কাল বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু। দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষায় ফুটবলপ্রেমীরা। পছন্দের দেশ কিংবা খেলোয়াড়ের সম্ভাব্য
পারফরমেন্স নিয়ে গোটা দুনিয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশে সর্বত্রই চলছে আলোচনার ঝড়। চায়ের
দোকান, গেস্টরুম, হলের রুমে আলোচনার বিষয় একটাই— ফুটবল বিশ্বকাপ
-এতো মেসি মেসি করিছ না তো, গত বিশ্বকাপ দেখছি না, এমন আহামরি কি খেলে, পুরো বিশ্বকাপ বলের পিছনে পিছনে দৌড়াইছে, একটা গোলও করতে পারলো না।
-আর তোমাগো নেইমারের তো বিশ্বকাপ খেলার অভিজ্ঞতাই নাই। মেসির মত প্লেয়ার পাইতে হইলে আরও সাতজনম অপেক্ষা করতে হইতে পারে। কে সেরা খেলোয়াড়? খবর রাখছ কিছু?
-শোনো ভাইয়া, এইটা বিশ্বকাপ। ক্লাব ফুটবল না। পাঁচ পাঁচবার বিশ্বকাপ হাতে নিয়া দেখছি। একবারও বিশ্বকাপে আটকাই নাই। পারলে দেখাও। ক্লাবের কথা এইখানে বইলো না।
-এটা ফুটবল, কথার খেলা না। মাঠে আসো, দেখা যাবে।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিনে ঢুকতেই ওয়াসিফ আর ফারিয়ার এমন বিতর্ক চোখে পড়লো। কথা বলে জানা গেল, ওয়াসিফ সেই ছোটবেলা থেকেই ব্রাজিলের ডাই হার্ট ফ্যান। অপরদিকে কিছুদিন ধরে বার্সেলোনায় মেসির খেলা দেখে এবারের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা সমর্থন করছেন ফারিয়া। দুজনের গায়েই প্রিয় দলের জার্সি। এই মুহূর্তে ফুটবল ছাড়া আর কিছুই মাথায় আসছে না এই দুই শিক্ষার্থীর।
ফারিয়া জানান, আর্জেন্টিনার ম্যাচের দিন ট্যাটু আঁকাবেন আর বাসায় সবার সাথে বসে যাবো। এবারের ম্যাচগুলো বাংলাদেশ সময় একটু মাঝরাত এবং ভোরের দিকে হওয়ায় বন্ধুদের সাথে খেলা দেখাটা মিস করবেন বলে একটু আফসোসও লক্ষ্য করলাম ফারিয়ার মধ্যে। অপরদিকে ওয়াসিফ জানান, ইতিমধ্যে তিনি কাছের সব বন্ধুদের দাওয়াত করে দিয়েছেন একসঙ্গে বাসায় খেলা দেখার জন্য।
বিশ্বকাপ আসলেই যেন থমথমে যুদ্ধের একটা আবহ তৈরি হয় ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মধ্যে। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্মের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র শুভ দাসের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল একবারেই ভিন্ন কথা। ব্রাজিল কিংবা আর্জেন্টিনা ছাড়াও আরও অনেক দল ভালো ফুটবল খেলে। এবারের বিশ্বকাপে ফেবারিট হচ্ছে জার্মানি। আমার প্রিয় দল বলে আসলে এবারের দলটা বেশ ব্যালেন্সড। পাশাপাশি দলে রয়েছে ক্লোসা, গোমেজ কিংবা ওজিলের মত নামিদামি তারকারাও। পাশাপাশি একটু খারাপও লাগছে রিউসের ইনজুরির কারণে বাদ পড়া নিয়ে। কথাগুলো এভাবেই বলে যাচ্ছিলেন শুভ।
কিন্তু বাদ সাধে তার পাশেই বসে থাকা আর্জেন্টিনা দলের সমর্থক রায়হানের কথায়। তোমাদের কারণেই আমরা কখনো আমাদের ভালো ফুটবলটা খেলতে পারি না। এমন সব লং পাসের খেলা খেলো, কোন শিল্পই নাই। শুভকে আটকে দিয়ে বলে ফেলে রায়হান। শুরু হয়ে যায় আবার ফুটবল নিয়ে ক্যাম্পাস বিতর্ক। কিছুক্ষণের মধ্যেই জটলা লেগে যায় আরও কিছু বন্ধুরা ছুটে আসলে। তাদের পরনে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, স্পেনের পতাকা।
মধুর ক্যান্টিনে ঢুকতেই কথা হয় ফয়সালের সাথে। গায়ে স্পেনের পতাকা। ‘গতবারও যেমনি স্পেন করতাম, এবারো করছি। গতবার যেমনি বিশ্বকাপ আমরা নিয়েছি, এবারো আমরাই নিবো।’ বলছিলেন ফয়সাল। পছন্দের ফুটবলার কে জানতে চাইলে ফয়সাল বলেন, আমার জাভি, ইনিয়েস্তা, ভিয়া, ক্যাসিয়াস সবাইকেই বেশ পছন্দ। তবে ব্রাজিল দল থেকে আসা দিয়াগো কস্তার ইনজুরি নিয়ে বেশ চিন্তিতই মনে হোল ফয়সালকে।
এই বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো ইতোমধ্যে ভরে উঠেছে ভালোবাসার দলগুলোর পতাকায়। হলের অনেকেই পরিকল্পনা করে ফেলেছেন নিজ দলের সাথে থাকতে একসঙ্গে ম্যাচ দেখার। এমনই একজন হলেন রাজীব কর্মকার। থাকেন জগন্নাথ হলে। পছন্দের দল ব্রাজিল। তাই ব্রাজিলের সঙ্গে থাকতেই জার্সি কিনে ফেলেছেন। আর হলের বাকি সমর্থকদের সাথে হলেই খেলা দেখবেন বলে পরিকল্পনা করছেন রাজীব।
দেখতে পেলাম একজনকে পর্তুগালের জার্সি পরে ক্লাসরুমে ঢুকতে। পেছনে লেখা রোনালদো। বুঝতে বাকি রইলো না রোনালদোর ফ্যান হবার কারণেই এই বিশ্বকাপে করেছেন পর্তুগালের সমর্থন। কথা বলে জানা গেল, তার নাম অনামিকা ইমি। এখানেই পড়ছেন আইন বিষয় নিয়ে। ক্লাব ফুটবলে রিয়াল মাদ্রিদের একজন ফ্যান। অনেক ভালো লাগে রোনালদোর খেলাও। সেজন্য এই বিশ্বকাপে তিনি থাকছেন পর্তুগালের সাথে। খেলা দেখবেন পরিবারের সঙ্গে। বাসায় একমাত্র পর্তুগালের সমর্থক তিনি। তাই যুদ্ধে তিনি একাই লড়ছেন সবার সাথে!
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী রাকিবকে। এমনকি যথারীতি ক্লাসও করছে মেসি ভক্ত এই শিক্ষার্থী। আর্জেন্টিনার দল এবার কাপ নিয়েই ঘরে ফিরবে এমন আশায় দিন গুনছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের শীফাত, তিশা আর অনিন্দিতা। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ফেরদৌসি, রানা আর তৃতীয় বর্ষের মাহির সমর্থনটা বিপরীত। ব্রাজিলের সমর্থক এসব শিক্ষার্থীদের বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে একসাথে ঘোরা আর আড্ডা দিতে দেখা যায়।
স্কুল পড়ুয়া শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের কাছে দীর্ঘ ক্লাস পরীক্ষার ঘূর্ণিপাকে ফুটবল বিশ্বকাপই বিনোদনের একমাত্র উত্স। ফুটবলপ্রেমীরা উচ্ছসিত বিশ্বকাপের মাতাল হাওয়ায়। বিশ্বকাপ উন্মাদনার হাওয়া লেগেছে সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে। এর নানা চিত্র দেখা মেলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্যাম্পাস ঘুরলে। বিশ্বকাপ কি সত্যিই ব্রাজিলে না বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হবে!
মডেল: সজীব, সাজিদ, সামাদ, শম্পা ও বৃষ্টি
ছবি: মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর ও রাকিবুল হক
