোভা সরকার গৃহিনী। সে তার স্কুলের শিক্ষক ও প্রাইভেট শিক্ষকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে।
মেধাবী ছাত্র গোবিন্দের
উচ্চশিক্ষা অনিশ্চিত
নান্দাইল (ময়মনসিংহ) \ সংসারের জোয়াল টেনে চলেছেন মা জয়ন্তি পাল। তাঁর উপার্জনেই চলে পরিবারের চার সদস্যের ভরণ-পোষণ ও পড়ালেখার খরচ। সেই পরিবারের একমাত্র পুত্রসন্তান গোবিন্দ চন্দ্র পাল এবারের এসএসসি পরীক্ষায় বাণিজ্য বিভাগ থেকে পেয়েছে জিপিএ-৫। ভাল ফলাফল করার পরও গোবিন্দ পাল এখন চিন্তিত তাঁর উচ্চশিক্ষার খরচ যোগানো নিয়ে।
দিনমজুর রাশেদুল পেয়েছে জিপিএ-৫
উলিপুর (কুড়িগ্রাম) \ উপজেলার কিশোরপুর গ্রামে হতদরিদ্র পরিবারে জন্ম নেয়া রাশেদুলকে পরিবারের আহার জোটাতে কাজ করতে হয়েছে অন্যের জমিতে। চালাতে হয়েছে রিকশা। অর্থকষ্টে যখন লেখাপড়া বন্ধ হওয়ার উপক্রম তখনও হাল ছাড়েনি রাশেদুল। বাবা জেয়াদুল ইসলাম রিকশা চালান আর মা রাশেদা বেগম অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে যা পান তা দিয়েই চলে ৫ সদস্যের সংসার। ভবিষ্যত্ ইচ্ছা জিজ্ঞাসা করতেই অঝোরে কেঁদে ফেলে রাশেদুল। কারণ সে জানে না তার জীবনের ভবিষ্যত্ কি?
অর্থাভাবে কখনও প্রাইভেট
পড়া হয়নি মমিনুলের
নাগেশ্বরী (কুড়িগ্রাম)
বাবা শহিদুল ইসলাম ঠেলাগাড়ি চালক। মা মনোয়ারা বেগম অন্যের বাড়িতে ঝি-এর কাজ করেন। বাবার একার পক্ষে ৪ সদস্যের সংসার চালানো কষ্টকর হলেও কখনও চাননি তার একমাত্র ছেলে ঠেলাগাড়ি চালক হোক। তবে প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান দিতে না পারায় ছেলে মমিনুলের কখনও প্রাইভেট পড়া সম্ভব হয়নি। কুপির তেলের অভাবে দিনের আলোয় তাকে তৈরি করতে হয়েছে দৈনন্দিন পড়া। এবারে বেরুবাড়ী দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের বাণিজ্য বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে সে। অর্থাভাবে ছেলের ব্যাংকার হওয়ার স্বপ্ন পূরণ কিভাবে সম্ভব এ চিন্তার মেঘ আচ্ছন্ন করে রেখেছে বাবাকে।
দিনমজুরি করে জিপিএ-৫
পেয়েছে মেহেদী
উল্লাপাড়া (সিরাজগঞ্জ) \
উপজেলার বারোইয়া গ্রামের দিনমজুর শহিদুল ইসলাম ও মমতাজ বেগমের ছেলে মেহেদী হাসান দিনমজুরি করে এ বছর উল্লাপাড়া মার্চেন্টস পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়েছে। বাড়ির ভিটে ছাড়া তাদের আর কোন জমা-জমি নেই। বিদ্যুত্ না থাকায় কেরোসিনের কুপি জ্বালিয়ে ভাই-বোনেরা লেখাপড়া করে থাকে। মেহেদী হাসান জানায়, সপ্তাহের ২/৩ দিন সে দিনমজুরি করে থাকে। বাকি দিনগুলো স্কুলে ক্লাস করেছে। দিনমজুরি করে কিভাবে সে লেখাপড়া করবে এ চিন্তায় মেহেদী এখন অনেকটাই হতাশ।
