সর্বকালের সেরা ডিফেন্ডারদের একজন মনে করা হয় তাকে। আর্জেন্টিনার হয়ে খেলা ছেড়েছেন বেশ আগে, ক’দিন আগে ক্লাবও ছেড়েছেন ইন্টার মিলানের কিংবদন্তী হ্যাভিয়ের জানেত্তি। গত বিশ্বকাপের সময়টাতে ক্যারিয়ারের সেরা ফর্মে থেকেও ম্যারাডোনার দলে উপেক্ষিত ছিলেন। তাতে এতোটুকু রাগ নেই। বরং এবার নিজের উত্তরসূরীদের বিশ্বকাপ জয় দেখতে মুখিয়ে আছেন ‘এল কাপিতানো’। খুব জোর দিয়েই বললেন, মেসির হাতে বিশ্বকাপ দেখতে পাচ্ছেন তিনি—
আপনি তো মেসির ব্যাপারে সব সময় উচ্চকণ্ঠ। কিন্তু সে আর্জেন্টিনার হয়ে বার্সেলোনার মতো খেলতে পারে না।
এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। বার্সেলোনায় সে যে প্রতাপ দেখায়, আর্জেন্টিনার হয়ে অতোটা প্রতাপ দেখাতে পারবে না; এটাই স্বাভাবিক। বছরের পর বছর, প্রতিটা দিন আপনি যাদের সঙ্গে বসবাস করছেন; সেই খেলোয়াড়দের সঙ্গে একটা টেলিপ্যাথিক যোগাযোগও তৈরি হয়ে যায়, বোঝাপড়াটা অন্য মাত্রায় থাকে। বিপরীতে কয়েক মাস বিরতির পর আপনি যখন বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা খেলোয়াড়দের সঙ্গে মাঠে নামবেন, যাদের সঙ্গে নিয়মিত খেলেন না, তখন ওই একই ছন্দ ধরে রাখাটা সহজ না।
এই মানিয়ে নেয়ার কাজটা তো যারা সেরা, তাদের পারতেই হয়?
আমি বিশ্বের সেরা পর্যায়ের অনেক খেলোয়াড়কেই দেখেছি, যারা ক্লাবের খেলাটা জাতীয় দলের হয়ে খেলতে পারে না। কার্যত প্রায় কেউই ক্লাবের মতো সাবলীল খেলাটা জাতীয় দলে আজকের দিনে আর খেলতে পারে না। ফলে মেসির ব্যাপারটা খুব বিস্ময়কর বলে আমার মনে হয় না। তবে এবার পরিস্থিতিটা অন্যরকম হবে বলে আমার মনে হচ্ছে।
আপনার মনে হচ্ছে, এবার মেসি আর্জেন্টিনার হয়ে ভালো খেলবেন?
আমি লক্ষণগুলো দেখতে পাচ্ছি। আমার মনে হচ্ছে, মেসির ক্যারিয়ারের সেরা খেলাটা আমরা ব্রাজিলে দেখাতে পাবো। বাছাইপর্বে আমরা মেসির কাছ থেকে এমন পারফরম্যান্স পেয়েছি, যেটা বার্সাতেও খুব একটা দেখা যায় না। আমার মনে হয়, অধিনায়কত্ব ওর ভেতর থেকে বাড়তি কিছু বের করে এনেছে। আমি জানি, ওর ভেতরের শক্তিটা আসলেই অসাধারণ। আর এবার ও সত্যিকারের নেতৃত্ব গুণটাও দেখাচ্ছে।
আপনি গ্রেট ক্যাপ্টেনদের একজন। আপনার মনে হয়, মেসি ভালো অধিনায়ক?
আমার মনে হয়। ও অধিনায়কত্বটা সেরা সম্ভব উপায়েই করছে। আশেপাশের সবাইকে দেখছি অনুপ্রাণিত করার চেষ্টা করছে। যেভাবে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছে, এটা দল হিসেবে আমাদের অনেকদূর নিয়ে যাবে বলে মনে হয়।
আপনি তাহলে মেসির সফলতার ব্যাপারে নিশ্চিত?
আমি তো দেখতে পাচ্ছি, ও অসাধারণ একটা বিশ্বকাপ কাটাবে। মঞ্চ ওর জন্য প্রস্তুত, ও নিজেও প্রস্তুত। আমি আসলেই বিশ্বাস করি, সময়টা এবার আমাদের এবং আমি দেখতে পাচ্ছি লিওনেল ট্রফি উঁচু করে ধরেছে।
আপনি তো আর্জেন্টিনার আরেকটি সোনালী প্রজন্মে খেলেছেন। বলা হয়, আপনাদের দলে নানা রকম দ্বন্দ্ব ছিল বলে সফলতা আসেনি।
দেখুন, আমাদের সময়ও অসাধারণ একটা দল ছিল। আমরা খুবই একতাবদ্ধ ছিলাম এবং দেশের জন্য সব সময় সেরাটাই খেলতে চাইতাম। আমাদের দলে কখনোই দলীয় কোন্দল বা এ রকম কিছু ছিল না। হ্যাঁ, আমরা কেন কিছু জিততে পারিনি বা সব সময় ভালো করতে পারিনি; সেটা তো প্রশ্ন করাই যায়। তবে আমাদের একতা বা আকাঙ্ক্ষা নিয়ে প্রশ্ন নেই। আমি আর্জেন্টিনাকে প্রতিনিধিত্ব করেছি, এটা আমার জন্য গর্বের, আনন্দের এবং সম্মানের অনুভূতি। আমার ধারণা সব খেলোয়াড়েরই এই গর্ব হয়।
তাহলে ঠিক কেন আপনারা বিশ্বকাপ জিততে পারেননি?
বিশ্বকাপটা খুব সহজ একটা টুর্নামেন্ট তো নয়। এটা জিততে গেলে আপনার শুধু ভালো একটা দল থাকলে চলবে না, দারুণ ভাগ্যও থাকতে হবে; সেটা আমাদের পক্ষে ছিল না। উদাহরণ হিসেবে ২০০২ সালের দলটার কথা ভাবুন। কি ছিল না আমাদের? ওই রকম একটা দল, সঙ্গে মার্সেলোর (বিয়েলসা) মতো কোচ। আমার ক্যারিয়ারে পাওয়া সেরা কোচ ছিলেন উনি। টেকনিক্যাল জ্ঞান, অনুমান ক্ষমতা, মানুষ সামলানোর ক্ষমতা; সবকিছুতে এক নম্বর। কিন্তু আমরা সেই দল নিয়ে গ্রুপ পর্বই পার হতে পারলাম না! লোকেরা সমানে বলছিল, আমরা ফেবারিট; কিন্তু বিষয়টা একটা ধাঁধা নয়?
এই দীর্ঘকাল ধরে আর্জেন্টিনার কিছু না জেতায় এক ধরনের চাপ নিশ্চয়ই তৈরি হয়েছে?
চাপ নয়, এটা এখন দাবিতে পরিণত হয়েছে। প্রত্যেকবার বিশ্বকাপ আসে এবং আর্জেন্টিনার লোকজন শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়দের কাঁধে কেমন চাপ তো বুঝতে পারে। সেটা থেকে এবার আমাদের তারকা বহুল দলের ওপর কেমন প্রত্যাশা অনুমান করুন। ফুটবল তো আর্জেন্টিনার মানুষের জীবনের অংশ। ট্রফি ছাড়া দেশে ফিরে আমার প্রথমেই মনে হয়েছিল, এই মানুষগুলোকে ডুবিয়েছি আমরা। সেটা এবার হতে দেয়া যাবে না।
আপনাদের এই আশা কী এখনকার খেলোয়াড়রা পূরণ করতে পারবেন?
আমার ধারণা এবার ছেলেরা কাজটা করে ফিরবে। মেসি, হিগুয়েইন, আগুয়েরোদের ওপর দেশের সব মানুষের মতো আমারও ভরসা আছে। আমাদের কী ভয়ঙ্কর এক আক্রমণ ভাগ! আপনি লাভেজ্জি আর প্যালাসিওকেও তো ফেলতে পারবেন না। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এবার আমাদের যে দল তারা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেই ফেরার যোগ্যতা রাখে।
