সাহিত্যবিশ্বের সাহিত্যচর্চার ইতিহাসটা বেশ চমকপ্রদ। ঐতিহাসিকভাবে লক্ষ করলে দেখা যাবে, ষোল শতকেই সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক সাহিত্য পরিসরের সৃষ্টি হয়, অর্থাত্ সাহিত্য আন্তর্জাতিকভাবে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। সময়টা ছিল এমন যে ইউরোপের দেশগুলো তখন বেশ কাছাকাছি চলে এসেছে। একটা দেশের সঙ্গে আরেকটা দেশের সাংস্কৃতিক বিমিশ্রণ ঘটছে। ভাবুকতার বৈভবে পারস্পরিকভাবে সমৃদ্ধ হচ্ছে বিভিন্ন দেশ। সেই শুরু। এরপর দিনে দিনে ঘটেছে এই সাহিত্যচর্চার প্রসারতা। লেখক ও ভাবুকদের মধ্যে বৌদ্ধিক চর্চা এবং তর্ক-বিতর্ক দেখা দিলে সাহিত্যের প্রতি পাঠকদের আগ্রহ তৈরি হতে থাকে। কিন্তু লেখকদের মধ্যে কে কাকে কিভাবে ছাড়িয়ে যাবেন, শুরু হয়ে যায় সেই প্রতিযোগিতা।
প্রতিদ্বন্দ্বিতাটা প্রথম দেখা দেয় জাতিগত স্তরে। এই সময়ে ইউরোপে প্রথম রাষ্ট্রগঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়। সাহিত্যচর্চার সঙ্গে এই রাষ্ট্রগঠনের সম্পর্ক ছিল নিবিড়। কোন দেশের লেখকেরা সাহিত্যের ওপর কর্তৃত্ব করবে, স্বীকৃতি কারা দেবে, এই নিয়ে জাতিগত দ্বন্দ্বের বিষয়টি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। আগে এই দ্বন্দ্বটি সীমাবদ্ধ ছিল আঞ্চলিক স্তরে, যা কখনই তেমন তীব্রতা পায়নি। কিন্তু রাষ্ট্র সৃষ্টির পর থেকে সাহিত্য সাধারণ রণক্ষেত্রে রূপ নিয়েছে। লাতিন ঐতিহ্য নিয়ে রেনেসাঁসের দ্বারা উদ্দীপ্ত ইতালি প্রথম স্বীকৃত আন্তর্জাতিক সাহিত্যশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। এরপর মধ্য-ষোলশতকে আবির্ভাব ঘটেছে ফ্রান্সের। ফ্রান্স চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে লাতিন আধিপত্যের বিরুদ্ধে। বৈশ্বিক হয়ে-ওঠা ইতালির সাহিত্য-শিল্পকে সরিয়ে দিয়ে ফ্রান্স উঠে এসেছে শীর্ষে। মঞ্চে এরপর আবির্ভাব ঘটেছে স্পেন ও ইংল্যান্ডের। ইউরোপের অন্য দেশগুলো স্পেন আর ইংল্যান্ডকেই অনুসরণ করেছে। শুরু হয়ে গেল সাহিত্যিক ঐতিহ্য, উত্কর্ষ আর শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই।
উনিশ শতকের মধ্য-ইউরোপে সূত্রপাত ঘটলো জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের। আরও চমকপ্রদ ঘটনা ঘটেছে দক্ষিণ আমেরিকা এবং লাতিন আমেরিকায়। নতুন ধারার সাহিত্যরীতির সূত্রপাত ঘটিয়ে আন্তর্জাতিক সাহিত্য পরিসরে আবির্ভাব ঘটলো এই বিপুল বিস্তৃত বৈচিত্র্যপূর্ণ মহাদেশের। সবশেষে বিউপনিবেশীকরণের প্রতিক্রিয়ায় আফ্রিকা, ভারতীয় উপমহাদেশ এবং এশিয়ার দেশগুলো সাহিত্যবিশ্বে প্রবেশাধিকারের দাবি জোড়ালো করে তুললো।
লক্ষণীয়, এই যে বৌদ্ধিকবিশ্ব, এর রয়েছে নিজস্ব গতিপ্রকৃতি যা অর্থনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই বৌদ্ধিকবিশ্ব নিজেই তৈরি করেছে উঁচু-নিচু অবস্থান, সংঘাতের নানা ক্ষেত্র, তৈরি করেছে নিজের ইতিহাস। এর সবই দীর্ঘকাল ধরে জাতীয় সাহিত্যের আড়ালে ঢাকা পড়ে ছিল। সাহিত্য এভাবেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। স্থানিক পরিসরের দিক থেকেও ‘রাজধানী’ আর ‘প্রান্তিক’—এই দুই পরিসরের মধ্যে সাহিত্য বিভাজিত হয়ে পড়ে। কেন্দ্র-প্রান্তের ধারণা এভাবেই সাহিত্যে প্রধান হয়ে উঠেছিল। দ্বন্দ্বটা ছিল এরকম : প্রান্ত কেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল, ফলে কেন্দ্রেরই প্রাধান্য। কেন্দ্র ও প্রান্তের মধ্যে এভাবেই নান্দনিক দূরত্বের সৃষ্টি হয়েছে।
কিন্তু বেশিদিন সাহিত্যবিশ্বের এই বিভাজিত অবস্থান অক্ষুণ্ন থাকেনি। প্রতিভাবান লেখকেরা কর্তৃত্ব নিয়ে সাহিত্যবিশ্বকে প্রভাবিত করতে শুরু করলেন। পাঠকদের কাছে লেখকের স্বীকৃতিও জুটলো তাদের। এভাবেই জাতীয় ভাবার্পণ থেকে মুক্ত হয়ে আবির্ভাব ঘটেছে অসংখ্য লেখকের আর এরাই তৈরি করে দিয়েছেন সাহিত্যের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বা মাপকাঠি। আন্তর্জাতিক সাহিত্যের বিষয়আশয় বা প্রকরণের সূচনা ঘটেছিল মূলত এভাবেই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এই সাহিত্য ছিল রাজনীতিমুক্ত সাহিত্য। রাজনীতি নয়, সাহিত্যকে সাহিত্য হিসেবেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন এই লেখকেরা। কিন্তু কী ধরনের সাহিত্য রচনা করেছিলেন তারা? এরকম একটা প্রশ্ন উঠতেই পারে।
উন্মুখর উদ্দীপ্ত এক পৃথিবী, বিশুদ্ধ সৃষ্টিশীলতার হাতছানি, সার্বিক স্বাধীনতা ও সমানাধিকারের আকাঙ্ক্ষা—এইসব মিলিয়েই লেখকেরা রচনা করতে চাইছিলেন নতুন ধরনের লেখা। সাহিত্য এভাবেই হয়ে উঠছিল বিশুদ্ধ, মুক্ত, সর্বজনীন। লেখকের সঙ্গে লেখকের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল তীব্র, কিন্তু এর সবটাই ছিল কে কত ভালো লিখতে পারেন, নতুন ধরনের লেখা লিখতে পারেন, তা-ই নিয়ে। অর্থনীতি, বিশেষ করে ‘অসম বিশ্ববাণিজ্য’ [ব্রোদেলের ভাষায়] ব্যবস্থা বইয়ের জগেক কতটা নিয়ন্ত্রিত বা প্রভাবিত করছে, এ নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা ছিল না। বই প্রকাশনার দিক থেকে কোনো দেশ পিছিয়ে থাকলেও, সেটা কখনও গুরুত্ব পায়নি। গুরুত্ব পেয়েছে নতুন ধরনের লেখা। আসলে বৌদ্ধিকবিশ্ব ছিল সাহিত্যের তুলনায় একেবারেই আলাদা। সাহিত্যকে যে শান্ত, নিস্তরঙ্গ, অপাপবিদ্ধ, বিকারহীন রচনা বলে মনে করা হতো, এই সময় থেকে তার অবসান ঘটতে থাকে। সৃষ্টিশীলতার ইতিহাস বলছে, সাহিত্য হচ্ছে দ্বন্দ্ব, সংগ্রাম ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইতিহাস। এ এক অনিঃশেষ প্রক্রিয়া—ইশতেহার, আন্দোলন, আক্রমণ আর দ্রোহই হচ্ছে সাহিত্যের আসল শক্তি। আধুনিক কালে সাহিত্যের ক্ষেত্রে এই যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার সূত্রপাত হলো, এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাই সাহিত্যবিশ্ব সৃষ্টি করেছে।
‘ভাবোদ্দীপ্ত অর্থনীতি’ আখ্যা দিয়ে পল ভ্যালেরি ‘বৌদ্ধিক বাণিজ্য’, অর্থাত্ সাহিত্যের ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। বাজারের ভাষাও তিনি ধার করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে লিখেছিলেন, ‘খেয়াল করে দেখ, আমি স্টক এক্সচেঞ্জের বোলচাল ধার করেছি। ব্যাপারটা তোমাদের কাছে বিস্ময়কর মনে হতে পারে—ভাবোদ্দীপনা হিসেবে কিভাবে একে ব্যবহার করবো; কিন্তু আমি মনে করি এর চেয়ে ভালো কিছু আর হয় না। কোনো সম্পর্ককে ব্যাখ্যা করতে হলে এ ছাড়া উপায় নেই—ভাবোদ্দীপ্ত অর্থনীতিই বল আর বস্তুবাদী অর্থনীতি, যখন তুমি শান্ত হয়ে ভাববে, ভালোমন্দের ফারাকটা বুঝতে হলে এভাবেই বুঝতে হবে।’ ওই একই রচনায়, যার শিরোনাম ছিল ‘লা লিবেরতে দে লেসপিরিত’ [ভাবোদ্দীপ্ত স্বাধীনতা, ১৯৩৯], তিনি আরও বলেছেন, আমি মনে করি ‘ভাবোদ্দীপনা’ বলে দামি একটা কিছু আছে, যেমন আছে তেল, গম, সোনা, এইসব। আমি জেনেশুনেই ভাবোদ্দীপনাকে মূল্যবান জিনিস বলে উল্লেখ করেছি, কারণ, এরও প্রশংসার প্রয়োজন হয়, বিচার-বিবেচনা করে দেখারও দরকার আছে। গাঁটের পয়সা খরচ করেই একে কিনতে হয়। কেউ এতে বিনিয়োগ করেন, কেউ করেন অনুসরণ, এর উত্থানপতনও লক্ষ করবার মতো। উদ্ধৃতযোগ্য বাণীর মধ্যেই সাধারণ মানুষের মনোভাব প্রতিফলিত হয়। এইসব উদ্ধৃতি, যা সংবাদপত্রের প্রতিটি পৃষ্ঠায় মুদ্রিত হয়, লক্ষ করলেই দেখা যাবে অন্যান্য আরও অনেক কিছুর সঙ্গে কিভাবে প্রতিযোগিতা করে চলেছে। দেখা যাচ্ছে যা কিছু দামি, তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা আছে। মূল্যবান এইসব জিনিস, যাদের দাম বাড়ে আর কমে, মহান এক মানবিক বাজার সৃষ্টি করে চলেছে।’
ভ্যালেরির এই আপ্তবাক্য, যার ব্যাখ্যা দিয়েছেন তিনি এইভাবে : ‘পুঁজিই সভ্যতার স্রষ্টা। শত শত বছর ধরে সভ্যতার বিকাশ ঘটে চলেছে, যেমন করে সৃষ্টি হচ্ছে অন্যান্য পুঁজির, যে-পুঁজি নিজের মধ্যেই মিশে গিয়ে তৈরি করছে মানবিক বাসনালোক।’ ভ্যালেরি মনে করতেন, ভাবোদ্দীপক রচনা হচ্ছে তাই একধরনের সম্পদ। প্রাকৃতিক সম্পদের মতো এই সম্পদ অর্জনেরও প্রয়োজন আছে। মানুষের মনে যা সৃষ্টি হয়, সেটাই হচ্ছে আসল পুঁজি।
ভ্যালেরির চিন্তনসূত্রকে যদি আমরা আরও সূক্ষ্মভাবে বিশেষ কোনো বৌদ্ধিকবিশ্বে প্রয়োগ করতে চাই, তাহলে লেখকদের মধ্যে যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকে, সেটা সহজেই বোঝা যাবে। লেখকের রচনা এভাবেই পণ্য হয়ে উঠেছে, আন্তর্জাতিক সাহিত্য পরিসরে তা জায়গা করে নিতে পেরেছে। সাহিত্য আসলে এমন একধরনের পণ্য যার চাহিদা ও সরবরাহ পাঠকদের কাছে সহজ হয়ে উঠতে থাকে। ভ্যালেরি পুঁজির এই রূপটাকেই বলেছেন ‘সংস্কৃতি’ বা ‘সভ্যতা’। এই সংস্কৃতি বা সভ্যতার স্রষ্টা হচ্ছে সাহিত্য। ভ্যালেরি বিশ্বাস করতেন, যে-কোনো পণ্যেরই ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা সম্ভব যা কিনা ওই ‘মহান মানব বিষয়ক বাজারে’ কেনা-বেচা হয়। সাংস্কৃতিক পৃথিবীর প্রেক্ষাপটে একইভাবে সাহিত্যেরও গুরুত্ব নির্ণিত হওয়া প্রয়োজন। সাহিত্যের এই স্বীকৃতি, সাধারণ বাণিজ্য ব্যবস্থার মধ্যে যখন স্থান করে নেয়, তখনই আমরা বৌদ্ধিক পরিসরে তার অস্তিত্ব অনুভব করতে পারি। সাহিত্যকে এর আগে কখনো এভাবে দেখা হয়নি। সারা পৃথিবী জুড়ে সাহিত্যচর্চার ভেতর দিয়ে আধুনিক কালে সাহিত্যবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছে। এই সাহিত্যকে বুঝতে হলে তাই বিশ্ববাজার ব্যবস্থা আর পাঠকের কাছে তা কতটা গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে, সেই প্রেক্ষাপটে বুঝতে হবে।
