আগামী ১২ জুন পর্দা উঠছে ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদার এবং সর্ববৃহত্ টুর্নামেন্ট বিশ্বকাপ ফুটবলের। ব্রাজিলে শুরু হতে যাওয়া টুর্নামেন্টে এবার কারা মাঠ মাতাবেন, ছিনিয়ে নিয়ে যাবেন শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট; সেই প্রশ্ন জানতে অপেক্ষার প্রহর শেষ প্রায়। তবে টুর্নামেন্ট নেইমারের দুর্দান্তপনায় শুরুর আগেই ৩২ দেশের ৭৩৬ খেলোয়াড়ের মধ্যে থেকে দৈনিক ইত্তেফাকের পাঠকদের জন্য বেছে নেয়া হল দশজনকে যারা নিজ নিজ দলের সাফল্যে রাখতে পারেন সবচেয়ে বড় ভূমিকা।
তার সময়ের সেরা হিসাবে তাকে মেনে নিতে কারো আপত্তি থাকার কথা নয়, তবে লিওনেল মেসি সর্বকালের সেরা কিনা সেটা নিয়ে বিতর্ক চলছে গত কয়েক বছর ধরেই। মেসি সমালোচকদেরও যুক্তিটাও খুব সহজ, ‘আগে বিশ্বকাপ জেতো, তারপরই কেবল সর্বকালের সেরার প্রশ্ন।’ তাদের এই যুক্তিও উড়িয়ে দেয়ার উপায় নেই। কারণ পেলে-ম্যারাডোনা-বেকেনবাওয়ারা ঘরোয়া সাফল্যের পাশাপাশি জাতীয় দলের হয়ে জিতেছেন বিশ্বকাপও। তাদের চাইতে কেবল এই একটি জায়গাতেই পিছিয়ে আছেন মেসি। টানা চারবারের ফিফা বর্ষসেরা পুরস্কার, ক্লাব ফুটবলের সবগুলো ট্রফি, ইউরোপিয়ান গোল্ডেন বুট; মেসির অধরা নেই কোন কিছুই। অথচ, জাতীয় দলের জার্সি গায়ে দিলেই কেমন যেন অচেনা হয়ে যান এই বার্সেলোনা তারকা। জাতীয় দলের হয়ে তার সর্বোচ্চ সাফল্য হয়ে আছে তাই গত বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছানোটাই। সেই আক্ষেপ ঘোচাতে মরিয়া মেসির সামনে ব্রাজিলে দেশকে বহু আরাধ্য তৃতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা এনে দেয়ার পাশাপাশি চাইবেন ব্যক্তিগত লক্ষ্য পূরণ করতেও।
নেইমার
তারকাখ্যাতিতে রোনালদো-মেসিদের সাথে একই উচ্চতায় এখনো পৌঁছাতে না পারলেও খুব একটা পিছিয়েও নেই নেইমার। বরং এক জায়গায় তাদের চাইতে এগিয়েই আছেন। মেসি-রোনালদোদের যাবতীয় সাফল্য যেখানে ক্লাবের হয়ে সেখানে নেইমারের বড় সাফল্যগুলো এসেছে জাতীয় দলের জার্সি গায়েই। কনফেডারেশন্স কাপের সর্বশেষ আসরে নেইমারের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সেই অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয় ব্রাজিল। বিশ্বকাপের প্রস্তুতিমূলক টুর্নামেন্ট বলে পরিচিত এই প্রতিযোগিতার ফাইনালে স্পেনের বিরুদ্ধে দুই গোল করে নেইমার আবারো প্রমাণ করেন, পেলে-রোনালদোর বিখ্যাত দশ নম্বর জার্সির ওজন বহন করার ক্ষমতা পুরোপুরিই আছে তার। ঐ টুর্নামেন্টের পরপরই বার্সেলোনায় নাম লেখানো এই তারকাকে কেন্দ্র্র করেই ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জেতার স্বপ্ন দেখতে ব্রাজিল। আর সেটা করতে পারলে নিশ্চিতভাবেই ব্রাজিলের গৌরবোজ্জ্বল ফুটবল ইতিহাসে অমরত্ব পেতে যাচ্ছেন এই তারকা।
ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো
লিওনেল মেসির তারকাদ্যুতিতে শুরুতে কয়েক বছর ধরে কিছুটা আড়ালে থাকা রোনালদো সময় গড়ানোর সাথে সাথেই নিজেকে তুলে এনেছেন মেসির কাছাকাছি। মেসিকে টপকে এবার দখল করেছেন ফিফা ব্যালন ডিঅরও। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে গত মৌসুমে রোনালদোর পারফরম্যান্সও ছিল দুর্দান্ত। অবিশ্বাস্য গতির পাশাপাশি, ক্ষীপ্রতা, কৌশল আর প্রকৃতি প্রদত্ত প্রতিভায় প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের বাধা টপকে দারুণ সব গোল করায় পারঙ্গম এই পর্তুগিজ অবিশ্বাস্য সব ফ্রি কিকেও যে কোন সময় ম্যাচের গতিপথ পাল্টে দেয়ার ক্ষমতা রাখেন। সব ধরনের প্রতিযোগিতা মিলে ক্লাবের হয়ে গত মৌসুমে পঞ্চাশ গোলের মাইলফলক পেড়োনোর পাশাপাশি লুইস সুয়ারেজের সঙ্গে যৌথভাবে জিতেছেন ইউরোপিয়ান গোল্ডেন বুটও। রিয়ালের বহু আরাধ্য দশম চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা জেতাতে রোনালদোরই ছিল বড় ভূমিকা। রিয়ালের হয়ে এই ফর্মটা নিশ্চিতভাবেই বিশ্বকাপেও টেনে আনতে চাইবেন এই তারকা। আর রোনালদো যদি সেটা করতে পারেন তাহলে পর্তুগালের প্রথম বিশ্বকাপ জিতে যাওয়াটাও মোটেই অসম্ভব নয়।
লুইস সুয়ারেজ
দক্ষিণ আফ্রিকায় বিশ্বকাপের গত আসরের কোয়ার্টার ফাইনালে ঘানার বিরুদ্ধে নিশ্চিত গোল হাত দিয়ে ঠেকিয়ে আলোচিত-সমালোচিত হওয়া লুইস সুয়ারেজ এবারও আছেন আলোচনার কেন্দ্রে। এবার অবশ্য নেতিবাচক কোন কারণে নয়। লিভারপুলের হয়ে সর্বশেষ মৌসুমে এই উরুগুইয়ানের অসাধারণ ফর্মই আলোচনায় রেখেছে তাকে। যদিও মৌসুমের শেষ দিকে চোটের শিকার হওয়া এই তারকা নিজেকে পুরোপুরি ফিরে পাননি এখনও। তবে দলের প্রতি নিবেদনের জন্য বরাবরই সমর্থকদের সুনজরে থাকা ইউরোপিয়ান গোল্ডেন বুট জয়ী এই তারকা জানিয়েছেন, যে কোন মূল্যে বিশ্বকাপে খেলবেন তিনি।
আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা
স্প্যানিশ ফুটবলের এই মহাতারকাকে দলের প্রয়োজনে যে কোন পজিশনেই ব্যবহার করা সম্ভব। গতানুগতিক ‘টিকিটাকি’ স্টাইলে তো অবশ্যই দলের প্রয়োজনে অন্য যে কোন কৌশলের সাথেই মানিয়ে নিতে পারেন তিনি। কাতালানদের সাফল্যে বড় ভূমিকা রাখার পাশাপাশি জাতীয় দলের হয়েও ইনিয়েস্তার পারফরম্যান্স দারুণ। স্পেনের ইউরো এবং বিশ্বকাপ জয়ী দলের এই সদস্য দীর্ঘদিনের ক্লাব সঙ্গী জাভিকে সাথে নিয়েও এবারও স্পেনের আক্রমণ রচনায় মূল ভূমিকা পালন করবেন। ২০১০ বিশ্বকাপে স্পেনের হয়ে ইনিয়েস্তার শিরোপা জয়ী গোলের কথাটি এখনো নিশ্চয় সবাই ভুলে যায়নি।
মেসুত ওজিল
এই প্লে মেকারকে নিয়ে মন্তব্যে দুটি ভাগে বিভক্তি পাওয়া যায়। তবে মজার বিষয় হল দুই পক্ষের কারোরই নিজ নিজ মতের কারণে হতাশ হবার উপায় নেই। ওজিলের বর্তমান ক্লাব কোচ আর্সেন ওয়েঙ্গার তার ব্যাপক প্রশংসা করে বলেছেন, ওজিলের নির্ভেজাল অন্তর্দৃষ্টির প্রখরতায় তিনি মুগ্ধ। মাঠে খেলার সময়ও তার মস্তিষ্ক দারুণভাবে সচল থাকে এবং কখন কোন জায়গাটিতে অবস্থান করতে হবে সেটি তিনি বুঝে নিতে পারেন। ওজিলের সাবেক ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদের কোচ কার্লো আনচেলত্তির দৃষ্টিতে এই খেলোয়াড়টির মধ্যে দারুণ প্রতিভা থাকলেও মাঠে তার কম মাত্রাই তিনি নিজের জন্য ব্যবহার করেন। তাকে জার্মান সতীর্থদের সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে চলতে হবে। তবে তিনি এই মতপার্থক্যের নিষ্পত্তি ঘটাতে পারেন আসন্ন ব্রাজিল বিশ্বকাপ দিয়ে।
ওয়েসলি স্নেইডার
গালাতাসারেতে যোগ দেয়ার ফলে তিনি হয়তো ইউরোপের অভিজাত ফুটবল থেকে কিছুটা দূরে অবস্থান করছেন। তাছাড়া ক্লাবের হয়ে গত দুই বছরে স্নেইডারের পারফরম্যান্সও তার মানের ছিল না। ফলে অধিনায়কের আর্মব্যান্ডের পর গত বছর স্নাইডারকে দল থেকেও বাদ দেন কোচ লুইস ফন গল। আর ফন গলের দলে উপেক্ষিত হয়েই যেন মাঠের পারফরম্যান্সের প্রতি মনোযোগী হন সাবেক রিয়াল মাদ্রিদ ও ইন্টার মিলান তারকা। কঠোর পরিশ্রম করে ফিটনেস ফিরে পাবার পাশাপাশি কৌশলগত দিক থেকেও এখন দারুণ সমৃদ্ধ স্নাইডার। ফলে নেদারল্যান্ডসের বিশ্বকাপ মিশনে অন্যতম বড় অস্ত্র বলে বিবেচনা করা হচ্ছে স্নাইডারকে।
ওয়েন রুনি
কেউ কেউ হয়তো জাতীয় দলের তালিকায় অন্যদের সঙ্গে রুনির অন্তর্ভুক্তি বিষয়ে আলোচনা না করে কৌশলে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করবে। তবে চলতি মৌসুমে তার পারফর্মেন্সের ভিত্তিতে যদি দেশটির অভিজাত তালিকায় তাকে যুক্ত করা হয় তাহলে এর পক্ষে-বিপক্ষে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা আসবে। ২০০৪ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়ন শীপে ত্বরিতগতির পারফর্মেন্সের পর থেকে ইনজুরি ও ফর্মহীনতায় জর্জরিত রুনি পরবর্তী সবগুলো বড় ইভেন্টেই হতাশ করেছেন। ইংল্যান্ডের সফলতা প্রশ্নে তিনি দুর্ভাগ্যজনকভাবে বার বার হতাশ করেছেন। তাকে ঘিরে থাকা তরুণ মেধাবীদের সহযোগিতা ছাড়া ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের এই তারকা মঠেও আলো ছড়াতে পারবেন না।
সিনঝি কাগাওয়া
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে দুই বছর দুঃখ-কষ্টের মধ্যে অতিবাহিত করার পরও জাপানের কাগাওয়া মনে করেন বিশ্বকাপের চেতনা তার মানসিক দৃঢ়তাকে আরো এগিয়ে নিয়েছে। বিশ্ব আসরে গ্রুপভুক্ত কলম্বিয়া, গ্রীস ও আইভরি কোস্ট এর বিপক্ষের ম্যাচগুলো তার জন্য সঠিক একটি পরিবেশ সৃষ্টি করবে যেখানে তিনি পয়েন্ট আদায়ের মাধ্যমে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে তাকে যারা উপেক্ষা করেছে তাদের সমুচিত জবাব দিতে পারবেন। ম্যানচেস্টারে যোগ দেয়ার আগে দ্রুতগতির দৌড় এবং অবস্থান নেয়া সংক্রান্ত তীক্ষ সচেতনতার কারণে বরুশিয়া ডর্টমুন্ডে তিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ের আসনে পৌঁছে গিয়েছিলেন।
