দেয়াল : বির্মূতশিল্পের মুক্ত ক্যানভাস

আপডেট : ১২ জুন ২০১৪, ১৯:৫১
এ যেন রাতের বেলায় চুপচাপ এসে চিত্রশিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়া (১৯২৯-২০১১) কিংবা মার্ক রথকো (১৯০৩-১৯৭০) নিবির্বাদী দেয়ালে দেয়ালে পরাবাস্তবতা বা সুররিয়ালিজম, প্রকাশবাদ অথবা এক্সপ্রেশনিজমকে উপজীব্য করে রং, রেখায় নিরিক্ষাধর্মী চিত্রশৈলী করে যায়। বোধ ও মনন জানান দেয়, তাদের সাথে শিল্পী মুর্তজা বশীর (১৯৩২) থাকলেও থাকতে পারেন। ধ্যনমগ্নতায় খুঁজে ফিরলে দেয়ালগুলোকে মনে হয় তাঁদের চষা জমি। নিথর, প্রাণহীন দেয়াল নিরবচ্ছিন্ন শিল্পসাধনায় ব্রত সেই গুহাচিত্র থেকে। দেয়াল কি কেবলই নীরব আর মৌন সন্ত্রাসের চাঁদমারী? নাকি বিমূর্ত প্রকাশবাদ শিল্পশৈলীর স্বতন্ত্র ক্যানভাস কিংবা প্রকৃতির কর্ম নিপুণ খেয়ালের উদার জমিন? নিবিষ্ট মনে দেয়ালে দেয়ালে চোখ রাখলেই এক সৃজনী তত্পরতার অন্তর্লীন মনোভূমি হিসেবে ধরা দেয় শিল্পসন্ধানী প্রতিটি মানুষের কাছে। সেই খুঁজে পাওয়া মনোগ্রাহী রূপ একেক মানুষের কাছে একেক অনুবাদ। বিভিন্ন ভাষার মানসভূবনের দৃষ্টিনন্দন অবয়ব যেন অনুপম সৃষ্টি। নিষ্প্রাণ ও বিমূর্ত ছবির বর্ণিল দেয়াল ক্রমাগত বলে যায় শোভন কষ্টে এক বিষণ্নতার গল্প। এ সব মিলিয়ে তৈরি করে অসংখ্য কোলাজের কোলাহল। এ যেন রং ও তুলির অধ্যয়ন। কখনো দেখা যায় ঠাস বুনোটের গড়ন ও গতি কিংবা ধরা পড়ে রংয়ের বৈচিত্র্য। জমাটবদ্ধ, প্রতীকময়তার মনোগ্রাহী ছবির দেয়াল কেবলই বিমূর্তচিত্রের ক্যানভাস নয়, মুক্তিকামী মানুষের জাগ্রতস্বর, প্রতিবাদী ব্যানার। বের্টোল্ট ব্রেখটের (১৮৯৮-১৯৫৬) সেই বিখ্যাত ‘দেয়াল লিখন’ কবিতায় নাটকে বিশ্বজোড়া নিপীড়িত মানুষের হাতিয়ার। সাদামাটা চোখে শ্রীহীন, লাবণ্যহীন দেয়াল কর্দযময় রাস্তাকে সঙ্গী করে চলে আর কলকাতার রাস্তা থেকেই চিত্রশিল্পের রিয়ালিজমের জন্ম হয়েছে পঞ্চাশের মন্বন্তরে। সেই বাস্তবতার স্বায়ত্ত্বশাসন বদলে দিয়েছিল শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের (১৯১৪-১৯৭৬) কাজ। বদলে যাওয়া এই বিশ্বায়নের যুগে এক অদৃশ্য দেয়াল ক্রমশই বদলে দিচ্ছে শিল্পভাষা এবং শিল্পাদর্শ। সেই গুহাচিত্র থেকে সমকালীন বিশ্বের দেয়ালে ধরা পড়ে বিচিত্র ধরনের সরস টেক্সচার যেন কোনো কুশলী শিল্পীর নির্মিত পরিপ্রেক্ষিত। দেয়ালের কোনো সীমারেখা নেই। নেই কোনো কাঁটাতারের বেড়া, এ এক আন্তর্জাতিকতায় বিস্তৃত, সীমানাহীন ভাষা। অপরিচ্ছন্ন, জীর্ণ দেয়াল যেন স্বাতন্ত্র্য এক আধুনিক বিমূর্ত শিল্পের চিত্রধারা। সাধারণ চোখে দেয়ালের দিকে তাকালে ভেসে ওঠে নানা শিল্পকর্ম। নোনা ধরে আসে যে দেয়ালে তা নোনা ধরা নিরাসক্ত জীবনের বির্মূত প্রকাশ মনে হয়। কোনো অফিসের নিরাপত্তাকর্মীর চেয়ারের হাতলের ঘষায় দেয়াল হয়ে উঠে এক অপূর্ব চিত্রশৈলী। যার দিকে তাকালেই বোধ-অনুভূতি-ভাবনায় উত্সারিত হয় শিল্পের এক উবর্র ভূমি। সেই সব খণ্ডচিত্রকে শিল্পে রূপান্তর করে, ক্যামেরার কম্পোজিশনে বিনির্মাণ করা হয় দেয়ালচিত্রের ভাষা।