সাও পাওলোর করিন্থিয়ান্স স্টেডিয়ামের চারদিকে কড়ানিরাপত্তা ব্যবস্থা। পাহাড়ের উপরে নতুন করে সংস্কার করা স্টেডিয়ামটি সন্ধ্যার পর আলোকসজ্জায় ভরে উঠে। বিকাল না গড়াতেই স্টেডিয়ামের চার পাশে লোকজনের ভিড় জমে যায়। পরিবার সন্তান নিয়ে ফুটবল পাগল র্দশকরা স্টেডিয়ামের বাইরের মনোরম দৃশ্য দেখতে আসনে। স্টেডিয়ামে যেন অপ্রীতিকর কোনো ঘটনা না ঘটে তার জন্য শত শত নিরাপত্তা কর্মী ব্যবস্থা নিয়েছেন। বাংলাদেশে মোহামেডান-আবাহনী ম্যাচের আগে স্টেডিয়াম এলাকায় যেমন ভিড় জমে যেতো একসময়, বিশ্বকাপ ফুটবলের উদ্বোধীন ম্যাচের আগে স্টেডিয়ামের যেন সেই চিত্র। সবার মুখে ফুটবলের আলোচনা। ফুটবল পাগল। এখানে ফুটবল ছাড়া অন্য কিছু ভাবে না মানুষ। যে টাকা আয় হয় তার একটা অংশ ফুটবলের জন্য বরাদ্দ থাকে তাদের। বিশ্ব ফুটবলে ওরা ব্রাজিল ছাড়া অন্য কিছু ভাবে না। পেলে থেকে নেইমার। ব্রাজিলের মানুষের ঘরে ঘরে পেলে-নেইমারদের ছবি। ফুটবল কিংবদন্তীরা ব্রাজিলের মানুষের কাছে দেবতুল্য। রাস্তায় রাস্তায় ফুটবলারদের ছবি অংকন করা আছে। রাত ১১টায় দেখা গেলো সাত বছরের শিশু বাবার সাথে ফুটবল লাথি মারতে মারতে দোকানে ঢুকেছে। ফুটপাত কিংবা ঘরের বান্দায় ফুটবল আর ফুটবল। ঘরে ঘরে ব্রাজিলের পতাকা উড়ছে। বাংলাদেশে বাড়ির ছাদে পতকা উড়তে দেখা গেলেও ব্রাজিলে সেটা নেই। বারান্দায় পতাকা লাগানো হয়েছে। প্রত্যেক ঘরে পতাকা। গাড়িতে উড়তে শুরু করেছে পতাকা। বড় গাড়ির শোরুমগুলোতে বিক্রির জন্য গাড়ি রাখা হলেও সেগুলো ব্রাজিলের পতাকা দিয়ে জড়িয়ে দেয়া হয়েছে। রাত ১২টায় দেখা গেলো- সমর্থকরা রাস্তার উপরে বিশাল আকৃতির ব্রাজিলের পতাকা আঁকছেন। ছবি তুলতে অনুমতি নিতে হলো। পর্তুগীজ ভাষা ব্রাজিলের প্রথম ভাষা। ইংরেজি খুব কম লোকই জানেন। একটা বললে আরেটা বুঝেন। ইয়েস নো গুড-এর চেয়ে বেশি বলতে পারেন না, বুঝতেও পারেন না। কথায় কথায় বলেন, অভরিগোদা (ধন্যবাদ) নিউআমিগো (হে আমার বন্ধু)। যিনি সামান্য ইংরেজি বুঝেন এমন ব্রাজিলীয়দের সাথে কথা হয় ব্রাজিলের ফুটবল নিয়ে। ওদের একটাই কথা, ‘ফুটবল আমাদের কাছে ধর্মের সমান। ব্রাজিলের ফুটবলই ধর্ম। আমাদের কাছে ফুটবল খেলাটাই একটা ধর্ম পালনের সমান।’ ফার্নান্ডো সিলভা এক সময় ফুটবল খেলতেন। ইনজুরির কারণে তার খেলা হয়নি। বলছিলেন, ‘কোনো তরুণ যদি ফুটবল খেলতে না চায় আমরা তাকে জিজ্ঞেস করি সৃষ্টি কর্তার সাথে তার এমন কোনো আলোচনা হয়েছে কিনা যে, তাকে ফুটবল খেলতে হবে না।’ ৪৪ বছর বয়সের ফার্নান্ডো বলেন, ‘কেউ জন্মের পর ফুটবল না খেললে বুঝতে হবে তার কোনো সমস্যা আছে।’ ব্রাজিলের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে মানুষের সাথে কথা বলে জানা গেছে- তাদের কাছে ফুটবল খেলা শুধুই খেলা নয়। সেন্ট জনসন রোডের বাসিন্দা ফেব্রিগো বলেছেন, ‘আমরা এটাকে নিছক খেলা মনে করি না। ফুটবল খেলাটা আমাদের কাছে ধর্মের সমান। এমন কোনো ঘর নেই যেখানে আপনি ফুটবল পাবেন না। এমন কোনো ঘর নেই যেখানে নেইমার কেন বল মিস করলো এটা নিয়ে তর্ক হয় না।’ এই সব ফুটবল প্রিয় মানুষের কাছে ফুটবলই ওদের ধর্ম। হবেই না কেন। ফুটবল চর্চা করে ওরাই তো প্রমাণ করেছে রক্তে মিশে গিয়ে ফুটবল আজ ধর্মে পরিণত হয়েছে। পাঁচ বার বিশ্বকাপ ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলে কথিত আছে, পরিবারে কন্যা সন্তান জন্ম নিলে বাবা মা খুব একটা খুশি হন না। হতে পারেন না। কারণ কন্যা সন্তানের চেয়ে পুত্র সন্তান জন্ম গ্রহণ করলে সেটা বেশি লাভজনক। পুরো পরিবারের ভাগ্য ঘুরিয়ে দিতে পারে। মায়েরা যখন পেটে সন্তান ধারণ করেন। তখন সৃষ্টি কর্তার কাছে দিন-রাত প্রার্থনা করেন পুত্র সন্তান পাবার আশায়। বাংলাদেশে প্রসূতি মায়ের ঘরে টুকটুকে সুন্দর বাচ্চার ছবি টাঙানো থাকে। আর ব্রাজিলে পেলে, দুঙ্গা, কার্লোস, কাকা, নেইমারদের ছবি টাঙানো হয়। ফুটবলারদের ছবি সামনে রেখে জন্ম নেয়া শিশুর পরিবারের লক্ষ্য থাকে ছেলেকে এমন একজনই বানাবেন। বাংলাদেশে যেমন ছেলে-মেয়েকে শিক্ষিত করার জন্য নানা ভাবে ভালো ভালো শিক্ষকের কাছে কোচিং করান। তেমনি ব্রাজিলে ফুটবল খেলা শেখানোর জন্য কোচিং সেন্টারে পাঠানো হয়। দেয়া হয় একাডেমীতে। বাংলাদেশ এখনো একটা ফুটবল একাডেমী করতে পারেনি। আর ব্রাজিলে বেসরকারিভাবে কতো হাজার ফুটবল একাডেমী রয়েছে তার সঠিক কোনো হিসাব নেই। আর প্রাথমিক তথ্য অনুুসারে শুধু সাও পাওলোতে ফুটবল অনুশীলনের তিন হাজার ফুটবল মাঠ রয়েছে। পুরো ব্রাজিল জুড়ে হাজার হাজার ফুটবল মাঠ। কয়েক ডজন স্টেডিয়াম। এমন দেশের মানুষজন তো বলতেই পারে দেশে ধর্মের আরেক নাম ফুটবল।
