নিজেদের মাঠে বিশ্বকাপ ফুটবল অথচ খেলা দেখতে মাঠে যেতে পারছেন না। অর্থের অভাব কিংবা টিকিট পাননি বলে নয়। যেতে পারছেন না শরীর অনুমতি দেয় না। বার্ধক্যে শরীর নতজানু। চামড়ায় ভাঁজ পড়ে গেছে। ভারী গ্লাসের চশমা চোখে। বাড়ির সামনে রেস্টুরেন্টে গিয়ে কফি খান ৮২ বছরের বৃদ্ধ জোসে গার্সীয়। আর ঘরে বসে এটা ওটা করে সময় কাটান ৭৯ বছরের বৃদ্ধা ইরেন নসিমন্তে। এই দুইজন ১৯৫০ বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল খেলা দেখেছেন। মারাকানার সেই দুঃসহ স্মৃতির সাক্ষী দুইজনে। আজও ভুলতে পারেননি ব্রাজিলীয়দের দিকে এগিয়ে থাকা ট্রফি উরুগুয়ে কিভাবে চোখের সামনে থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেলো। ইতিহাসের সাক্ষী হওয়ার জন্য ১৯৫০ সালের কিশোর গার্সিয়া আর কিশোরী ইরেন সাও পাওলো থেকে ছুটে গিয়েছিলেন রিওতে। সব মিলিয়ে ১ লাখ ২০ হাজার দর্শকের সাথে সেদিন তারাও ছিলেন মাঠে। হলুদ রংয়ের আগাম উত্সবে মেতে ছিল পুরো ব্রাজিল। কিন্তু কে জানতো কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সবকিছু ধুলোয় মিশে যাবে। স্টেডিয়ামমুখী উত্সবের মিছিল শোকের মিছিল হয়ে ঘরে ফিরবে। আনন্দ উত্সব কান্নায় পরিণত হবে।
গার্সিয়া বললেন, ‘আগাম উত্সবই আমাদের কাল হয়ে গিয়েছিল। ফাইনাল খেলার আগেই আমরা চ্যাম্পিয়নের উত্সব করেছিলাম সেদিন। পুরো ব্রাজিল জুড়ে আনন্দ উত্সব আর মিছিল। আর কিছুক্ষণ পরই আমরা ট্রফি হাতে পাবো। এমন চিন্তা ভাবনায় পুরো ব্রাজিল রাস্তায় নেমে উত্সব শুরু করে দিলো। মারাকানা স্টেডিয়াম এতো আধুনিক ছিল না। সিমেন্টের তৈরি গ্যালারিতে গিয়ে বসলাম। তখনও ম্যাচই শুরু হয়নি। পরে আমাদেরকে কাঁদতে হয়েছিল।’ গার্সিয়া বলছিলেন, আসলে আগাম উত্সব করাটা ঠিক হয়নি। এটা তো খেলা। না খেলে তো কেউ চ্যাম্পিয়ন হতে পারবে না। আমরা সে কথাটা ভুলেই গিয়েছিলাম।
ইরেন বললেন, তখন আমাদের দেশে জনসংখ্যা ছিল ৪০ মিলিয়ন। মেয়েরা ফুটবল খেলা দেখতে যেতো না। আমরা অনেক কষ্ট করে গিয়েছিলাম। আর সবই তো রেডিওতে খেলা শুনেছে। টিভি ছিল না। যে বাসায় রেডিও ছিল শোনার জন্য সবাই সেখানে ছুটে যেতো।’ ৪৫ বছর বয়সের ছেলে মার্কোস নসিমন্তে আর ১৮ বছর বয়সি পুক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী নাতনী ভিক্টোরিয়া নসিমন্তের সামনে বসে স্মৃতি হাতড়ে ইরেন বললেন সেই সময়ের নানা কথা। পর্তুগীজ ভাষাটা ইংরেজিতে রূপান্তর করে দিচ্ছিলেন নাতনী ভিক্টোরিয়া। ‘তখন মেয়েদের মধ্যে ফুটবল নিয়ে এতো উত্তেজনা ছিল না। আমার কাছে ফুটবল খেলাটা আলাদা কিছু মনে হতো। যে কারণে আমি খুব আগ্রহী ছিলাম খেলার প্রতি-বলছিলেন ইরেন। তিনি যখন ৫০ সালের স্মৃতির ঝাঁপিটা খুলে বসলেন তখন তার ছেলে এবং নাতনীও ইতিহাস শোনার আগ্রহে অপলক দৃষ্টিতে কথা শুনছিলেন। ইরেন বলেন, আমার বয়স তখন ১৫। আমরা সবাই খুবই উত্তেজিত ছিলাম। আমরা নিশ্চিন্ত ছিলাম চ্যাম্পিয়ন হবো। ফাইনালের আগেই ঘরে ঘরে উত্সব চলছিল। যখন চ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি আমাদের ছেলেরা। তখন আমরা ভীষণ দুঃখ পেয়েছিলাম। চার মাস আমরা শোকে কাটিয়েছিলাম। কেউ দুঃখ ভুলতে পারছিলাম না। বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না, ব্রাজিল ট্রফি পাইনি। অফিস আদালত, কাজ-কর্মে আমরা গুলি খাওয়া আহত বাঘের মতো চুপসে ছিলাম।’ চশমার গ্লাসটা নামিয়ে কাপড়ে ঘষতে ঘষতে ইরেন বলছিলেন, আমরা চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। ৫৮ বিশ্বকাপ ফুটবলে আমরা যখন চ্যাম্পিয়ন হলাম। তখন সবাই রাস্তায় নেমে গেলাম। সব কিছু সাজিয়ে ছিলাম। বুঝলাম আমাদের ছেলেরা পারে।’
গার্সিয়া আরো ভয়ংকর তথ্য দিয়ে বললেন, হ্যাঁ আমরা চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের সেই রাগ ক্ষোভ এখনও মেটেনি।’ জানতে চাইলাম কোন রাগ। ভাষান্তর করে দেয়া প্রতিবেশী লুইস বললেন, বার্সেলোনা এবং রিয়েল মাদ্রিদের মধ্যে শত্রুতা রয়েছে। ওরা এক শহর আরেক শহরকে পছন্দ করে না। ঠিক তেমনি আমরাও সাও পাওলোবাসীরা রিওর লোকদের মেনে নেই না।’ কারণটা কী ? গার্সিয়া বলেন, ১৯৫০ বিশ্বকাপ ফুটবলে দুইজন ভালো ফুটবলার ক্লাউদিয়া এবং নরোয়ানাকে দলে নেননি কোচ ফ্লাবিয়া পেস্তা। ওই দুইজন দলে থাকলে আমরা ৬৪ বছর আগেই ঘরের মাঠে চ্যাম্পিয়ন হতাম। এটা নিয়ে ব্রাজিলের আক্ষেপ থাকতো না। শুনেছি কষ্ট সইতে না পেরে সে সময় অনেকে আবেগে জীবন বিসর্জন দিয়েছেন। এই কষ্ট এতো দূর আসতো না।’ কিন্তু ওই দুইজন ছাড়াই তো ব্রাজিল প্রতিটি ম্যাচে ভালো খেলে আসছিল। সুইডেন স্পেনের মতো দলকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছিল ! গার্সিয়ার জবাব, হ্যাঁ ভালো খেলেছিল। কিন্তু ওই দুইজন থাকলে ব্রাজিলকে শক্ত অবস্থানে রাখতে পারতো।’ গাসির্য়ার মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে লুসাই উদাহরণ দিয়ে বললেন, এখন যদি নেইমারকে বাদ দিয়ে দল নামান স্কোলারি। তাহলে কী হবে। সেদিন ওটাই হয়েছিল দুইজন ভালো খেলোয়াড়কে বাদ দিয়েছিলেন কোচ ফ্লাবিও পেস্তা।’ গার্সিয়া বলেন, ব্রাজিলের সেই কোচ ছিলেন রিওডি জেনেরিওর। আমাদের ওই দুই ফুটবলার ছিলেন সাও পাওলোর। এখানে আঞ্চলিকতা পছন্দ-অপছন্দের বিষয়টি কাজ করেছে। যে কারণে আমরা সাও পাওলোবাসীরা রিওদের পছন্দ করি না। ১৯৫০ বিশ্বকাপের স্বপ্ন ভেঙ্গেছে রিওর কোচের কারণে। যে ব্যথা আজও কষ্ট দেয় আমাদের।’ প্রশ্ন তুললাম এখনতো আবার ঘরের মাঠে খেলা হচ্ছে ৬৪ বছর পর। কেন স্টেডিয়ামে যাচ্ছে না ? আবেগতাড়িত কণ্ঠে দুইজনের একই সুর-সেই জ্বালা এখনও শুকায়নি, বলেই পর্তুগীজ ভাষায় বললেন, প্রাজের ইুম কোইনসেলো তামবেম (আপনার সাথে পরিচয় হওয়াতে খুশি হয়েছি)।
