এশিয়ার ভরসা জাপান কোরিয়াই

আপডেট : ০৯ জুন ২০১৪, ২০:৩৯
একবিংশ শতাব্দী নাকি এশিয়ার। এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের শ্লোগানও হলো ‘ফিউচার ইজ এশিয়া’। এশিয়ান ফুটবল চ্যাম্পিয়ন জাপানের হোন্ডা বলেছেন, তার দেশ বিশ্ব শিরোপা জয়ের ক্ষমতা রাখে। এশিয়ায় এমন ফুটবলামোদী খুব কমই পাওয়া যাবে যারা তার এ কথাটি বিশ্বাস করবেন। কারণ ফুটবলের এ মহান মিলনমেলায় ৩২টি দেশ যখন খেলতে নামবে সেসময় ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর সাথে পারা সত্যি কঠিন হবে। তা ইরান, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া যতই এশীয় শক্তি হোক না কেন। যদিও নিক্তির বিচারে এ দেশ চারটির শক্তিতে হেরফের আছে। অতীত নৈপুণ্য বিচারে অবশ্য দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানই অন্যদের চাইতে এগিয়ে। এবারো তার অন্যথা হওয়ার কথা নয় এবং যে কোন বিচারে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পৌঁছানোটাই এখনো এশীয় দলগুলোর জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ। এখন পর্যন্ত দক্ষিণ কোরিয়া কেবল একবারই সেটা করে দেখাতে পেরেছে। ব্রাজিল বিশ্বকাপে যাওয়া দল চারটির মধ্যে কারা এর পুনরাবৃত্তি করতে পারে সেটাই এখন দেখার বিষয়। ইরান (৪৩): ফিফার সর্বশেষ প্রকাশিত বিশ্ব র্যাংকিংয়েও ইরানিরা হলো বিশ্বকাপে সবচাইতে উঁচুতে থাকা এশীয় দল। তাও আবার ছয় ধাপ নিচে নেমে যাওয়ার পর। বরাবরের মেধাবী ইরানি ফুটবলারদের নিয়ে সমস্যা হলো তাদের ফেডারেশনের সাংগঠনিক দক্ষতার ঘাটতি। দলটির পর্তুগীজ কোচ স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের একসময়ের সহকারী কার্লোস কুইরোজ সম্প্রতি ইরানের ফুটবল ফেডারেশন ও তাদের খেলার সামগ্রির জোগানদার জার্মান কোম্পানি উহলস্পোর্টকে এক হাত নেন। তিনি বলেন, ‘আপনি ৪৪ পায়ের মাপের কাউকে ৩৪ নম্বরের বুট দেন তাহলে সে তো মাঠে পাঁচ মিটারও দৌড়াতে পারবে না।’ এহেন ইরান ১৬ জুন নাইজেরিয়ার বিরুদ্ধে খেলে শুরু করবে ব্রাজিল বিশ্বকাপের অভিযান। কাগজে কলমে আর্জেন্টিনাই হলো গ্রুপটির সবচাইতে শক্ত দল। নইলে অপর দলটি হলো বসনিয়া ও হারজেগোভিনা যারা কিনা এই প্রথম বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করলো। তারপরও ইরানিদের জন্য শেষ ষোলয় ওঠা কষ্টকরই হবে। জাপান (৪৬): সামুরাই ব্লু নামের দলটি বিশ্বকাপে খেলতে এসেছে ইউরোপভিত্তিক ১২ জন ফুটবলারের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে। বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বে এ নিয়ে টানা পঞ্চমবার খেলতে এলো জাপানিরা। সর্বশেষ ফিফা র্যাংকিংয়ে দুই ধাপ অগ্রগতি দেখানো ইতালিয়ান কোচ আলবার্তো জ্যাচ্চেরোনির দলটির মূল অস্ত্র হলো অভিজ্ঞতা। এসি মিলান মিডফিল্ডার কেইসুকি হোন্ডা তো এরই মধ্যে দাবি করেছেন তার দল নাকি বিশ্বকাপ জয়ের ক্ষমতা রাখে। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ ও জার্মানির বুন্দেশলিগার বেশ কয়েকজন খেলোয়াড় আছেন এই দলে। এদের মধ্যে উল্লেখ করার মতো হলেন ম্যানচেষ্টার ইউনাইটেডের মিডফিল্ডার শিনজি কাগাওয়া ও এফসি মেইঞ্জের শিনজি ওকাজাকি। ১৪ জুন আইভরি কোস্টের বিরুদ্ধে খেলা দিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু হবে জাপানের। ব্রাজিল বিশ্বকাপের ‘সি’ গ্রুপে তাদের অপর দুই প্রতিদ্বন্দ্বী হলো কলম্বিয়া ও গ্রীস। দক্ষিণ কোরিয়া (৫৭): এশীয় চতুষ্টয়ের মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ারই গ্রুপ পর্ব পেরোনোর সম্ভাবনা ভাল বলে মনে করেন ফুটবল বিশেষজ্ঞরা। ১৭ জুন রাশিয়ার বিরুদ্ধে খেলা দিয়ে শুরুর পর ২০০২ বিশ্বকাপের স্বাগতিক ও সেমিফাইনালিস্টরা। এরপর ব্রাজিলের মাঠে ‘এইচ’ গ্রুপের খেলায় আরো দুই প্রতিদ্বন্দ্বী আলজেরিয়া ও বেলজিয়ামের মোকাবেলা করতে হবে তায়েগুক ওয়ারিয়র্স নামের দলটিকে। তুলনামূলকভাবে কোরিয়ার এ দল কমবয়সী কিন্তু পোড়খাওয়াদের নিয়ে গড়া। এর মধ্যে ২০১০ বিশ্বকাপের খেলোয়াড় আছেন পাঁচজন। সর্বশেষ ফিফা র্যাংকিংয়ে দুই ধাপ নেমে গেলেও এদের সবার লক্ষ্য হবে টানা দ্বিতীয়বারের মতো দ্বিতীয় রাউন্ডে খেলা। এ লক্ষ্যে তাদের মূল ভরসা স্বয়ং কোচ হং মিয়ুং-বো যিনি খেলোয়াড় হিসেবে ২০০২ বিশ্বকাপে জাতীয় দলের অধিনায়ক ছিলেন। এছাড়াও অনূর্ধ্ব ২৩ দলের ম্যানেজার হিসেবে কোরীয় দলকে লন্ডন অলিম্পিকে ব্রোঞ্জ জেতান তিনি। তার দলের নয় খেলোয়াড়ই ইউরোপের বিভিন্ন লিগে খেলে থাকেন। কাজেই বিশ্বমানের ফুটবলের গতি প্রকৃতি তাদের নখদর্পণেই আছে। এ ব্যাপারে কিম দায়ে-জিল নামের একজন বিশ্লেষক ইয়োনহ্যাপ বার্তা সংস্থাকে বলেন, ‘তারা যেহেতু চার বছর বিদেশেই খেলেছে, কাজেই সম্ভবত শীর্ষ লিগগুলোর প্রতিপক্ষদের মোকাবেলায় ভীত হবে না। ব্রাজিলের তীব্র গরম ও আদ্র পরিস্থিতি নিয়ামক ভূমিকা পালন করবে। কাজেই তরুণ খেলোয়াড় নেয়ার কারণে সম্ভব হবে গতিময় ফুটবল খেলা।’ অস্ট্রেলিয়া (৬২): ভৌগোলিক বিচারে আলাদা মহাদেশ হলেও ২০০৬ সালে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের (এএফসি) ৪৬তম সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয় অস্ট্রেলিয়া। এরপর ২০১০ সাল থেকে এশিয়ার হয়ে খেলছে অজিরা। যদিও বিশ্বকাপের ৩২টি দেশের মধ্যে তাদের র্যাংকিংই সর্বনিম্ন। তার মধ্যে দুর্ভাগ্য হলো এবারের বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার ভাগে পড়েছে গেলবারের দুই ফাইনালিস্ট স্পেন ও নেদারল্যান্ডস। এমনকি তৃতীয় যে দলটির সাথে তাদের খেলতে হবে সেই চিলির বিশ্ব র্যাংকিং হলো ১৩। যেন এটুকু সমস্যাই যথেষ্ট নয়, তাই দেশটির ফেডারেশন গত বছরের অক্টোবরে জার্মান হোলগার ওসিয়েককে বরখাস্ত করে দায়িত্ব সাবেক সকারু অ্যাঙ্গে পোস্টেকোগলুকে। সব মিলিয়ে চরম বিরুদ্ধ পরিস্থিতি বলেই হয়তোবা এবারের বিশ্বকাপে অংশ নিতে সবার আগে ব্রাজিলে গেছে অস্ট্রেলিয়া ফুটবল দল। এ পর্যালোচনার সূত্রে এশিয়ার ফুটবলামোদীরা আশা করবেন বিশ্বকাপে আরো একবার শেষ চারে নাম লেখাবে কেউ না কেউ। যে সৌভাগ্যটি আজো অর্জন করতে পারেনি সম্ভাবনাময় আরেক মহাদেশ আফ্রিকা। ঘানা (২০১০), সেনেগাল (২০০২) ও ক্যামেরুন (১৯৯০) আফ্রিকার হয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছালেও এখনও শেষ চার অধরাই থেকে গেছে। অথচ ইউরোপের বড় বড় লিগগুলোও এশিয়ার চাইতে আফ্রিকান খেলোয়াড়ের সংখ্যাটাই বেশি। তারপরও আমরা অপেক্ষায় জেগে থাকি এশিয়ার জন্য।