বিশ্বকাপের বিশতম আসরের পর্দা উঠছে আজ। বিশ্বের প্রতি প্রান্তের কোটি কোটি মানুষের চোখ এখন ব্রাজিলে। চার বছরের অপেক্ষা শেষে সবাই আবারো তৈরি ফুটবল শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই উপভোগের জন্য। লিওনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, নেইমারদের পায়ের জাদু দেখতে আর তর সইছে না ভক্তদের।
তবে বিশ্বকাপের অন্যসব আসরগুলোর চাইতে এবারের আসরটা বিশেষ হয়ে উঠেছে একটি কারণে। এমন এক দেশে এবার বিশ্বকাপ হচ্ছে যে দেশটি শুধু বছরের পর বছর ধরে বিশ্ব ফুটবলের সেরা সব তারকাই উপহার দেয়নি,পৃথিবীব্যাপী ফুটবলের জনপ্রিয়তা তৈরিতেও রেখেছে বিশাল ভূমিকা। আমার মনে হয় না পুরো ব্রাজিল ঘুরে একজন মানুষ পাওয়া যাবে যার কাছে ফুটবলের চাইতে বড় কিছু আছে। এমন দেশে যদি বিশ্বকাপ হয়, সেটা আলাদা উন্মাদনার সৃষ্টি করবে সেটাই স্বাভাবিক।
মাঠের বাইরের বিশ্বকাপ বিরোধী আন্দোলন কিংবা এই উন্মাদনার বাইরে যদি মাঠের লড়াইয়ের দিকে তাকাই, আমার বিশ্বাস অসাধারণ একটা টুর্নামেন্টই অপেক্ষা করছে ফুটবল ভক্তদের জন্য। এটা এমন একটা টুর্নামেন্ট হবে, যেখানে ফেভারিটদের প্রায় সবারই সুযোগ থাকবে শিরোপা জেতার। কারণ, শক্তিমত্তার দিক থেকে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি কিংবা স্পেনের মতো দলগুলো খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে। যদিও, পরিচিত কন্ডিশন ব্রাজিলকে কিছুটা হলেও বাড়তি সুবিধা দেবে।
একটা টুর্নামেন্ট যেখানেই হোক না কেন, স্বাগতিক দেশ বাড়তি কিছু সুবিধা পাবে সেটাই স্বাভাবিক। তবে তাই বলে ব্রাজিলকে মোটেই ছেড়ে কথা কইবে না অন্য দলগুলো। আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগ, স্পেনের ছন্দ আর জার্মানির টিমওয়ার্কের কথা ভুলে গেলে চলবে না। শিরোপা যেই জিতুক, কঠিন লড়াই করেই সেটা অর্জন করতে হবে তাদের।
বিশ্বকাপের গ্রুপগুলোর দিকে তাকালে আমার মনে হয়, প্রতিটি গ্রুপেই লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি। এ গ্রুপ থেকে নকআউট পর্বে উত্তরণের সবচেয়ে বড় দাবিদার অবশ্যই ব্রাজিল। তাদের দলটা এমন যেখানে তারুণ্যের পাশাপাশি আছে দারুণ অভিজ্ঞতার ছোঁয়াও। লুইস ফেলিপে স্কলারির কোচিংয়ে দলটা গ্রুপ পর্ব তো বটেই টুর্নামেন্টেরই অন্যতম ফেভারিট। নেইমারের মতো তরুণ খেলোয়াড় যেমন আছেন, আছেন ড্যানিয়েল আলভেজ-মাইকনদের মতো অভিজ্ঞ তারকাও। আর দ্বিতীয় দল হিসাবে উত্তরণের লড়াইটা উন্মুক্তই থাকছে তিনটি দলের জন্য।
ব্রাজিলের প্রথম ম্যাচের প্রতিপক্ষ ক্রোয়েশিয়া এবং ক্যামেরুনের সমান সুযোগই দেখছি আমি। রিয়াল মাদ্রিদ তারকা লুকা মডরিচের পাশাপাশি আরও কয়েকজন তারকা খেলোয়াড় আছে দলে। তবে মেক্সিকো এই দুই দলকে কঠিন চ্যালেঞ্জে ফেলতে পারে। কারণ, বিশ্বকাপ ঐতিহ্যে পিছিয়ে নেই তারাও।
বি গ্রুপ থেকে নকআউট রাউন্ডের আগেই হয়তো বাদ পড়তে পারে ফেভারিটদের কাউকে । তবে, সেটা স্পেন না হবার সম্ভাবনাই বেশি। কনফেডারেশন্স কাপের শিরোপা জিততে না পারলেও এখনও দারুণ ছন্দময় ফুটবল খেলে দলটি। গত বিশ্বকাপের ফাইনালিস্ট নেদারল্যান্ডসকে সমস্যায় ফেলতে পারে চিলি। এই তিনটি দলের তুলনায় অস্ট্রেলিয়ার সম্ভাবনা কমই দেখছি আমি।
এশিয়ান পরাশক্তি জাপান গ্রুপের সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে সি গ্রুপ থেকে নকআউট রাউন্ডে চলে যেতে পারে। তবে শক্তিমত্তা বিচারে কলম্বিয়া, গ্রীস, আইভরি কোস্টেরও সুযোগ আছে কোয়ালিফাই করার। আসলে, চারদলের জন্য লড়াইটা প্রায় উন্মুক্তই থাকবে।
টুর্নামেন্টের ফিকশ্চার বলছে নকআউট রাউন্ডের আগেই বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হচ্ছে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ দশ দলের যে কোন একটিকে। কারণ, ডেথ গ্রুপ ‘ডি’তে একই সঙ্গে আছে ইংল্যান্ড, উরুগুয়ে এবং ইতালি। তিনটি দলেরই আছে বিশ্বকাপ জেতার অভিজ্ঞতা। তবে, আমার অনুমান বাদ পড়তে যাওয়া দলটির নাম ইংল্যান্ড। একাদশে তারকার কমতি না থাকলেও ইংলিশ খেলোয়াড়দের বয়সটাই ভাবাচ্ছে আমাকে। দলের সেরা খেলোয়াড়দের প্রায় সবার বয়সই ত্রিশের কাছাকাছি কিংবা তার চেয়ে বেশি।
ই গ্রুপ থেকে ফ্রান্সের পর হন্ডুরাস, ইকুয়েডর কিংবা সুইজারল্যান্ড যে কেউ যেতে পারে নকআউট রাউন্ডে। কোন অঘটন ঘটে যাওয়াও বিচিত্র নয়।
বিশাল দর্শক সমর্থনপুষ্ট দল আর্জেন্টিনা নি:সন্দেহে এফ গ্রুপের সবচেয়ে বড় ফেভারিট। দ্বিতীয় শক্তি হিসাবে আমি এগিয়ে রাখবো বসনিয়াকে। চেলসি তারকা এডিন জেকোর মতো খেলোয়াড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারেন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির হয়ে। তাছাড়া, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির আর্থ-সামাজিক অবস্থাও খেলোয়াড়দের উদ্বুদ্ধ করবে বড় কিছু উপহার দিতে। তাদের সামনে এশিয়ার প্রতিনিধি ইরানের সম্ভাবনা বেশ কম।
বিশ্বকাপে বরাবরই শক্তিশালী দল হিসাবে বিবেচিত হওয়া জার্মানি এবারও টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেভারিট। জি গ্রুপ থেকে উত্তরণের দৌড়েও সবচেয়ে এগিয়ে আছে তারাই। এরপরই আছে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর দেশ পর্তুগালকে। দেশকে ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরে এগিয়ে নিতে রোনালদোকেই পালন করতে হবে বড় ভূমিকা। আফ্রিকান পরাশক্তি ঘানার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না।
এইচ গ্রুপকে আমি বলবো বেলজিয়ামের গ্রুপ। প্রতিষ্ঠিত শক্তিদের বাইরে এই দলটিকেই আমি বিশ্বকাপে সবচেয়ে এগিয়ে রাখবো। অসাধারণ কিছু খেলোয়াড় আছেন তাদের। ভিনসেন্ট কোম্পানি, রোমেলো লুকাকু, এডিন হ্যাজার্ড কিংবা থিওবট কোর্তে এই সময়ের সেরা কিছু খেলোয়াড়দের তালিকায় পড়েন। জমাট ডিফেন্স আর দুর্দান্ত আক্রমণভাগের অধিকারী দলটি সেমিফাইনালে জায়গা করে নিলেও আমি অবাক হব না। শক্তিমত্তার দিক থেকে এর পরেই আছে রাশিয়া এবং আলজেরিয়া। যদিও আমি এগিয়ে রাখবো আলজেরিয়াকে। কারণ, সব সময়ই খেলায় একটা নির্দিষ্ট মান ধরে রেখেছে দলটি।
এদিকে, টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী রাতেই পরীক্ষা দিতে হচ্ছে স্বাগতিক ব্রাজিলকে। নিকট অতীতের যে কোন ব্রাজিল দলের চাইতে এই দলটাকে এগিয়ে রাখবো আমি। সক্রেটিস, জুনিয়র কিংবা জিকোরা যে দলে খেলেছেন, সেই সব দলের মতো একাধিক মহাতারকা হয়তো দলে নেই, কিন্তু তারুণ্যই এগিয়ে রাখবে দলটিকে। বিশ্বকাপের মতো আসরে স্ট্যামিনা সব সময়ই একটা বড় ব্যাপার। তাই এটা স্বাভাবিক, যে দলে তরুণ খেলোয়াড় যতো বেশি থাকবেন, তারা ততো এগিয়ে থাকবে। আর টুর্নামেন্টের অন্য যে কোন দলের চাইতে জমাট রক্ষণের অধিকারী ব্রাজিল। অধিনায়ক থিয়াগো সিলভাকে আমার এই সময়ের অন্যতম কঠিন মানসিকতার ফুটবলার বলে মনে হয়। এমন সব খেলোয়াড় দলে আছেন যদি দান্তে কিংবা আলভেজের মতো তারকা দল থেকে পড়েন তবুও অবাক হবার কিছু নেই। এই বিষয়টি ব্রাজিলকে বাড়তি কিছু সুবিধা দেবে। কারণ, বিশ্বকাপের মতো বড় দৈর্ঘ্যের টুর্নামেন্টে যে কেউ যে কোন সময় চোটের শিকার হতে পারেন এবং তার যথার্থ বিকল্প কোচের হাতে থাকলে সেটা বিশাল ইতিবাচক একটা ব্যাপার হিসাবে কাজ করবে দলের জন্য। ব্রাজিলে সেটা আছে এবং তাই আজকের ম্যাচে নিশ্চিতভাবেই এগিয়ে থাকবে তারা।
ক্রোয়েশিয়ার জন্য আরো বড় দুঃসংবাদ হচ্ছে দলের বায়ার্ন মিউনিখ স্ট্রাইকার মারিও মান্ডজুকিচ থাকছেন না দলে। নিষেধাজ্ঞার কারণে এই ম্যাচ মিস করতে যাওয়া মান্ডজুকিচের অনুপস্থিতিতে ক্রোয়েশিয়া হয়তো কিছুটা রক্ষণাত্মক খেলতে বাধ্য হতে পারে। তবে সব মিলে আমার মনে হয়, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ একটা ম্যাচ হতে যাচ্ছে এটা।
‘রেকর্ড চিরদিন থাকবে না’
বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলের মালিক তিনি। তবে, এই বিশ্বকাপ দিয়েই রোনালদোর সেই রেকর্ডটি ভেঙে দিতে পারেন জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসা। ক্লোসার গোল সংখ্যা ১৪। তবে ইন্টার ও এসি মিলানের সাবেক তারকা রোনালদো নিজের ব্যক্তিগত রেকর্ড নিয়ে মোটেই চিন্তিত নন। গেজেট্টা ডেলো স্পোর্টকে রোনালদো বলেন, ‘কেউ যদি আমার রেকর্ড ভাঙ্গে তবে পরবর্তীতে তার রেকর্ডও ভেঙ্গে যাবে। আমিও কারো রেকর্ড ভেঙ্গেছি এবং আমি মনে করি না সে রেকর্ড চিরদিন অক্ষুণ্ন থাকবে। ক্লোসা আমার রেকর্ড ভাঙ্গতে পারে। তবে জাতীয় দলের হয়ে আমি যা করেছি তা মুছে যাবে না।বার্সেলোনা ও রিয়াল মাদ্রিদের সাবেক এ তারকা এরপর ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো এবং লিওনেল মেসি বিতর্ক নিয়েও নিজের মত ব্যক্ত করেন, ‘সর্বকালের সেরাদের একজন হিসেবে বিবেচিত হতে হলে মেসিকে অবশ্যই এই বিশ্বকাপ শিরোপা জিততে হবে বিশ্বকাপ আপনাকে সত্যিকারের অমরত্ব দান করে।’
