ভাবা গিয়েছিল, বিশ্বকাপের সুবাস ছড়িয়ে পড়লে এই উত্তেজনা, এই শঙ্কা আর থাকবে না। অন্তত চোখের সামনে নেইমার, লুইসদের অভিযান শুরু হতে দেখলে ব্রাজিলের মানুষ কিছুদিনের জন্য হলেও তুলে রাখবেন সব অসন্তোষ। কিন্তু কীসের কী!
অনুশীলনের প্রথম দিনে সেই নেইমারদের বাস আটকেই বিক্ষোভ দেখালে রিও ডি জেনিরোর বাসিন্দারা!
রিও’র হোটেল থেকে টিম বাসে বেরোনোর মুখেই প্রবল বিক্ষোভের মুখে পড়তে হল নেইমারদের। নেইমারদের যাওয়ার কথা ছিল ৯০ কিমি দূরের শহর তেরেসোপোলিসে। সেখানেই বিশ্বকাপের অনুশীলন ক্যাম্প ব্রাজিলের। কিন্তু থিয়াগো সিলভা, দানি আলভেজদের নিয়ে নীল রঙের টিম বাস হোটেল থেকে এ দিন সকালে রওনা হওয়ার মুখেই প্রবল বিক্ষোভের মুখে পড়ে। নিরাপত্তা কর্মীরা দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করলেও বিক্ষোভকারীদের আটকানো যায়নি। রাস্তা আটকে ব্রাজিলের টিম বাসে বিক্ষোভকারীরা সেঁটে দেয় বিশ্বকাপ বিরোধী স্টিকার। কয়েক জন বিক্ষোভকারী টিম বাসের সামনে রাস্তায় শুয়ে পড়ে নেইমারদের আটকানোর চেষ্টাও করেন। ব্যানার, পোস্টার-সহ প্রতিবাদ চলে বেশ কিছুক্ষণ। বিক্ষোভকারীদের মধ্যে বেশির ভাগই ছিলেন স্থানীয় শিক্ষক-শিক্ষিকা। যারা উন্নত শিক্ষাব্যবস্থার দাবি জানিয়ে স্লোগান দিচ্ছিলেন, ‘এত অর্থ ব্যয় করে বিশ্বকাপ চাই না। ভাল শিক্ষা, ভাল চিকিত্সা পরিকাঠামো চাই।’
হ্যা, এটাই হল কথা।
ব্রাজিলে বিশ্বকাপ আয়োজনের ব্যাপারটা নিশ্চিত হওয়ার পর থেকে পাঠক-দর্শক হিসেবে আপনি নিশ্চয় নিয়মিত সেখানকার ক্ষোভ বিক্ষোভের খবর জানতে পারছেন। সেই ক্ষোভ দিনকে দিন বেড়ে এমন আকার নিয়েছে যে, পুরো বিশ্বকাপের নিরাপত্তার জন্য তা এক হুমকি হয়ে ওঠার ভয় আছে। আর এই ক্ষোভের কারণ একটা—ব্রাজিলিয়ানদের মতে এই বিশ্বকাপ নিয়ে ব্রাজিলীয় সরকার লাগাম ছাড়া খরচ করে নিজের দেশের মানুষের দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে। হীরক রাজার মতো করে সে বাইরেটা চকচকে করতে গিয়ে আরও গরীব করে ফেলছে গরীবদের।
বলা হচ্ছে, ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে ইতিহাসের সব থেকে ব্যয়বহুল বিশ্বকাপ। খরচের পরিমাণটা ১৪০০ কোটি ডলার। যার পুরোটাই খরচ করবে ব্রাজিল সরকার। এছাড়া আরো ২০০ কোটি ডলার খরচ করবে ফিফা। সেখান থেকে ৫৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার খরচ করা হবে প্রাইজমানির জন্য। তবে এ বিপুল অর্থের পুরোটা কেবল বিশ্বকাপ আয়োজনের পিছনেই ব্যয় হচ্ছে না। স্টেডিয়াম নির্মাণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, নিরাপত্তা খরচসহ আরো অনেক প্রজেক্টের পেছনে ঢালতে হচ্ছে বিপুল অর্থ। মূল বিশ্বকাপ আয়োজনে খরচ হবে ১০০ কোটি ডলারের কিছু বেশি। স্টেডিয়াম উন্নয়নের পেছনে যাচ্ছে ৩৬০ কোটি ডলার। ১২টি স্টেডিয়ামের ৫টি সম্পূর্ণ নতুনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। অন্যান্য প্রজেক্টে ব্যয় ধরা হয়েছে আরো ৩০ লাখ ডলার। সব থেকে বড় খরচটা পড়েছে আয়োজকদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিভাগের কাঁধে। যা প্রাথমিকভাবে ৯০০ কোটি নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই ব্যয়ের হিসাব থেকেই ব্রাজিলিয়ানদের ক্ষোভের কারণটা বুঝতে পারেন। এই বিপুল ব্যয় সে দেশের মানুষের মাথা থেকেই কর হিসেবে নেয়া হচ্ছে।
এখন অর্থনৈতিকভাবে ব্রাজিলকে বলা যায় উত্তর আমেরিকার ভারত; যার অত্যন্ত সমৃদ্ধ একটা চেহারা আছে, কিন্তু ভেতরে কোটি কোটি না খেতে পাওয়া মানুষ। এই না খেতে পাওয়া মানুষের মাথার ওপর এই বিশাল ব্যয় চাপিয়ে দেয়ায় প্রতিবাদের ঝড় উঠবে, এটাই স্বাভাবিক। বিশেষ করে দেশটিতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে যখন বিপর্যয়ই চলছে বলা চলে।
এই ব্যাপারগুলো এতোটাই ব্রাজিলিয়ানদের স্বার্থ ও অর্থনীতিকে আঘাত করেছে যে সাবেক ফুটবলাররা পর্যন্ত বিশ্বকাপে ভালোবাসা ভুলে দাঁড়িয়েছেন বিক্ষোভকারীদের পাশে। বাকীদের কথা কী বলবেন, ব্রাজিল বিশ্বকাপের আয়োজক কমিটির কর্মকর্তা, কিংবদন্তী ফুটবলার রোনালদো পর্যন্ত বলেছেন, এতো ব্যয় করে লোকজনকে অনাহারের দিকে ঠেলে দেয়াটা কোনো কাজের কথা নয়।
অবশ্য সংকট শুধু এই অর্থনৈতিক ব্যাপারের নয়। এর সঙ্গে শ্রমিক মৃত্যু, শ্রমিকদের নিরাপত্তা না দেয়া, পুলিশসহ বিভিন্ন পেশাজীবীদের অসন্তোষও দারুণ প্রভাব ফেলেছে।
ব্রাজিলের ১৪টি রাজ্যের কয়েক হাজার পুলিশ বেতন বৃদ্ধির দাবিতে মাঝে একদিনের ধর্মঘট করেছে?? পুলিশের দাবি বেতন ৮০ শতাংশ বাড়াতে হবে?? শহরের নিরাপত্তার দায়িত্বে যারা থাকে, সেই মিলিটারি পুলিশ এবং সীমান্ত ও বিমানবন্দরের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ফেডারেল পুলিশ দু’দলই এই ধর্মঘটে সামিল হয়েছে ?? তবে দুই পুলিশই আশ্বস্ত করেছে, তারা বিশ্বকাপ শেষ না হওয়া পর্যন্ত আর ধর্মঘটে যাবে না??
নির্মাণ কাজে একটার পর একটা ভেন্যুতে মৃত্যু, ধসে পড়ার ঘটনায় বিলম্ব ঘটেছে আর এর প্রত্যেকটা ব্যাপার নিয়ে মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে কাজে বাধা দিয়েছে ধর্মঘট করে। পুলিশ, বাস ড্রাইভার ও শিক্ষক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে ব্রাজিল জুড়ে। রিও ডি জেনিরো থেকে ছড়িয়েছে ব্রাসিলিয়া এবং সাও পাওলো, বেলো হরাইজন্তে, মানাউস, পোর্তো আলেগ্রির মতো শহরগুলোতেও বিক্ষোভের আগুন জ্বলেছে।
কিন্তু যা হওয়ার তো হয়েছে। এখন এই বিক্ষোভ কী, আসলেই বিশ্বকাপকে নড়বড়ে করে দেবে?
না, ব্রাজিল সরকারের প্রস্তুতি তা বলছে না। বিশ্বকাপকে নিরাপত্তার বলয়ে ঢেকে রাখতে ব্রাজিল প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ১৫ লক্ষাধিক সৈন্য মোতায়েন করবে বলে জানিয়েছে। ব্রাজিলিয়ান কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করছে যে সব কিছুই তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রী চেলসো আমোরিম তাদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন তার দেশ ‘পুরোপুরি তৈরি’ মাসব্যাপী চলা এই ইভেন্ট পরিচালনার জন্য। এখানে তারা উদাহরণ হিসেবে বলছেন, বিশ্বকাপ আয়োজনের আগে গত বছর কনফেডারেশন কাপের আয়োজন করেছিল। আর তাতে তারা সফলও হয়েছিল।
এছাড়া সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সমন্বয়ে ৩০ হাজার সামরিক সদস্য বিশ্বকাপে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবে বলে নিশ্চিত করেছেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বিশ্বকাপ চলাকালীন মাদক ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম ঠেকাতে ব্রাজিলের ১৬ হাজার ৯০০ মাইল সীমান্ত এলাকা সামরিক বাহিনীর বিশেষ নজরদারির আওতায় আনা হবে। দক্ষিণ আমেরিকার ১০টি দেশের সঙ্গে ব্রাজিলের সীমান্ত বিস্তৃত রয়েছে। তাই সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সদস্যরা নৌকা এবং হেলিকপ্টার নিয়ে বিশ্বকাপ চলাকালীন বিশেষ পর্যবেক্ষণে থাকবে। ১২ জুন থেকে ১৩ জুলাই পর্যন্ত বিশ্বকাপের জন্য নির্ধারিত ১২টি ভেন্যুর উপর দিয়ে ‘নো ফ্লাই জোন’ ঘোষণা করবে ব্রাজিল বিমানবাহিনী।
আর এই পুরো আয়োজনে ব্রাজিল পুলিশকে সহায়তা করে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই)।
আপাতত ব্রাজিল সরকারের এইসব পদক্ষেপে আস্থা রাখার কোনো বিকল্প নেই। দেশটির সাধারণ মানুষের প্রতি পূর্ণ সহানুভূতি রেখেও একটি সুন্দর, ক্ষোভহীন বিশ্বকাপের আশায় রয়েছে বিশ্ব।
