সতেরো দশকের শেষদিকে সমুদ্রযাত্রী নাবিকদের মধ্যে একটা অদ্ভুত গল্প প্রচলিত ছিল। সমুদ্রের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত জুড়ে বছরের পর বছর নাকি একটি ভূতুড়ে জাহাজ ঘুরে বেড়াচ্ছে। শুধু ঘুরেই বেড়ায় জাহাজটি, কূল খুঁজে পায় না। সে জাহাজে কোনো নাবিক নেই, কোনো প্রাণ নেই; আছে শুধু মৃত নাবিকের আত্মা। সেই জাহাজের নাম—দ্য ফ্লাইং ডাচম্যান।
আজকের এই ইন্টারনেট, কম্পিউটারের জামানায় এই ভূতুড়ে জাহাজের অস্তিত্ব আর কে বিশ্বাস করে!
তবে ভূতুড়ে জাহাজ থাক না থাক, ‘ফ্লাইং ডাচম্যান’ কিন্তু আছে! হ্যা, বছরের পর বছর ধরে হল্যান্ডসের গণ্ডা গণ্ডা সফল মানুষের নামের আগে এই উপাধি বসেছে। কখনো পিটার হুগেনব্যান্ড, কখনো ফ্রাঙ্ক রাইকার্ডকে এই নামে ডাকা হয়েছে। সর্বশেষ আরেকজন ফ্লাইং ডাচম্যানের আবির্ভাব ঘটেছে এই চলতি বিশ্বকাপে। হ্যাঁ, নয়া ফ্লাইং ডাচম্যান রবিন ভ্যান পার্সি। স্পেনের বিপক্ষে উড়ন্ত এক হেড করে এই উপাধি পেয়ে গেছেন।
ভ্যান পার্সি শুধু উপাধি পেয়েছেন, তাই নয়। তার ওই ‘ফ্লাইং ডাচম্যান গোল’ এখন ইন্টারনেটে এক নয়া ‘সেনসেশন’ও বটে। ইতিমধ্যে শত শত ডাচ মাটিতে ভ্যান পার্সির ভঙ্গিতে শুয়ে ফেসবুক, টুইটারে নিজেদের ছবি পোস্ট করতে শুরু করেছেন। সবমিলিয়ে এবারের বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় তারকা ভ্যান পার্সি। আজ আরেকবার যখন মাঠে নামবেন পার্সি, দুনিয়ার নজর যে তার দিকে থাকবে তাতে সন্দেহ নেই। তবে আজ আরেকটা ওইরকম অবিশ্বাস্য গোল খোঁজা বা আবারও ৫ গোলের জয় নেদারল্যান্ডসের কাছে খোঁজাটা যে ঠিক হবে না, সেটা পার্সি নিজেই বলে দিয়েছেন। তিনি জানেন, মানুষ কী রকম মাতাল হয়ে গেছে ওই গোলের ফলে। তবে এটাও জানেন যে, এই উন্মাদনা একটা ম্যাচ হারলেই আবার মুহূর্তে মিলিয়ে যাবে, ‘আমি পাঁচ পাঁচটি মেজর টুর্নামেন্ট খেলেছি। আমি জানি, এই উন্মাদনা কিভাবে মিলিয়ে যায়। একবার ব্যর্থ হলেই সবাই এসব ভুলে যাবে। যেমন হঠাত্ করে ক্রেজটা তৈরি হয়েছে, হঠাত্ই মিলিয়ে যাবে। ফলে এই উন্মাদনা নিয়ে ভাবলে আমাদের চলবে না। আমরা ভালো একটা শুরু পেয়েছি। এটা ধরে রাখতে হবে। বিশ্বকাপ জিততে গেলে আমাদের আরও অনেক ম্যাচ জিততে হবে। কিন্তু রোজ এরকম বড় জয় বা এরকম গোল করা সম্ভব না।’
এটা ভ্যান পার্সি বিশ্বাস করেই বলেছেন, এমন গোল রোজ করা সম্ভব হয় না। তিনি নিজেই তার এই গোলে মুগ্ধ। শুধু মুগ্ধ বললে কম বলা হবে, নিজের ক্যারিয়ারে সেরা তো বটেই; এই গোলকে তিনি ইতিহাসের কাতারে দেখতে পাচ্ছেন, ‘এটা আমার ক্যারিয়ারের সেরা গোল। আমি নিজেই বলতে বাধ্য হচ্ছি, এটা অসাধারণ গোল, ঐতিহাসিক গোল। আমি নিজে আবার ভিডিওটা দেখেছি। এটা আমার ক্যারিয়ারের সেরা মুহূর্ত। আমি বলটাতে ঠিক মাথা ছোঁয়ানোর আগে দেখি ক্যাসিয়াস গোলবার কাভার করে দাঁড়িয়ে আছে। ফলে শুধু উড়ে এসে হেড করলে হয়নি, লব করতে হয়েছে। এটা অবিশ্বাস্য গোল।’এই অবিশ্বাস্য গোলে নিজের দেশে এবং সারাবিশ্বে কেমন উত্সব হয়েছে, কেমন উন্মাদনা হচ্ছে, সেটাও ভালোই জানেন এই ডাচম্যান, ‘বিশ্বকাপের শুরু হিসেবে এটা অসাধারণ। অনেক মানুষ খুব খুশি হয়েছে। আমি দেশের অনেক ছবি ও ফুটেজ দেখলাম। লোকজন খুব আনন্দ করছে। বলা যায়, উন্মাদনা তৈরি হয়েছে এই গোল নিয়ে। আমার জন্য এই অনুভূতিটাও অসাধারণ। আমরা এখানে আসার আগে মানুষের তেমন প্রত্যাশা ছিল না, এখন সেই প্রত্যাশাটা হঠাত্ চরমে চলে গেছে।’
তবে এতোশত প্রশংসার মধ্যেও বারবার নিজের পা মাটিতে রাখছেন পার্সি। বারবার নিজেদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন, তাদের অন্তত ভেসে গেলে চলবে না, ‘দেখুন, যতই দেখতে ভালো লাগুক, যত বড় ব্যবধানেই ম্যাচ জিতি না কেন; শেষ পর্যন্ত পয়েন্ট কিন্তু ওই তিনটেই পেয়েছি। পরের রাউন্ডে এই তিন পয়েন্ট নিয়ে যাওয়া যাবে না, বিশ্বকাপ অনেক দূরের ব্যাপার। তাই আমাদের কাজ এখন আরও ভালো খেলা, জিততে থাকা।’
