ক্ষমা প্রার্থনাতেই দায় শেষ!

আপডেট : ১৮ জুন ২০১৪, ২১:৫৩
২০০৭ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের কাছে হেরে প্রথমপর্ব থেকে ছিটকে পড়লো ভারত। খেলোয়াড়দের বাড়ির সামনে শুরু হল বিক্ষোভ, মহেন্দ্র সিং ধোনির বাড়িতে আক্রমণ করা হল। এক ঝাঁক ভারতীয় ক্রিকেটার দেশে ফিরলেও অন্তত এক সপ্তাহ ধরে বাড়িতে ফিরতে পারলেন না। একই বিশ্বকাপে একই পরিণতি হল পাকিস্তানেরও। আয়ারল্যান্ডের কাছে হেরে তারাও বিদায় নিলো প্রথম রাউন্ড থেকে। পাকিস্তানের অধিকাংশ খেলোয়াড় দেশে ফেরার ঝুঁকি নিলেন না। যারা ফিরলেন করাচি বিমানবন্দরে তারা বেরই হতে পারলেন না। চলে গেলেন লাহোরে। সেখানেও দর্শকের হাতে প্লাকার্ড—নরকে ফিরে যাও, দেশে ফিরলে কেন! এটা ক্রিকেট নয়। আমরা কখনোই দর্শকের কাছ থেকে এই প্রতিক্রিয়া আশা করি না। সৌভাগ্যবশত দু একটি ব্যতিক্রম বাদ দিলে বাংলাদেশের দর্শকরা কখনোই ভারতীয় বা পাকিস্তানীদের মতো সহিংস হয়ে ওঠেননি। বরং জঘন্যতম হারের পরও এই দেশের মানুষই চোখের জল মুছে দু হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে—হারুক, জিতুক; দলটা তো আমাদেরই। কিন্তু ব্যাপারটা আর কতোকাল এমন একতরফা হয়ে থাকবে? কতোকাল ধরে আর দর্শকই শুধু উদারতা দেখাবেন! বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা পদে পদে কেলেঙ্কারি করতে থাকবেন, মাঠে একেবারেই দায়িত্বজ্ঞানহীন পারফরম্যান্স করে আসবেন, বোর্ড বা সিনিয়রদের কেউ জবাব চাইলে চটে যাবেন; তারপরও ক্ষমা চাইলেই সবাই ক্ষমা করে দেবেন? এতো সহজ ব্যাপারটা! মুশফিকুর রহিম হয়তো ‘সহজ’ই মনে করছেন। তার পূর্বসুরী সাকিব আল হাসান ৫৮ ও ৭৮ কেলেঙ্কারির পর ক্ষমা চেয়েছিলেন; মানুষ ক্ষমা করে দিয়েছিল। এই মুশফিকও হংকং কেলেঙ্কারির পর ‘স্যরি’ বললেন; সবাই সব ভুলে গেল। এই সহজ সরল পথ ধরে মুশফিক ভারতের এই দ্বিতীয় সারির দলের বিপক্ষে ৫৮ রানে অলআউট হয়ে ক্ষমা চাইলেন। ক্ষমা চাওয়ার ভাষাটা নাড়া দেওয়ার মতোই, ‘এর চেয়ে লজ্জাজনক কিছু আর জাতির জন্য হতে পারে না। অধিনায়ক হয়ে সবার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী আমি। ব্যাখ্যা দিলে অনেক কিছুই দেওয়া যায়। কিন্তু বাস্তবে কি হয়েছে সেটা আসলে সবাই দেখেছে। ১০৬ রান করা যে কোন উইকেটেই এটা চেজ করা সম্ভব। আমাদের ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতায় এটা সম্ভব হয়নি। ফলে আমি দলের হয়ে ক্ষমা চাচ্ছি।’ ১০৬ রানের লক্ষ্যে খেলতে নেমে একটা টেস্ট খেলুড়ে দেশ কেন ৪৭ রানে হেরে যাবে! শুধু ক্ষমা চাইলেই তো আর এই লজ্জা জাগানো পারফরম্যান্সের জবাব মেলে না। মুশফিক জবাব খুব একটা মুখে দিতে পারলেনও না। সবার বোঝা কথাটাই বলেছেন, ব্যাটসম্যানদের নিদারুণ ব্যর্থতাই কারণ, ‘এই উইকেটে খেলতে একটু কষ্ট করতে হয়। আমরা যারা ২ জন সেট ছিলাম আমাদের উচিত ছিল উইকেটে থাকা। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমরা পারিনি। আমাদের ৪-৫ জন ব্যাটসম্যান এমনভাবে আউট হয়েছে। প্রথম ইনিংস দেখে সবার মানসিকভাবে প্রস্তুতি নেওয়া উচিত ছিল। তাদের ভাবা উচিত ছিল ১০০ রান হলেও হার্ড এন্ড সোল্ড ট্রাই করা রানটা চেজ করার জন্য।’ এই সামান্য রানে অলআউট হওয়ার পেছনে টেকনিক্যাল ব্যর্থতা, উইকেট, বোলিং এসবকে দোষ দেওয়াটাও ক্রিকেটবোধের অভাব বলে বিবেচিত হতে পারে। মুশফিকও তাই সে পথে হাঁটেননি। তিনিও মেনে নিয়েছেন, সমস্যাটা মূলত দায়িত্ব বোধের অভাব, ‘এমন কঠিন অবস্থায় অনেক সময় আসলে বের হয়ে আসে। দায়িত্ববোধের সমস্যা হয়তো একটু আছে। সবাই চেষ্টা করছে হয়তো হচ্ছে না কোন কারণে আমার বোধগম্য নয়। বাইরে যারা আছে হয়তো অনেকে ভাল বুঝতে পারবে। আমাদের আরও একটি দিন সময় আছে, আমরা বের করার চেষ্টা করব আমাদের সমস্যাটা কোথায়। আমাদের সেকেন্ড টিম হলেও এর চেয়ে ভাল খেলত। এটা চিন্তা করলে খুব বেশি হতাশ লাগে।’ এই দায়িত্ব বোধের অভাব, কাদের, এটা চিহ্নিত করাও খুব কঠিন না। যে ম্যাচে দল ৫৮ রানে অলআউট হয়, সে দলের দোষ দিলে এগারো জনকেও দিতে হয়। তবে তামিম ইকবালের মতো যারা প্রতিনিয়ম এই কাজ করে যাচ্ছেন, তাদের চিহ্নিত করা খুব কঠিন না। তারপরও অবশ্য মুশফিক তামিমকে ঠিক বোঝা বলতে চাইছেন না, ‘বোঝা আমি বলব না। আমাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেটার ফর্মে নেই, যথাযথ পারফর্মও করতে পারছে না। এটাতো যে কোন দলের জন্যই মাইনাসপয়েন্ট। দলে কিন্তু ১০-১১ কন্টিবিউটর থাকে না; থাকে ৬-৭ জন। বাকিরা শুধু সহযোগিতা করে। যদি গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেটাররা রান না করে অবশ্যই দলে চাপ সৃষ্টি করে। তারাও অনেক চেষ্টা করছে; কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তারা ক্লিক করছে না। তামিমের পরিকল্পনা ছিল হয়তো আক্রমণাত্মক খেলবে। ওর উইকেটটা একটু বিচার করা উচিত ছিল।’