সেলুলয়েডে ফুটবল

আপডেট : ১৮ জুন ২০১৪, ১৯:৫৯
যারা খেলা ভালোবাসেন তাদের কাছে ফুটবল খেলা যেন অন্য এক আবেগের জায়গা। দীর্ঘ চার বছরের অপেক্ষা শেষে ফুটবলের তীর্থ ব্রাজিলে আবারও শুরু হয়েছে মানব গ্রহের সবচাইতে বড় আসর ফুটবল বিশ্বকাপ। ফুটবল উন্মাদনায় মেতে উঠেছে পৃথিবী। সেই শুরু থেকেই ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক জীবন তো বটেই ফুটবলের আবেগ ছুঁয়েছে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির নানা শাখায়। দর্শকপ্রিয় এই খেলা নিয়ে নির্মিত হয়েছে অনেক চলচ্চিত্র। সেসব চলচ্চিত্রেও উঠে এসেছে ফুটবল নিয়ে মানুষের আবেগ, উত্সাহ আর উন্মাদনা। লিখেছেন লিমন আহমেদ জাগো ‘জাগো’ একটি বাংলাদেশি ক্রীড়াভিত্তিক রোমাঞ্চকর চলচ্চিত্র। এখানে একদল মানুষের ফুটবল আবেগ ফুটে ওঠেছে পরিচালকের গভীর মমতায়। এটির লেখক ও পরিচালক খিজির হায়াত্ খান। আদনান করিম প্রযোজিত তরুণদের ফুটবল খেলা নিয়ে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি ২০১০ সালে মুক্তি পায়। দ্য মিরাকল অব বার্ন ১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপ জয়ী জার্মান দলকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে চলচ্চিত্রটি। পাশাপাশি দুটি গল্প রয়েছে এতে। প্রথম গল্পটি হলো ২য় বিশ্বযুদ্ধের কারণে এক কিশোরের বিভক্ত পরিবার। ১১ বছর পরে রাশিয়া থেকে পিতার প্রত্যাবর্তন, এমতাবস্থায় তার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবার চিত্রায়ন। দ্বিতীয় গল্পটি এক প্রতিবেদক ও তার স্ত্রীর। ছবিটি ১৯৫৫ সালে জার্মানে নির্মাণ করা হয়। দ্য কাপ ভুটানে নির্মিত এই ছবিতে দেখানো হয়েছে কিশোরদের ফুটবল প্রেম। ফ্রান্সে যখন ফুটবল বিশ্বকাপ খেলা হচ্ছে তখন দুইজন তিব্বতি উদ্বাস্তু ভারতের বৌদ্ধমঠের স্কুলে আসে। মঠের শান্ত-সৌম্য পরিবেশ ফুটবল জ্বরে আক্রান্ত। একদিকে লামা’র বুদ্ধের বাণী শিক্ষা, অন্যদিকে এই কিশোরদের ফুটবল প্রেম! নিকটবর্তী এক গ্রামে অনেক চেষ্টার পরেও যখন টিভিতে ফুটবল খেলা দেখবার সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় তখন তারা নিজেরাই মঠের জন্য টিভি’র আয়োজন করবার প্রস্তুতি নেয়! এগারো ১৯১১ সালের ২৯ জুলাই আইএফএ শিল্ডের ফাইনালে খালি পায়ে ফুটবল খেলে ব্রিটিশদের দল ইস্ট ইয়র্কশায়ারকে ২-১ গোলে হারিয়ে বাঙালিদের দল মোহনবাগান ক্লাব শিরোপা জয় করে। এই জয় বাঙালিদের স্বাধীনতার স্বপ্নকে উসকে দিয়েছিল। ঐতিহাসিক সেই কাহিনী নিয়ে অরুণ রায়ের পরিচালনায় নির্মিত হয় গুরুত্বপূর্ণ ছবি ‘এগারো’। ছবিটি তারকা শিল্পীর অভাবে তেমন বাণিজ্যিক সাফল্য না পেলেও ঐতিহাসিক দিক থেকে দুই বাংলাতেই ভালো সাড়া পেয়েছে। বেন্ড ইট লাইক বেকহাম ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ চলচ্চিত্রকার গুরিন্দার চাড্ডা পরিচালিত ‘বেন্ড ইট লাইক বেকহাম’ পুরোদস্তুর ফুটবলের সিনেমা। লন্ডনে বসবাসরত এক রক্ষণশীল পাঞ্জাবি শিখ পরিবারের ১৮ বছর বয়সী মেয়ে জাসমিন্দার ওরফে জেসের স্বপ্ন ফুটবল তারকা হওয়ার। ইংল্যান্ড দলের সাবেক ক্যাপ্টেন এবং ফ্রি-কিক পারদর্শী ডেভিড বেকহাম তার আদর্শ। সামাজিক সংস্কার ও পারিবারিক বাঁধা এড়িয়ে এই মেয়েটির স্থানীয় মহিলা ফুটবল দলের একজন খেলোয়াড় হয়ে ওঠা এবং শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক খ্যাতি পাওয়ার গল্প বলে এই সিনেমা। সেই সঙ্গে উঠে এসেছে যুক্তরাজ্যে ভারতীয় অভিবাসীদের সামাজিক অবস্থান ও দ্বৈত মানসিকতার বিষয়টি। প্রথমে ২০০২ সালে যুক্তরাজ্যে ইংরেজি ভাষায় মুক্তি পেলেও পরবর্তীতে বিভিন্ন ভাষায় সিনেমাটি ভাষান্তরিত হয়েছে। যে কথা বলতে চাই ফুটবল নিয়ে বাঙালির আবেগ বহু পুরোনো। বাংলাদেশে ঘরোয়া ফুটবলের সুদিন না থাকলেও ফুটবলের প্রতি বাঙালিদের উত্সাহ-উদ্দীপনা হারিয়ে যায়নি। সেটা বোঝা যায় বিশ্বকাপ ফুটবল দুয়ারে কড়া নাড়লে। সেই আশির দশকে যখন টেলিভিশনে বিশ্বকাপ ফুটবল সরাসরি সম্প্রচার হয়, তখন থেকেই বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ এই আসর ঘিরে উদ্বেলিত হয়ে ওঠে সারা দেশ। বিশ্বকাপের ফুটবল দলগুলোর পতাকা যে হারে উড়তে থাকে, তা সত্যিই অবিশ্বাস্য। গ্রামের একদম প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ভিনদেশি পতাকা স্থান করে নেয়। ইদানীং প্রিয় দলের কিংবা প্রিয় খেলোয়াড়ের জার্সির কদরও বেড়েছে। ফুটবলপ্রিয় বাঙালির এ স্বভাবই বলে দেয় কোনোদিন বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ঠাঁই পেলে কি মহাকাণ্ডটাই না হবে! কিন্তু পরিতাপের বিষয় দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় ফুটবলের গৌরব। ফুটবলের হারিয়ে যাওয়া দিন ফিরাতে চলচ্চিত্র হতে পারে উপযুক্ত একটি মাধ্যম। তাই ঢালিউডের নির্মাতা-প্রযোজকরা নজর দিতে পারেন ফুটবল নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণে। আয়োজনে বা সহায়তায় থাকতে পারে বাফুফে কিংবা সরকার। এতে দেশের মানুষের যেমন আগ্রহ বাড়বে দেশীয় ফুটবলে তেমনি সাফল্যের মুখ দেখবে চলচ্চিত্রশিল্পও।