সাও পাওলো থেকে রিওডি জেনেরিও প্রায় ৪৫০ পঞ্চাশ কিলোমিটার। রাত ১২টা ৫৩ মিনিটের বাস এক সেকেন্ড দেরি করেনি। নির্ধারিত সময়ের ১৫ মিনিট আগেই রিওতে পৌঁছে দিয়েছে বিশ্বকাপের দর্শকদের। একই সাথে বাংলাদেশের সাংবাদিকরাও পৌঁছে গেছেন। অন্যদের হোটেল আগেই ঠিক করা ছিল বলে যে যার মতো চলে গিয়েছিলেন। আর বাংলাদেশের সাংবাদিকরা হোটেল খুঁজতে বেরিয়ে পড়েন। কোথায়ও হোটেল ফাঁকা নেই। সাশ্রয়ী ভাড়ায় হোটেল খুুঁজতে চাইলেও ভাষা সমস্যার কারণে সেটা বুঝানো যায় না। পর্তুগীজ ছাড়া অন্য কোনো ভাষার কদর নেই ব্রাজিলে। সাও পাওলোর মতোই। একটা বললে আরেকটা বুঝে। একদিকে নিয়ে যেতে বললে আরেক দিকে নিয়ে যায়। পুরো ব্রাজিল জুড়েই এমন চিত্র। তারপরও ব্রাজিলের শহরগুলোতে অতিথির কমতি নেই। লোকাল বাসে এক ঘন্টার পথ কোবানাবানা বীচ। যাওয়ার সময় যতটুকু দৃষ্টি গেলো, আধুনিক শহরের যা কিছু থাকা প্রয়োজন সবই আছে এখানে। সাও পাওলোর চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে এই রিও শহর। বড় বড় রাস্তাগুলো সহজইে নজর কাড়ে। সুন্দর সুন্দর অট্টালিকাগুলোর দিকে তাকালে ভালো লাগে। পথে পথে খ্যাতনামা ব্যক্তিদের পাথরের মূর্তি বানিয়ে স্মরণীয় করে রাখা হয়েছে। চোখে পড়ল ঢাকার সোনারগাঁও হোটেলের সমান ফুটবলারদের জন্য একটি বিরাট একটি জিমনেসিয়াম। কাঁচের বাইরে থেকে দেখা গেলো ভেতরে আধুনিক সরঞ্জাম। আর কিছুক্ষণ পর পর দেখা গেলো ফুটবল খেলার মাঠ। রিও ডি জেনেরিও শহরটা পহাড়ে ঘেরা। চারদিকে আকাশ ছোঁয়া পাহাড়গুলো যেন রিওর এক একটা শো-পিস। মেঘ ধাক্কা খাচ্ছে পাহাড়ে। সাদা মেঘের ভেলাগুলো দরুণভাবে ভেসে বেড়াচ্ছে। এ পাহাড় থেকে আরেক পহাড়ের সৌন্দর্য্য উপভোগ করার জন্য আছে ক্যাবল কার। শহরের মাঝখান দিয়ে চলে গেছে স্বচ্ছ পানির লেক। শহরের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে সমুদ্র। পাহাড়ের নিচ দিয়ে সুড়ঙ্গ পথ সোজা চলে গেছে রিওর কোপাবানা সমুদ্র সৈকতের দিকে। কোপাবানার সমুদ্র সৈকত পৃথিবীর বিখ্যাত একটি জায়গা। এখানে পৃথিবীর দূর-দূরান্ত থেকে সমুদ্র বিলাসীরা আনন্দ করতে আসেন। অপার সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে আসেন। বীচে রৌদ্র স্নান করেন। আবার নীল পানিতে নেমে গা ভেজাচ্ছেন। নারী পুরুষ যে যার মতো নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। বাংলাদেশের কক্সবাজারে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমুদ্র সৈকত। অথচ কোনো যত্ন নেই। উন্নয়ন নেই। বিদেশি পর্যটক আকৃষ্ট করতে নেই কোনো উদ্যোগ। অথচ ব্রাজিলের রিওডি জেনেরিওর সমুদ্র সৈতক কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের চার ভাগের একভাগেরও কম। সামান্য একটু পাড় ঘিরে সৈকত। ঢেউয়ের গর্জন। জোয়ার ভাটা হচ্ছে। তাতেই এই সামান্য টুকু সম্পদকে আঁকড়ে ধরে গড়ে উঠেছে বাণিজ্যিক পরিবেশ। পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে কি নেই। সবই পাওয়া যায়, আনন্দ করতে আপনি যা চান। সুউচ্চ ভবনগুলো গা ঘেঁষে এক একেকটি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে হোটেলগুলো। আছে ৩০ তলা হোটেল। পর্যটকদের জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা। বীচে মাটির তলায় তৈরি করা হয়েছে বিশ্রাম কক্ষ। বীচে গিয়ে দেখা গেলো তরুণ-তরুণীরা বালুর উপর শুয়ে আছেন। শরীরের ভাঁজে ভাঁজে সূর্য্যের তাপ লাগাচ্ছেন। কেউ গল্পে ব্যস্ত। গোল্লাছুট খেলার মতো করে একজন আরেক জনকে নিয়ে ছুটছেন। পানির উপর ঝাপিয়ে পড়ছেন। যারা ধর্মভীরু তারা তরুণ-তরুণীর পরস্পরের খুনসুঁটির উপর সহজে চোখ রাখতে পারবেন না। আপনাকে চলতে হবে নিজের পায়ের দিকে চোখ ফেলে। ফুটবলের তীর্থ ভূমি ব্রাজিল। আর ফুটবল খেলা হবে না। বীচ ভরিবল হবে না, তাই কি হয়। সমুদ্র সৈকতে রয়েছে অগণিত গোলপোস্ট আর ভলিবল খেলার ব্যবস্থা। সারাক্ষণ খেলা চলছে। শত শত পর্যটক, কেউ নেইমার, আবার কেউ মেসির জার্সি গায়ে ফুটবল খেলছেন। দিনের বেলা কোপাকাবানার এলাকার বৈচিত্র্যময় সৌন্দর্য্য এক রকম আর রাতে বদলে যায় কোপাকাবানা। আলোঝলমলে হয়ে উঠে সমুদ্রের পাড়। আর সমুদ্রের বুকে ছড়িয়ে পড়া চাঁদের আলোয় ভেসে জাহাজগুলোকে আরো মনোমুগ্ধকর লাগে। পুরো পরিবেশ আরো জমজমাট হয়ে যায়। কোপাবানায় উত্সবের আমেজ যেন পরতে পরতে। প্রত্যেকটা হোটেলে ধুমধারাক্কা সঙ্গীতের সুরের মুর্চ্ছনা। সূর্য্য ডোবার সাথে সাথে বাড়তি অতিথিদের আগমন বেড়ে যায়। স্বল্প পোশাকের বাহারি ডিজাইন থমকে দেয় পথচারীদের।
কোপাবানার হোটেলগুলোতে জায়গাই নেই। এমনিতেই সামার ভ্যাকেশন। তার উপর বিশ্বকাপ ফুটবলের কারণে হোটেলে পর্যটকদের ভিড়। রুম ভাড়া সাতগুণ বেড়েছে। ৪ হাজার মার্কিন ডলার দিয়েও অনেকে রুম পেতে হিমশিম খাচ্ছেন। আর সেই সৈকতের কাছে সাশ্রয়ী দামে রুম পেতে গিয়ে বিড়ম্বনার মধ্যে পড়েছেন বাংলাদেশের সাংবাদিকরা। হোটেল না পেয়ে রাস্তায় বসে থাকলেন। দুইজন গেলেন হোটেল খুঁজতে। আর দুইজন বসে লাগেজ পাহার দিলেন। কারণ কখন চুরি হয়ে যায় তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। টিভি চ্যানেলের রিপোর্টার রেজওয়ান উজ জামান রাজিব উদ্বোধনী ম্যাচের পর ট্রেনে ফেরার সময় পেছনে ঘাড়ে রাখা ব্যাগ থেকে চেন খুলে ল্যাপটপ নিয়ে গেছে। ব্রাজিলীয়দের মতে, এটি সাধারণ ঘটনা। ‘সাবধানে থাকুন। যে কোন সময় চুরি, ছিনতাই হতে পারে-ব্রাজিলীনরাই বলছেন। এই ভয়ে রিওতে পৌঁছে লাগেজ নিয়ে রাস্তায় আতংকের মধ্যে ছিলেন সাংবাদিকরা। হোটেল না পেয়ে হতাশায় থাকা সাংবাদিকদের জন্য সুসংবাদ আনলেন পথে ঘোরা এক ব্রাজিলীয়ান মহিলা। পৌঢ় এই মহিলা পথে ঘুরে ঘুরে অতিথি খুঁজে নিজের ঘর ভাড়া দেন। ব্যস তার সাথেই সাবাই চলে গেলেন। আলোচনা ফাইনাল। সবাই ওই ভদ্র মহিলার বাসার একটি রুমে উঠে পড়লো। টিভি, ফ্রিজ, মাইক্রোওভেন, রান্না করার জন্য চুলা, সোফা চেয়ার, তোয়ালে, কাপড় ইস্ত্রি করার ব্যবস্থা, প্লেট-গ্লাস, চাকু, চামিচ যা লাগবে সবই আছে। এখানেই আপাতত জায়গা হলো বাংলাদেশি চার সাংবাদিকের। কারণ হোটেলের চড়া দামের সাথে পাল্লা দেয়া সম্ভব না। কোপাকাবানার বাসিন্দারা অর্থ কামাই করার জন্য নিজেদের বাড়িঘরও ভাড়া দিয়ে দিচ্ছেন। কারণ বিশ্বকাপ ফুটবলকে ঘিরে এটাই তো টুপাইস কামানোর সুযোগ।
