মারাকানা, ফুটবল দুনিয়ার নতুন ছবি

আপডেট : ১৫ জুন ২০১৪, ২০:১১
বিশ্ব ফুটবলে ব্রাজিলের মারাকানা স্টেডিয়াম এমন একটি জায়গা যেটি পুরো ফুটবল দুনিয়ার কাছে আদরণীয় স্থান। ফুটবলের তীর্থভূমি ব্রাজিল। আর মারাকানা হচ্ছে ব্রাজিলের উত্কৃষ্ট এক স্থান। এখানে না আসা মানেই হচ্ছে ফুটবল দর্শকদের জন্য সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা মনে করেন ফুটবলপ্রিয়রা। স্টেডিয়ামকে ঘিরে রিওর এই এলাকাটি যেন ফুটবল স্বর্গ। স্টেডিয়ামকে ঘিরে গড়ে উঠেছে নানা আকর্ষণীয় উচ্চ ভবন। এখানে একটি ফ্ল্যাটের মূল্য অনেক বেশি। জমির দাম অনেক বেশি। ধনী লোক না হলে মারকানা স্টেডিয়ামকে ঘিরে বসবাস করা কঠিন। মারাকানাটা হচ্ছে ক্রীড়া কমপ্লেক্স। স্টেডিয়ামের পাশে আরো একটি ছোট মারাকানা স্টেডিয়াম রয়েছে যেখানে ভলিবল, বাস্কেটবলসহ অন্যান্য খেলা হয়। এটি যেন ঢাকার বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের চেয়েও বড়। যারা খেলাধুলা করে শরীরটাকে সুস্থ রাখতে চান তারা মারাকানা স্টেডিয়ামের ফুটপাত দিয়ে না দৌড়ালে মনে করেন কিছুই করিনি। দুপুরবেলাও মানুষজন জগিং করেন। রিও ডি জেনেরিওর পুরো শহরটাই সবুজে ভরা। তারপরও মারাকানার পাশ দিয়ে না দৌড়ালে অপূর্ণতা থেকে যাবে, এমন বিশ্বাস এখানকার মানুষদের। যারা বিদেশি, খেলা দেখতে এসেছেন, তারা তো আর স্টেডিয়ামের ভেতরে দৌড়াতে পারবেন না। তাই কাপড় খুলে ব্যাগে রেখে চারদিকে একটা চক্কর দেয়ার স্মৃতি বুকে তুলে নিলেন। আর ছবি না তুললে কি চলে । ১৯৫০ সালে মারাকানা স্টেডিয়ামের যে চিত্র ছিল তা অনেকটাই উধাও হয়ে গেছে। এখন এই স্টেডিয়ামটি রঙে রঙে সেজে উঠেছে। তবে যতই রঙ লাগুক না কেন এখানেই ব্রাজিলীয়দের কান্না শুকিয়ে আছে। ১৯৫০ সালে বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনালের এই মাঠেই নিশ্চিত চ্যাম্পিয়ন হতে যাওয়া ব্রাজিলের স্বপ্ন টুকরো টুকরো করে দিয়েছিল উরুগুয়ে। ব্রাজিলীয়দের কাছে সেই দুঃখ হয়তো কোনোদিন মুছবে না। কিন্তু তারপর ১৩ জুলাইয়ের ফাইনালে জিতলে কাটা ঘায়ে বরফ পড়বে। সেই স্বপ্নের জাল বুনে স্টেডিয়ামটিকে নতুনভাবে সাজিয়ে বিশ্ব ফুটবলের কাছে তুলে ধরেছে ব্রাজিল। কষ্টের স্মৃতি যেমন আছে তেমনি সুখস্মৃতিও আছে। এই মাঠেই ফুটবল কিংবদন্তী পেলে ক্যারিয়ারের হাজারতম গোলটি করেছিলেন। ১২ জুন বিশ্বকাপ শুরু হয়ে গেলেও স্টেডিয়ামটি নিয়ে আলাদা সংবাদ সম্মেলেন করে মারাকানার গুণগান গাইলেন আয়োজকরা। ৭৮ হাজার দর্শক খেলা দেখতে পারবে একসাথে বসে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আসা সাংবাদিকের সামনে স্টেডিয়াম নিয়ে নানা আঙ্গিকে গুণগান গাইলেন তারা। আয়োজক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন ১৯৫০ সালের পর আবার এখানে বিশ্বকাপ ফুটবল অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ফুটবল দুনিয়া জানে এটি অনেক স্মরণীয় একটি স্টেডিয়াম। কী কষ্ট আজও লুকিয়ে রেখেছে তারা। যে কারণে ১২ ভেন্যুর মধ্যে সবার আগে প্রস্তুত করা হয়েছে এটিকে। আগের চাইতেও আধুনিক করা হয়েছে। স্টেডিয়ামের ভেতরে চারটা বড় পর্দায় খেলা দেখার ব্যবস্থা আছে। ২৩০টা ওয়াশ রুমের মধ্যে হাজারখানেক টয়লেট, ৬০টা বার এবং ক্যাফেটেরিয়া, বিশ্বকাপের ম্যাচের জন্য ৩৬০টি এলসিডি টেলিভিশন, আড়াই হাজার সাউন্ড সিস্টেম, ৩৬০টি ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা। মারাকানায় ১৯৫০ বিশ্বকাপ ফুটবলের খেলা যারা দেখেছেন তারা সিমেন্টে বানানো গ্যালারিতে বসেছিলেন। এখনকার দর্শক বসবেন আধুনিক চেয়ারে। বৃৃষ্টি আসলে মাথার উপর ছাদ ঢেকে যাবে। আট মিনিট লাগবে পুরো মাঠ ঢেকে যেতে। জমে থাকা ছাদের পানি ব্যবহার করার জন্য আধুনিক পদ্ধতিতে সংরক্ষণ ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই স্টেডিয়ামের বিদ্যুত্ খরচও বেশি না। সৌর বিদ্যুত্ ব্যবহার করা হবে। স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে আসা দর্শকরা যেসব প্লাষ্টিকের জিনিসপত্র ব্যবহার করে ফেলে যাবেন, তার পরিমাণ হবে ৯ টন। অর্থাত্ স্টেডিয়ামে জমাকৃত বর্জ্য থেকে পণ্য তৈরি করে সেটা বিক্রি করা হবে। তার জন্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি হয়েছে। সে আয় দিয়ে দরিদ্রদের জন্য ফুটবল কার্যক্রমের উদ্যোগ নেয়া হবে বলে আয়োজকরা এখানে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন। মারাকানায় আর্জেন্টিনা বসনিয়ার লড়াইয়ের আগে ২৬১টি ম্যাচ হয়েছে। আগের স্টেডিয়ামটির কিছু অংশ রেখে নতুনভাবে নির্মাণ করা মারাকানা স্টেডিয়াম ফুটবল দুনিয়ার নতুন ছবি হিসাবে নিজেকে উপস্থিত করেছে। ৬৪ বছর পর আবার এই মাঠে বিশ্বকাপ ফুটবল ম্যাচ হয়ে গেলো। যারা মারাকানায় খেলা দেখলেন তারা নতুন স্মৃতি নিয়ে ঘরে ফিরলেন। আর যদি ব্রাজিল ফাইনালে উঠে, ট্রফি জয় করে, স্বপ্ন পূরণ হবে। নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হবে। না হলে পূর্বসূরীদের মতো নতুন প্রজন্মের মনের আঙ্গিনায় ১৯৫০ বিশ্বকাপ ফুটবলের সেই দুঃখ ব্রাজিলকে পোড়াবে। ফুটবল দুনিয়ায় মারাকানা নতুন ছবি হবে নাকি পুরোনোই থেকে যাবে। অপেক্ষা করতে হবে আরো কিছুদিন।