মাত্রই বৃষ্টি থেমেছে। আকাশ ভরা মেঘ, স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া; একেবারে খাঁটি ফাস্ট বোলিং কন্ডিশন বলতে যা বোঝায়।
কন্ডিশনের পুরো ফায়দা নিয়ে বাংলাদেশি পেসাররা রীতিমতো ত্রাস তৈরি করে বল করছেন। ঠিক এই সময়ে মুখভরা চওড়া হাসি নিয়ে টেলিভিশনে কথা বলছিলেন বাংলাদেশের বোলিং কোচ হিথ স্ট্রিক। বার বার বলছিলেন, এই ম্যাচটা তাকে বাংলাদেশি পেসারদের সম্পর্কে সেরা ধারণা দিচ্ছে। হিথ স্ট্রিকের কথা চলা অবস্থায়ই আবার গগনবিদারী চিত্কার শোনা গেল গ্যালারিতে। স্ট্রিক একগাল হেসে বললেন—দ্য বয়! দ্য বয় ইস মেকিং হিস্টরি!
হ্যাঁ, এক অর্থে ইতিহাসই তৈরি করে ফেললেন গতকালই ওয়ানডে অভিষেক হওয়া তরুণ পেসার তাসকিন আহমেদ।
ক্যারিয়ারের প্রথম ম্যাচেই দেশের পক্ষে তৃতীয় সেরা বোলিং করে ফেললেন। সর্বকালের বিচারে দেশের তৃতীয় সেরা বোলিং এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বিচারে অভিষেকে পঞ্চম সেরা বোলিং ফিগারের মালিক এখন বাংলাদেশি তরুণ ‘সেনসেশন’ তাসকিন। ৮ ওভার বল করে ২৮ রান দিয়ে ৫ উইকেট তুলে নিয়ে তাসকিন বুঝিয়ে দিলেন, ক্রিকেটটা তিনি জয় করতেই এসেছেন।
তাসকিন আসছেন—এটা গত বছর দুয়েক ধরে বাংলাদেশের ক্রিকেটে খুব চেনা একটা খবর। একটু যারা ক্রিকেটের খোঁজ-খবর রাখেন, তারা খুব ভালো করে জানেন একটি কিশোর পেসার আসছে বাংলাদেশের পেস বোলারদের খরা ঘোচাতে। অবশেষে গত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ছোট দৈর্ঘ্যের অভিষেকও হয়ে গেছে তার। কিন্তু যে হইচই ছিল তাকে নিয়ে, সেটা ঠিক মাঠে প্রমাণিত হয়নি।
অবশেষে সেই প্রমাণের কাজটা করলেন গতকাল। সকালে খালেদ মাহমুদ সুজন পরিয়ে দিলেন ওয়ানডে ক্যাপ। আর উপলক্ষটাকে রঙিন করে রাখলেন তাসকিন।
গতকাল অত্যন্ত বিরলভাবে কন্ডিশন দেখেই চার চারজন পেসার মাঠে নামিয়েছিল বাংলাদেশ। তিন থেকে চারজন স্পিনারে অভ্যস্ত বাংলাদেশ একাদশে গতকাল একমাত্র স্পিনার ছিলেন সাকিব আল হাসান। তিনিও আক্রমণে এলেন ইনিংসের ২২তম ওভারে!
ম্যাচ ছিল ৪১ ওভারে। এর মধ্যে ভারত ২৫.৩ ওভারেই অলআউট হয়ে গেল। এই সময়ে সাকিব মাত্র ২.৩ ওভার বল করলেন। বাকি ২৩ ওভারই করলেন ৪ পেসার। এই পেসাররাই তুলে নিলেন ৮টি উইকেট; বাকি দুটির একটি রানআউট, একটি সাকিবের শিকার। কার্যত ৮ উইকেট নিলেন ৩ পেসার—তাসকিন, মাশরাফি ও আল আমিন।
পেসারদের এই স্বর্গীয় দিন দেখে স্বভাবতই যারপরনাই খুশি নতুন পেস বোলিং কোচ হিথ স্ট্রিক। তিনি নিজের ঘাড়ে একটু কৃতিত্ব না নিয়ে বললেন, ‘বৃষ্টির ফলে দিনটা আদর্শ পেস বোলিং কন্ডিশন হয়ে গেছে। আমি তো এদের নিয়ে খুব একটা কাজ করার সুযোগ পাইনি। তবে আজ দারুণ একটা ব্যাপার হল, বিশ্বকাপ সামনে রেখে খাঁটি পেস বোলিং কন্ডিশনে এরা কী করবে, সে ধারণাটা পাওয়া গেল।’
অবশ্য স্ট্রিকের কথার সিংহভাগ জুড়ে রইলো তাসকিনের প্রশংসা। তিনি অম্লানবদনে বললেন, বাংলাদেশের পেস বোলিং শুধু নয়, বোলিংয়েরই ভবিষ্যত্ হওয়ার কথা এই তাসকিনের, ‘ছেলেটার শরীর দেখেছেন? একেবারে খাঁটি ফাস্ট বোলারের শরীর। গতি আছে, ন্যাচারাল সুইং আছে, দারুণ অ্যাকশন, বয়স কম। সব মিলিয়ে আমি বলবো, ও সামনের দিকে বাংলাদেশের বোলিংকে নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্যতা রাখে। স্রেফ নিজেকে ধরে রাখতে হবে। আমি ওকে নিয়ে খুব আশাবাদী।’
সেই সঙ্গে স্ট্রিকের ধারণা এমন একটা শুরু তাসকিনের একটা দীর্ঘ ও সুন্দর ক্যারিয়ার এনে দেবে, ‘এমন একটা শুরু যে কোনো খেলোয়াড়ের জন্য অসাধারণ ব্যাপার। এই পারফরম্যান্স ওকে সামনের দিনে পেস বোলিং করার জন্য দারুণ অনুপ্রেরণা দেবে। আশাকরি, সে এই পারফরম্যান্স ছাড়িয়ে যাবে।’
আমরাও সেই আশায় রইলাম।
