আকাশ ভরা সূর্য-তারা

আপডেট : ১৯ জুন ২০১৪, ১৯:৩২
গত ১৫ জুন চলে গেলেন দার্শনিক শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সরদার ফজলুল করিম। বিরলপ্রজ এই মহাপ্রাণের প্রয়াণে আমাদের গভীর শ্রদ্ধা রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানে বলেছেন— ‘আকাশভরা সূর্যতারা, বিশ্বভরা প্রাণ, তাহারি মাঝখানে আমি পেয়েছি মোর স্থান, বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান\’ একথা সদ্যপ্রয়াত সরদার ফজলুল করিমও বলতে পারতেন। বিশ্বভরা প্রাণে তিনি যে স্থান পেয়েছেন তা স্বভাবতই অনন্য। তাঁর জন্মের পর্বে বাঙালি মুসলমানমাত্রই ছিলেন কৃষক-সন্তান। তৃণমূলের এই মানুষেরা বিদ্যাচর্চা ও কর্মের সূত্রে নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছিলেন। খবির উদ্দিন সরদারের পুত্র যে সরদার ফজলুল করিম হলেন সেটা তাঁর জ্ঞানচর্চা ও পরিশীলনের একটা ফল বটে, কিন্তু শিকড় থেকে তিনি কখনো বিচ্যুত হতে চাননি ও পারেননি। পরীক্ষার ভালো ফলাফল ও বিদেশি বৃত্তিকে যে তিনি অগ্রাহ্য করতে পেরেছিলেন তাতে শিকড় ও শিকড়ের মানুষের প্রতি তাঁর দায়ই ছিল প্রধান। পার্টির নির্দেশ মেনে সাধারণ মানুষের সঙ্গে দীর্ঘদিন কাটানো এবং নিশ্চিন্ত নিরাপদ ও আরামদায়ক জীবন ছেড়ে উল্টো সাধারণ মানুষের কাছে শিক্ষা নেওয়ার যে বিরল দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছেন, তা-ই তাঁকে ‘সরদার’ করে তুলেছে। একারণে তাঁর জীবনটাই অর্জন, নিছক প্রাপ্তি নয়। জনগণের মধ্যে থাকার বাস্তবতা অথবা তার গর্ব অনেক সময় অনেককে ভ্রান্ত পথ নির্দেশ করে। এ প্রসঙ্গে অবিভক্ত বঙ্গে সুভাষ মুখোপাধ্যায় উল্লিখিত একটি ঘটনার কথা বলা যায়। পার্টির একজন কমরেড অন্য আরেকজন কমরেড সম্পর্কে জানান, তিনি জনগণের মধ্যে থেকে ভুল পথে চলে যাচ্ছেন। পার্টি থেকে তাঁকে বলা হয়েছিল, তিনি যেন বেশি পার্টি বুলি অথবা জার্গন না কপচান, যেন তাঁর সঙ্গে জনসাধারণের দূরত্ব সৃষ্টি না হয়, তারা যেন মনে না করেন, তিনি তাদের কেউ নন, তিনি একজন উপদেষ্টা অথবা মাতব্বর শ্রেণির মানুষ কিংবা অন্তত বহিরাগত এবং অনাত্মীয়। এই কথাটা আক্ষরিকভাবে বেশি মনে রাখতে গিয়ে তিনি জনসাধারণের সঙ্গে এতটাই একাত্ম হয়ে যান যে, ঘটনা ও পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করতে না পারা এমন একজন সাধারণ মানুষে পরিণত হন যে, বিস্মৃত হন তিনি কেন গ্রামে ও সাধারণ মানুষের মধ্যে এসেছিলেন। সৌভাগ্যবশত জনগণের মধ্যে দীর্ঘদিন কাটালেও সরদার ফজলুল করিমের ক্ষেত্রে তা ঘটেনি। উল্টো তিনি কখনো লক্ষ্যবিচ্যুত হননি। আমৃত্যু তিনি যে জ্ঞানচর্চা করেছেন এবং শারীরিক ও অন্যান্য প্রতিকূলতা সত্ত্বেও সক্রিয় থেকেছেন তা তাঁকে একই সঙ্গে স্বাভাবিক ও অনন্য করেছে। ধ্রুপদী জ্ঞানসাধনা করেও তিনি যে তরুণ শিক্ষার্থীদেরও প্রিয় হতে পেরেছেন তার কারণ, তিনি একইসঙ্গে ধ্রুপদী ও সমকালীন হতে ও থাকতে পেরেছেন। তিনি প্রায় নিয়মিত দিনপঞ্জি লিখতেন, কিন্তু সেগুলো নেহাতই ব্যক্তির তথ্য অথবা ঘটনাপঞ্জি ছিল না। একটি পর্যায়ে তিনি যে তাঁর লেখাগুলোতে দিনপঞ্জির অংশ তুলে দিতেন তাতে পাঠকরা ওইসব তথ্য ও ঘটনার সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পরিচয় পেত, তাদের মনে হতো, খুব আটপৌরে হয়েও তারাই এতে অংশ নিয়েছে। পাঠককে কুশীলব করে তোলার এবং সেক্ষেত্রে তাকে ভাবিয়ে তোলার যে অনন্য কাঠামো সরদার তাঁর ওই পর্বের লেখাগুলোতে অবলম্বন করতেন সেই শৈলী তাঁর বক্তব্যকে অনেকদূর হূদয়গ্রাহী, গ্রাহ্য ও পাঠকের বোধের কাছে নিয়ে যেত। দুই সমাজতন্ত্রের তথাকথিত পতনের পর্বে বাংলাদেশে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বের মধ্যেই যখন দোদুল্যমানতারই শুধু নয়, সুবিধাবাদের পরিচয় পর্যন্ত পাওয়া গিয়েছিল তখন স্বল্প কয়েকজন ঋজু ব্যক্তিত্বের মধ্যে সরদার ফজলুল করিম ছিলেন অন্যতম প্রধান। বলে ও লিখে তিনি তখন ভ্রান্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। অথচ তখন পার্টির সঙ্গে তাঁর যা সম্পর্ক এবং স্বয়ং পার্টি যা করছিল তাতে তিনি যদি এই ভূমিকা পালন না করতেন তাহলেও বলার কিছু ছিল না। এক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল সৃষ্টিশীল। চীনের ক্ষেত্রে লু স্যুন, সোভিয়েতের ক্ষেত্রে ম্যাক্সিম গোর্কি, এমনকি আমাদের ক্ষেত্রে নজরুল যে ভূমিকা পালন করেছিলেন সামাজিক ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল অনেকটা সেইরকম। পার্টির সদস্য কি সদস্য নন, সেটা তাঁর কাছে তখন মুখ্য বিষয় ছিল না, তিনি ভেবেছেন, ক্রান্তিকালীন এই সময়ে তাঁকে অবশ্যই প্রকৃত সত্য বলার ও বিবেকের নির্দেশ পালন করতে হবে এবং তিনি তা করেছেন। তাঁর জ্ঞানচর্চায় সরদার যে ধ্রুপদী দার্শনিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের সঙ্গে পরবর্তী আরও দুটি পর্বকে যোগ করেছিলেন তা সামাজিক দায়িত্ব পালনকেও তাত্পর্যপূর্ণ করে তুলেছিল। সক্রেটিস, প্ল্যাটো, এরিস্টটলের সঙ্গে ফরাসি বিপ্লবপূর্ব রুশোর ‘সোশাল কন্ট্রাক্ট’ এবং তারপরের মার্কসীয় দর্শন বোঝার ক্ষেত্রে ফ্রেডারিক এঙ্গেলসের ‘এ্যান্টি-ডুরিং’ অনুবাদের ক্ষেত্রে তিনি যে ধারাবাহিকতার পরিচয় দেন তাতে তাঁর অবদানও সক্রিয় ও সংহত হয়। বিশ্বাসে স্থিত থাকার এই ক্ষেত্রে কূপমণ্ডুকতার পরিবর্তে তিনি বৈজ্ঞানিক প্রত্যয়কেই মূল বিবেচ্য বলে মনে করেন। ফলে এক্ষেত্রে তাঁর কোনো দ্বিধা ও শৈথিল্যের পরিচয় পাওয়া যায়নি। তিন তাঁর কর্মজীবনের দুটি অংশ কেটেছে বাংলা একাডেমি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। একাডেমিতে তিনি সংস্কৃতি বিভাগের প্রধান হয়েছিলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক দিন পর্যন্ত অধ্যাপক হননি। তাতে অবশ্য কিছু এসে যায়নি। জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক লেকচারারের গণ্ডি অতিক্রম করতে না পেরে মুক্তিযুদ্ধোত্তরকালে একবারে জাতীয় অধ্যাপক হয়েছিলেন। ‘অধ্যাপক’ হতে না পারার এই ঘটনা নিয়ে তিনি যে ভাবেননি সেটাই সরদারের জীবন-বৈশিষ্ট্য। জনপ্রতিনিধিরা আস্থা অর্জনের কথা না ভাবলেও জাতির বিবেকদের সেকথা ভাবতে হয়। সেটা ভাবতে গিয়ে প্রথমেই ভাবতে হয় শিক্ষার্থীদের কথা। তিনি তা ভেবেছিলেন। ফলে সক্রেটিস যেমন মনে করতেন, এ লাইফ আনএক্সামিন্ড ইজ নট ওয়ার্থ লিভিং—জিজ্ঞাসাহীন জীবন প্রকৃত জীবন নয়, তেমনি সেই জীবনকেই খুঁজে বেড়িয়েছেন তিনি। এবং এক্ষেত্রে তাঁর প্রধান শর্ত ছিল, শিক্ষার্থীদের আস্থা অর্জন করা, তাদের সব প্রশ্নের জবাব দেওয়া। সেকারণে যেখানে তিনি চাকুরি করেছেন সেখানে তো বটেই, যে যে ক্ষেত্রে খণ্ডকালীন দায়িত্ব পালন করতেন কিংবা অনুরুদ্ধ হয়ে বক্তৃতা দিতেন, বয়স, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ইত্যাদি উপেক্ষা করেও তিনি সেখানে ছুটে যেতেন, যেন শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞাসার পথ কখনো রুদ্ধ না হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দফার কাজ থেকে তাঁকে পাকিস্তান সরকারের রোষানলে পড়ে সরে আসতে হয়। দ্বিতীয় দফায়, মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে তিনি তা চালিয়ে যেতে সক্ষম হন। বাংলা একাডেমিতে তিনি কয়েকটি সংকলন সম্পাদনা করেছেন, যাতে পাকিস্তান আমলের মনোভাব বুঝতে সুবিধা হয়। এসব সংকলন দেখে এখন অনেকের অস্বস্তি হতে পারে, কিন্তু একটু স্থির হয়ে দেখলে বুঝতে পারবে, এখানে যে দলিল রয়েছে তা নির্মোহ ও তথ্যগতভাবে আমাদের অতীতকে বুঝতে সাহায্য করবে। ১৯৭১-এ তিনি যে বাংলা একাডেমিতে ছিলেন, সেটি যেমন তাঁর ব্যক্তিজীবনের তেমনি জাতীয় জীবনেরও অংশ। সে সম্পর্কে নানা সময়ে তিনি নানা জায়গায় লিখেছেন। বিচ্ছিন্ন সেই লেখাগুলো যদি সংগ্রহ করে একটি বই করা যায় তাতে ব্যক্তিজীবনের নানা দিক যেমন তেমনি জাতীয় সংকটের পরিচয়ও স্পষ্ট হবে। প্রথম সূত্রের ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার এইসব লেখার অন্য মাত্রার সঙ্গে আলাদা গুরুত্বও রয়েছে। জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে তিনি যে আলাপচারিতা করেছেন তার কোনো কোনো অংশ নিয়ে তখনও বিতর্ক হয়েছিল। কিন্তু এখন সময়ের নির্মোহ দূরত্বে দাঁড়িয়ে এসব বিষয়ে পুনর্বিবেচনা করে দেখাও হয়তো প্রয়োজনীয় হতে পারে। ইতিহাস-সচেতন সরদার ফজলুল করিম অন্যের গুরুত্বপূর্ণ লেখার প্রশংসা করতেও জানতেন। মনে আছে, একবার বাংলা একাডেমির এক আলোচনা সভায় বদরুদ্দীন উমরের ‘পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তত্কালীন রাজনীতি’র অকুণ্ঠ প্রশংসা করে বলেছিলেন, কীভাবে এই গ্রন্থ জাতীয় জীবনের নির্মোহ ইতিহাস হয়ে উঠেছে। চার বাংলা একাডেমি অথবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে তাঁকে প্রায়ই হেঁটে অনেকদূর যেতে দেখা গেছে। সঙ্গে যাঁরা থাকতেন তাঁদের সঙ্গে হাঁটতে ও কথা বলতে তিনি পছন্দ করতেন। হেঁটে হেঁটে কথা বলাও ছিল তাঁর প্রিয় অভ্যাস। তখন বয়সটা কম ছিল, শরীরটাও ছিল নির্ভার। তাঁকে দেখে মনে হতো, এরকম জীবনই তিনি যাপন করতে চান। বিশ্বাসেও সেরকম থাকা, আমৃত্যু তাকে মেনে চলা সকলের পক্ষে সম্ভব হয় না। সরদার ফজলুল করিম তা পেরেছিলেন বলে মনে হয়। পাঁচ তাঁর সাহিত্যপ্রীতিও ছিল অর্জন ও ভালোবাসার। মশিউল আলম তাঁর উপন্যাসে সরদার ফজলুল করিমকে চরিত্র করে এবং তাঁকে নিয়ে উপন্যাস লিখে বুঝিয়ে দিয়েছেন, সাধারণ ও দৈনন্দিন জীবনও কত বৈচিত্র্যময়। সেখানে বেঁচে থাকা ও তা যাপন করাও কম বৈশিষ্ট্যপূর্ণ নয় এবং ব্যক্তির ব্যক্তি হয়ে ওঠাও মনুষ্যজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তিনি তাঁর দিনপঞ্জিতে অন্যান্য অনেক বিষয়ের সঙ্গে সাহিত্যের উল্লেখ করতেন। যেমন নাসরীন জাহানের ‘উড়ুক্কু’ উপন্যাস বিষয়ে তাঁর উল্লেখ ও মন্তব্য। সম্পূর্ণ জীবন বিষয়ে তাঁর এই ঔত্সুক্য ও আগ্রহ তাঁকে এক সবুজ বৃক্ষে পরিণত করেছে, তফাত এই, তিনি বৃক্ষের মতো অচল ও স্থানু ছিলেন না।