স্ট্যাডিও ডি মারাকানা বা মারাকানা স্টেডিয়াম — এক ফুটবল তীর্থ। নামটি শুনলে প্রথমেই চোখে ভেসে উঠবে পেলে কিংবা গারিঞ্চা বল নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন আর গ্যালারীতে বাজছে উচ্ছ্বাসমাখা সাম্বা নাচের বাজনা। আধুনিককালে পেলে-গারিঞ্চাদের জায়গা নিয়েছেন রোনালদো-নেইমাররা।
কিন্তু এ কি? এবার যে সেই জায়গা দখল করে নিলেন চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার আদরের ছেলে মেসি। সাথে তাই গ্যালারীতেও জোয়ার উঠলো আর্জেন্টাইন সমর্থকদের। মারাকানার রং হয়ে উঠলো ‘আকাশী-সাদা’!
বসনিয়া-হার্জেগোভিনার বিরুদ্ধে ম্যাচের আগের রাতে রিওর কোপাকাবানা এলাকায় সারারাত আনন্দ করে বেড়িয়েছেন আর্জেন্টাইনরা। তারা জানতেন বসনিয়া কিছুই করতে পারবে না। আনন্দ-উল্লাস করে সমুদ্রের ঢেউয়ের গর্জন থামিয়ে দিয়েছেন। একটা হোটেলেও মানুষ ঘুমাতে পারেনি। আর্জেন্টাইনরা গভীর রাত পর্যন্ত বীচে উল্লাস করেছেন। আর্জেন্টিনা, আর্জেন্টিনা বলে আওয়াজ তুলেছেন। আর বিয়ারে চুমুক দিয়েছেন। লাখ লাখ বিয়ার বিক্রি হয়েছে এক রাতেই। আর্জেন্টিনার ম্যাচকে উপলক্ষ করে কোপাকোবানার হোটেলগুলোতে রুম ভাড়া শুনলে আঁতকে উঠবেন সবাই। যে রুমটি অন্যান্য সময় ৫০ ডলার, সেটি বিশ্বকাপ উপলক্ষে হয়েছে ২০০ ডলার। আর অতিরিক্ত অথিতির চাপে রুম ভাড়া বেড়ে গিয়ে কোথাও কোথাও তিন হাজার ডলার সমপরিমাণ ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা ভাড়া হয়েছে। তারপরও রুম খালি ছিল না। কেউ কেউ গাড়িতে রাত কাটিয়েছেন। সকালের সূর্য উঠার পর দল বেঁধে মারাকানার পথে এগিয়েছেন। খেলা শুরু হওয়ার ৮ ঘন্টা আগে মারাকানা স্টেডিয়ামের সামনে আর্জেন্টাইনরা জমতে শুরু করে। সময়ের সাথে সাথে মারাকানার আশে পাশে ফুটপাতের উপর, বাড়ির গেটের সামনে হাজার হাজার সমর্থকদের অবস্থান। ফাস্ট ফুডের দোকানে বসার জায়গা ছিল না। খাবার বিক্রিও করে দম নিতে পারছিলেন না দোকানীরা। এই সব দেখে ফুটবলের উত্তেজনাটা টের পাওয়া যায়। এদের নিরাপত্তার জন্য স্টেডিয়ামের চার দিকের অলিগলির পথসহ সব সড়ক বন্ধ করে দেয় পুলিশ। এতো নিরাপত্তার পরও আর্জেন্টিনা বসনিয়ার ম্যাচের আগে স্টেডিয়ামের রাস্তায় নিজেদের মধ্যে মারামারি লেগে গিয়েছিল। পরক্ষণেই আবার দুই গ্রুপ মিলে যায় বলে রক্ষা। একটা সময় মোহামেডান আবাহনীর ফুটবল ম্যাচের আগে দর্শকদের কথা বিবেচনা করে স্টেডিয়াম এলাকায় যেভাবে নিরাপত্তা বেষ্টনি দেয়া হতো। ঠিক সেকরম আর্জেন্টাইনদের আনন্দে যেন সমস্যা না হয় সেদিকটা বিবেচনা করে বিকালের আগেই মারাকানার চার দিকের পথ বন্ধ করে দেয়া হয়। দুপুরের পর রাস্তায় দুই একটা সেনা সদস্যদের গাড়ি চলতেও দেখা গেছে। যেসব শহরে খেলা হবে। ম্যাচের দিন সেই শহরে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। আর্জেন্টিনা বসনিয়ার ম্যাচের ৬৬ হাজার টিকিট আগেই বিক্রি হয়ে ছিল। বাকি যেটা ছিল তা সাধারণ সমর্থকরা কিনতে পারেননি। তার পরও আর্জেন্টিনার সমর্থকরা রিও ডি জেনিরোর ফ্যানফেস্টে খেলা দেখেছেন। প্রত্যেকটা স্টেডিয়ামের বাইরে ফ্যানফেস্টের ব্যবস্থা রয়েছে। আর কোপাকোবানা বীচের দুই ধারে ফ্যানফেস্টের যে ব্যবস্থা রাখা হয়েছে তাতে মাঠে খেলা দেখার মতোই অনেকটা। বড় পর্দায় খেলা দেখার জন্য হাজার সমর্থক এসেছেন আর্জেন্টিনা থেকে। আর্জেন্টাইন দর্শক রডরিগো বললেন, আমার দেশের খেলা আর আমরা আসবো না তা কি করে হয়। নাতির হাত ধরে ব্রাজিল বিশ্বকাপটা স্মরণীয় করে রাখতে এসেছেন ৭০ বছরের বৃদ্ধ হেকটর। এই বয়সেও দারুণ চাঞ্চল্য নিয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছেন। নাচ গান করলেন এই বুড়ো। তাকে দেখে অন্যরাও মজা করলেন।
