চতুর্থবারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের লক্ষ্যে গতকাল রবিবার ব্রাজিলে পৌঁছালো জার্মান দল। শেষ মুহূর্তে মার্কো রিউসের দল থেকে ছিটকে পড়ার বেদনার মধ্যেই ২৩ ফুটবলারের সঙ্গী হন কোচ, ফিজিও, ফিটনেস ট্রেনার এবং দলীয় চিকিত্সকদের মিলিয়ে ৪০ জনের আরেকটি দল। দীর্ঘ দুই যুগের শিরোপা খরা ঘোচাতে মরিয়া ফিলিপ লামের দল যে বিপুল পরিমাণ রসদ নিয়ে গেল তাতে মনে হতে পারে বিশ্বকাপ নয়, কোন বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিতে যাচ্ছে জার্মানরা।
কোচ জোয়াকিম লোয়ের দল ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে বিমানে সরাসরি চলে আসে ব্রাজিলিয়ান রাজ্য সালভাদরে। এরপর সেখান থেকে আরেকটি বিমানে তাদের বিশ্বকাপের ঘাঁটি পোর্তো সেগুরোতে। তবে জার্মান দলের টুর্নামেন্ট চলাকালীন রসদ পৌঁছে গেছে আগেই। সাগরপথে বিশাল পথ পাড়ি দিয়ে জার্মান দলের জন্য পূর্ব নির্ধারিত বিলাসবহুল হোটেলে অপেক্ষা করছে সেগুলো।
জার্মান ফুটবল ফেডারেশনের (ডিএফবি) দেয়া তথ্য অনুযায়ী, সাগরপথে পাঠানো ব্যাগগুলোর মোট ওজন ২৩ টন! প্রত্যেক খেলোয়াড়ের জন্য বরাদ্দ এক টন! সেগুলোর মধ্যে আছে ফিটনেস ট্রেনিংয়ের সামগ্রী, পাহাড়ে চড়ার বিশেষ বাইসাইকেল, টেবিল টেনিস খেলার বোর্ড, বিলিয়ার্ড এবং স্নুকার টেবিল এমনকি ডার্ট বোর্ড পর্যন্ত! এর বাইরে কোচ এবং অন্য সদস্যদের বাক্স পেটরা তো থাকছেই।
ডিএফবি’র সরবরাহ করা তালিকা অনুযায়ী খেলোয়াড়দের শুধু নিজ নিজ টুথব্রাশ এবং অন্তর্বাসের ব্যবস্থা করলেই চলবে। দলের প্রতি খেলোয়াড়ের জন্য ম্যাচের ২০ সেট পোশাকও পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে ব্রাজিলে। প্রতি ম্যাচে দুই সেট নতুন পোশাক পাচ্ছেন খেলোয়াড়রা। আর ম্যাচ পোশাক বাদে বিকল্প জামা-কাপড় তো থাকছেই। এর বাইরে নিয়মিত অনুশীলনের জন্য প্রতি খেলোয়াড় পাবেন ৬০ সেট ট্র্যাক স্যুট! কয়েক সেট আনুষ্ঠানিক পোশাকের সঙ্গে থাকছে সব সময়ের ব্যবহারের জন্য টি-শার্টও।
ডিএফবির রসদ পরিবহন এবং ভ্রমণের দায়িত্বে নিয়োজিত জর্জ বেহালু জানিয়েছেন, এই বিশাল রসদ ব্রাজিলে প্রবেশের সময় অভিবাসন কর্তৃপক্ষের বিশেষ নিরাপত্তা প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়েও যেতে হয়েছে তাদের। দলের চিকিত্সকরা ওষুধ নিয়েছেন সেগুলোর প্রতিটির উত্পাদন এবং মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ সরবরাহ করতে হয়েছে অভিবাসন কর্তৃপক্ষ। প্রতিটি জার্সির সাইজ, উপাদান এবং রংও লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। তবে জার্মান দলের হয়ে দীর্ঘদিন এই দায়িত্ব পালন করা বেহালু মোটেই বিচলিত নন এই সমস্যায়। বলা চলে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাই বিচলিত হতে দিচ্ছে না তাকে। ইউরোর গত দুটি আসরের পাশাপাশি দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপেও জার্মানির রসদ ব্যবস্থাপনা এবং ভ্রমণের দায়িত্ব ছিল তার উপরেই।
ব্রাজিল বিশ্বকাপে ফুটবলারদের স্বাচ্ছন্দ্যের যেন কোন ঘাটতি না হয় সেজন্য ২০১২ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত আটবার ব্রাজিলে যাতায়াত করেন বেহালু। ১১টি ভেন্যুর পাশাপাশি ৩০টি হোটেলও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ঘুরে এসেছেন তিনি। এরপরেই খোঁজ মেলে ‘ক্যাম্পিও বাহিয়া’র। আর এই হোটেলটি বেছে নেয়ার পেছনে কাজ করেছে আরেকটি কারণও।
এই হোটেলের নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানটি মূলত মিউনিখ ভিত্তিক। তাই নির্মাণের ক্ষেত্রে জার্মান স্থাপত্য-শৈলীকেই দেয়া হয়েছে বিশ্বকাপ গুরুত্ব। ব্রাজিলের বাইরে এক টুকরা জার্মানির অনুভূতি দিতেই এত আয়োজন।
বাস্তিয়ান শোয়েনস্টেইগার-মেসুত ওজিলরা যেন ‘হোম সিকনেসে’ না ভোগেন সেজন্যে হোটেলে অগ্রবর্তী দলের অংশ হয়ে সপ্তাহ তিনেক আগেই পৌঁছে গেছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং একজন রাঁধুনীও। আর জার্মানির মূল দলের সঙ্গে কোচ-সহকারি কোচ বাদেও আসছেন আরো ৩৩ জন বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি। তাদের মধ্যে আছেন চিকিত্সক, ফিটনেস ট্রেনার থেকে শুরু করে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ঘুরিয়ে দেখাবার জন্য গাইড এবং প্রশিক্ষিত দুই রাঁধুনী। ফিলিপ লামের দলের রসনা তৃপ্তিতে যেন কোন অভাব বোধ না হয় সেজন্যেই খাবারের দিকে রাখা হচ্ছে বিশেষ ব্যবস্থা।
ফুটবল যুদ্ধের ময়দানে এই বিশাল আয়োজনে মোটেই বাড়াবাড়ি কিছু দেখছেন না বেহালু। তিনি বলেন, ‘এটা যদি আমার প্রথম টুর্নামেন্ট হতো তাহলে নিশ্চিতভাবেই আমার দুই-একটি বিনিদ্র রজনী কাটতো। তবে, আমি বলবো (বিশ্বকাপের) চ্যালেঞ্জটার যে বিশ্বালত্ব, চাপটাও তেমনই বড় আর প্রস্তুতিটাও তেমনই হওয়া চাই।’ প্রস্তুতিতে যে কোন ঘাটতি রাখতে চায়নি ডিএফবি সেটা পুরোপুরি পরিষ্কার। এখন ফেডারেশনের এই চেষ্টার স্বার্থক প্রতিফলন মাঠে ঘটলেই ঘুচতে পারে তাদের ২৪ বছরের শিরোপা আক্ষেপের। এএফপি।
