ইউনিভার্সিটিতে অনেক মেয়ের ভাগ্যে একটা ল্যাপটপ জোটার আগে একজন প্রেমিক জুটে যায়। ইন্টারনেটে আমাজন থেকে ভালো একটা লাভ স্টোরি ডাউনলোড করে পড়ে আনন্দ পাওয়ার আগেই মেয়েগুলো বাস্তব জীবনে লাভ স্টোরির দ্বিতীয় অধ্যায় ছুঁয়ে ফেলে। মিলির ক্লাসমেটদের মধ্যে অনেকে প্রেমিকের মোবাইল নম্বর, ফেসবুক আইডি সঙ্গে নিয়ে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে। মিলি একলা ব্যতিক্রম। সে তার জীবনে প্রেম নামের প্রোগ্রামটা কিছুতেই ইন্সটল করতে পারছে না।
মিলির ধারণা, প্রেমে পড়ার জন্য মানুষের মনে একগাদা কাঁচা আবেগ জমা থাকা দরকার। মন কাঁচা আবেগে ভেজা না হলে একবার কিংবা বারবার প্রেমে পড়া কঠিন। মিলির মনে আবেগ কম, কিন্তু প্রেমিক নামের একজন পুরুষ সঙ্গী জুটিয়ে ফেলার ভাবনা তার মাথার মধ্যে জ্যান্ত প্রাণ নিয়ে নেচে বেড়ায়।
সুমনের সঙ্গে মিলি ডিপার্টমেন্টের বারান্দায় দাঁড়িয়ে গল্প করে। সুমন তার দুই বছরের সিনিয়র। গল্প করতে ভালো লাগে বলে মিলি তার সঙ্গে গল্প করে। ব্যাপারটা প্রেমে পড়ার সঙ্গে লিংকড কিনা সে নিশ্চিত হতে পারে না। সে ভাবে, সুমন যদি প্রেমের পটভূমি গড়ার মতলবে লম্বা গল্প ফেঁদে থাকে তাহলে এতদিনে তার কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। সুমনের মনে বোধ হয় প্রেমঘটিত মতলব নেই। সম্ভবত, সে শুধু গল্প করতে আসে। প্রেম করার মতলব না থাকলে কেউ তার সাথে গল্প করতে পারবে না, মিলি সেটা মনে করে না। তবে সুমন যদি দিনের পর দিন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক স্টাইলে গল্প চালিয়ে যেতে চায় তাহলে মিলিকে সুমনের কাছ থেকে কেটে পড়তে হবে। ডিপার্টমেন্টের বারান্দায় দাঁড়িয়ে একটা ছেলের সঙ্গে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে ঘণ্টা কাবার করে দিলে অন্য ছেলেরা মিলির দিকে চোখ তুলে তাকাবে না। ভাববে, মিলি অকুপাইড। সেটা তার জন্য অহেতুক ক্ষতি।
একটা ছেলের সাথে কিছুদিন প্রেম চালিয়ে যাওয়ার পরে সম্পর্ক ভেঙে গেলে তার আলাদা একটা বাজারমূল্য আছে। ভেঙে যাওয়া প্রেম নিয়ে মোটা দাগে দীর্ঘশ্বাস ফেলা চলে, হলে পাশের রুমের মেয়েরা এসে বালিশের তলা হাতড়ে ঘুমের বড়ি খোঁজে। সব মিলিয়ে নাটকটা খারাপ না। সুমনের সঙ্গে অদূর কিংবা সুদূর ভবিষ্যতে তেমন কোনো নাটক আদৌ জন্ম নেবে বলে মিলির মনে হচ্ছে না। তার নিজের মনেও এমন একটা নাটকের দেখা পাওয়ার সাধ নেই। মিলির চিন্তা, তার শরীর এবং মন দুটোই খুব দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে। তিন বেলা ভালোমন্দ খেয়ে শরীর শুকানোর প্রোসেস রুখে দেওয়া যাবে। কিন্তু মনের তলায় সামান্য যা আবেগ জমা আছে সেটা পুরোপুরি শুকিয়ে উঠার আগে মিলিকে ঝুপ করে প্রেমে পড়তে হবে। তা না হলে তার জীবনে প্রেমের নাও চরে আটকে যাবে।
মিলির মাথায় আরেকটা চিন্তা আছে যেটা সে এখনো কাউকে বলেনি। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে যদি দশ হাজার মেয়ের প্রেমিক জুটে থাকে তাহলে দশ হাজার মেয়েরই প্রেম পর্ব শেষে বিয়ে এবং সংসার পাতার পরিকল্পনা আছে। ইউনিভার্সিটির কয়েক হাজার জুটির মধ্যে মিলি ব্যতিক্রম। সে প্রেম করবে, কিন্তু প্রেমিককে বিয়ে করবে না। শুধু প্রেমিককে নয়, কাউকেই সে বিয়ে করবে না। এতদিন বিয়ের ব্যাপারে তার মনের মধ্যে সামান্য দোনামোনা থাকলেও কাল রাতে সে তার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে।
বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে মিলির মন থেকে বড় একটা ভার নেমে গেছে। কাল রাতে এই সিদ্ধান্ত চূাড়ান্ত করলেও আসলে খুব ছোটবেলা থেকে সে বিয়ে না করার চিন্তার সঙ্গে জড়াজড়ি করে বেড়ে উঠেছে। সেই বিচারে সিদ্ধান্তটা নতুন কিছু নয়। মিলির শোবার রুমের সাথে মা-বাবার রুমের পার্টিশন দেয়ালটা খুব পাতলা। জন্মের পর থেকে প্রতি রাতে সে তার মা-বাবার ঝগড়া শুনেছে। মা-বাবার ঝগড়ার সংলাপগুলো বারবার শুনতে শুনতে তার মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু ঝগড়ার কারণ সে ধরতে পারতো না। দুজনের ঝগড়ার কারণ নিয়ে কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করতে মিলির ভয় হতো। মনে হতো, বাবা-মার ঝগড়ার মধ্যে নিষিদ্ধ কিছু লুকানো আছে। তার অবচেতন মন বলত, বড় হয়ে অনেক কিছু বুঝতে শিখলে মা-বাবার ঝগড়ার কারণ সে নিজে থেকে জানতে পারবে। সময়ে সেটাই ফলে গেছে। স্কুল পার হয়ে কলেজে ভর্তি হওয়ার পরে সে তার মা-বাবার ঝগড়ার কারণ পুরোপুরি বুঝে গেছে। বয়সের ধর্ম মেনে নিজের শরীর তাকে কিছু গোপন খবর জানিয়ে দিচ্ছিল। কলেজে কয়েক মাস ক্লাস করার পরে শরীরতত্ত্বের বাকি সুলুকসন্ধি ওদের ক্লাসের ম্যারিড মেয়েগুলো মিলিকে উদাম করে বুঝিয়ে দিল।
ক্লাসের ম্যারিড মেয়েগুলো অনভিজ্ঞ সহপাঠীদের প্রতিদিন শরীরের আদিম রহস্য ফিসফিস গল্পের তালে বুঝিয়ে দিত। মিলি ওদের আদিম গল্পের একনিষ্ঠ শ্রোতা। নিজের শরীরে সুড়সুড়ি জাগার লোভে সে আদিম গল্প শুনতে যেত না। তার মনের মধ্যে ভিন্ন রহস্যের গুমর ভেঙে নেয়ার তাগিদে মেয়েগুলোর কথা সে মন দিয়ে শুনত। মেয়েগুলোর দাম্পত্যের কাহিনি শুনে মিলির মনে পড়ে যেত, প্রতি রাতে তার বাবা কোন একটা অভিযোগ দাঁড় করিয়ে তার মায়ের সাথে ঝগড়া করতে চাইত। তার মা ডাইনির মতো খলখল শব্দ তুলে হেসে বাবাকে বলত, তোমার শরীরের যন্ত্রপাতি ঠিক থাকলে রাতের বেলা ঝগড়া করার ধান্ধা করতে না। তুমি সক্ষম পুরুষ হলে সকালবেলা ঝগড়া করতে। বিকাল গড়ালে তোমার মন থেকে ঝগড়ার রেশ কেটে যেত। আর সন্ধ্যা নামলে, হাহ্! তোমার মনে রোমান্সের হাওয়া বইত। গলায় শ্লেষ মেখে মা টেনে টেনে বলত, বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া করার সিডিউল দেখলেই পুরুষের যন্ত্রপাতির হাল টের পাওয়া যায়, বুঝলে। সক্ষম পুরুষ সকালের হাফে ঝগড়া করলে বিকালের হাফে গলাগলির ধান্ধায় ফেরে। অক্ষমের বেলায় ঘটনা উল্টা ঘটে। সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়লে নপুংশকের মুখ ভয়ে ঝুলে পড়ে। সত্যিকার পুরুষ যখন বউয়ের সঙ্গে লীলায় মাতে, নপুংশক তখন মনগড়া ঝগড়ার ফিকির খোঁজে। ভাবে, ঝগড়ার মোড়ক দিয়ে সে তার শরীরের গুমর ঢেকে রাখবে। মা খনখনে গলায় হেসে বলত, নিজেকে লুকিয়ে রাখার ছেঁদো চালাকি আর কত দেখাবে? মায়ের মুখে নপুংশক শুনে মিলির বাবা চন্ডালের মতো ক্ষেপে গোঁ গোঁ আওয়াজ করত। হাতের কাছে যা পেত তাই ছুড়ে মারত। কতবার ঘরের মধ্যে রক্তারক্তি হয়েছে তবুও কেন যেন প্রসঙ্গটা বারবার উঠত। দুজনে একই কথা ঘুরেফিরে বলতে থাকত।
সে সময় মিলির কাছে তার মা-বাবার ঝগড়া একটা রহস্যঘেরা ধাঁধার মতো মনে হতো। শরীরের কোন সামর্থ্যকে পুংশক বলে মিলি সেটা জানত না। কোন বৈশিষ্ট্যের অভাবে তার বাবাকে মা নপুংশক বলত সেটাও তার অজানা ছিল। প্রতি রাতে মায়ের তীক্ষ্ম শ্লেষমাখা সংলাপের মানে মিলি এখন জানে। কলেজে পড়ার সময় ওদের ক্লাসের হিনু মিলির মনের ধন্ধ ঘুচিয়ে দিয়েছিল। নতুন বিয়ে হওয়া মেয়ে হিনু তার স্বামীর সাথে যৌনক্রিয়ার এমন খোলামেলা বর্ণনা দিত যে কারো আর কোনো কিছু শেখার বাকি থাকত না। হিনু একঘেয়ে একই বর্ণনা প্রতিদিন কেন দিত সেটাও মিলি বুঝত না। মেয়েটার রাতের ঘটনা বর্ণনা করার আগ্রহ দেখে মিলির মনে হতো, হিনু ওর স্বামীর সঙ্গে কাজটি করে যত আনন্দ পায় তার চেয়ে বেশি আনন্দ পায় সেটি বর্ণনা করে। ছয় মাস ধরে একই কেচ্ছা শুনতে শুনতে মিলির মনে হয়েছিল, হিনুর কলেজে আসার সঙ্গে ওর লেখাপড়ার কোনো সম্পর্ক নেই। ও কলেজে আসত কারণ কলেজে গল্প বলার আসরটি ছিল তার যৌনজীবনের অংশ।
২
পরদিন ডিপার্টমেন্টের বারান্দায় মিলি একটা অদ্ভুত কাজ করে বসল। সাড়ে বারোটার ক্লাস শেষে সুমন মিলির পাশে এসে দাঁড়াতে সে সুমনের দিকে আবেগশূন্য চোখে চেয়ে বলে, ‘সুমন ভাই, আপনি কি আমার সঙ্গে প্রেম করবেন?’ সুমন ভ্যাবাচ্যাকা খায়। কপালে গেড়ো তুলে মিলির মুখের দিকে চেয়ে থাকে। হঠাত্ কপালের ভাঁজ ছেড়ে দিয়ে মজার হাসিতে মুখ উজ্জ্বল করে বলে, ‘প্রেমের প্রস্তাব এভাবে দিতে হয় না। প্রেমের তরিকা আলাদা। তোমার প্রপোজ করার ভঙ্গির সঙ্গে বিয়ে বিষয়টা মেলে ভালো। শোনো, আমি তোমাকে সোজা-সাপ্টা প্রপোজ করি, তুমি সোজা জবাব দেবে, বুঝেছ। ‘মিলি, তুমি কি আমাকে বিয়ে করবে?’ এবার মিলির চোখ বিস্ময়ে কপালে ওঠে। লম্বা শ্বাস টেনে সে বলে, ‘ওহ ডিয়ার, আপনি কি ইংলিশ ফিল্ম দ্বিতীয় অর্ধেক দেখেন। ইংলিশ ফিল্মের প্রথম অংশ প্রেমের জন্য বাঁধা। দ্বিতীয় পর্বে আসে বিয়ের প্রস্তাব। প্রেমের পর্ব মিস করার কারণে আপনি সরাসরি বিয়ের প্রস্তাবে চলে গেছেন। অসুবিধা নাই। ভুল হতেই পারে। এখন শুধরে নিয়ে বলেন, আমি তোমার সঙ্গে প্রেম করব। বিশ্বাস করো মিলি, আমি তোমাকে ভালোবাসি। দিস ইজ দ্য রাইট ওয়ে টু ডিল। বুঝেছেন?’
সুমন এবার সিরিয়াস চোখে সরাসরি মিলির দিকে চেয়ে বলে, ‘তোমার কি আর ক্লাস আছে? না থাকলে সোজা হলে চলে যাও। গোসল খাওয়া সেরে লম্বা ঘুম দিয়ে বিকেলে লাইব্রেরির সামনে চলে এসো। প্রেম করব নাকি বিয়ে করব সে ব্যাপারে তখন বিস্তারিত আলোচনা শেষে ধীরে সুস্থে সিদ্ধান্ত নিতে পারব।’
‘সিদ্ধান্ত মানে, কিসের সিদ্ধান্ত?’ মিলির চোখে খানিক জিজ্ঞাসা, খানিক বিস্ময়। সুমন সিরিয়াস গলায় বলে, ‘মিলি, আমি একটু পিউরিটান ধরনের মানুষ। তোমাকে আমার সত্যি ভালো লাগে। ভালো লাগার বিষয়টা আমি চেপে রেখেছি, কারণ ভবিষ্যতে আমি তোমাকে বিয়ে করব। বিয়ের জন্য তৈরি হতে আমার আরও দুই বছর সময় লাগবে। দুই বছর ধরে তোমার সঙ্গে প্রেম চালিয়ে গেলে আমি মনে হয় তোমার শরীরের দিকে ঝুঁকে পড়ব। শরীর নিয়ে মাতামাতি করতে গিয়ে তোমার প্রতি আগ্রহ হারাতে চাই না। আমি ঠিক করেছি, তোমাকে বিয়ে করে তোমার সঙ্গে আজীবন সংসার করব। এটাই আমার আমৃত্যু প্লান।’
‘আরে কী আশ্চর্য! আপনাকে বিয়ের প্রোগ্রাম ইন্সটল করতে বলেছে কে? বললাম না আমি আপনার সঙ্গে প্রেম করব। যতদিন আপনাকে ভালো লাগে ততদিন আপনার সঙ্গে থাকব। ভালো না লাগলে বলব খোদা হাফেজ, বা-ই-ই।’
‘আমার সঙ্গে থাকবে মানে, বিয়ে ছাড়াই আমার সঙ্গে শোবে? মানে লিভ টুগেদার?’
‘থাকব মানে আপনার সঙ্গে শোব, বসব, হাঁটব, মনে চাইলে দৌড়ানোও যেতে পারে। শরীরের পজিশন কোনো ব্যাপার না। আমরা দুজন আসলে মেড ফর ইচ আদার কিনা এটা যাচাই করার জন্য বিবাহপূর্ব নিবিড় ছাঁদের প্রেমের কোনো বিকল্প নেই। বুঝলেন?’
৩
পরদিন মিলি ক্লাস শেষে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। সুমন এসে তার পাশে দাঁড়াবে কি দাঁড়াবে না সেটা ওর মনে আসে না। মিলি নিজের চিন্তায় ডুবে আছে। চোখ তুলে সোজা তাকালে ইউক্যালিপটাস গাছের ফাঁক গলে অনেকখানি আকাশ চোখে পড়ছে। কিন্তু চোখ তুলে চেয়ে আকাশ দেখতে তার ভালো লাগছে না। বরং মাটির দিকে চোখ নামিয়ে সে নিজের বুকের ভেতর মা-বাবার ঝগড়ার কথাগুলো শুনতে পাচ্ছে। মিলির মনে হচ্ছে, বিয়ের কাবিন নামের জঘন্য একটি কাগজ তার মা-বাবার মতো দুটো ভালো মানুষের জীবন নষ্ট করে দিয়েছে। কাবিনের শর্তে আটকা পড়ে ছটফট না করে মানুষ দুটো নিজেদের মতো করে জীবনের দিকে চোখ ফেরাতে পারত। পরস্পরের শরীরের খবর জেনে যাওয়ার সাথে সাথে কাবিনের কাগজটা টান দিয়ে ছিঁড়ে ফেললে ওদের দুজনের কারো কোনো ক্ষতি ছিল না। জীবনের শুরুতে বিয়ে ভেঙে দিয়ে মিলির বাবা-মা আলাদা ঠিকানায় ভিন্ন পরিচয়ে নিজেদের মতো করে সুখী হতে পারত।
মা-বাবার নিরানন্দ কুিসত দাম্পত্যের জন্য মিলি তার মাকে দায়ী করে। তার মা সুস্থ সবল একজন মহিলা। তার একজন পুরুষ সঙ্গীর প্রয়োজন ছিল। জীবনের শুরুতে কাবিনের কাগজ ছিঁড়ে ফেলে সে তার যোগ্য সঙ্গী বেছে নিলে আর কোনো ঝক্কি থাকত না। মিলির বাবার জীবনে মেয়েমানুষের প্রয়োজন ছিল না। যৌনসুখ ছাড়া জীবনে সুখ পাওয়ার আর কোনো উত্স নেই, মিলি সেটা বিশ্বাস করে না। মিলি ভাবে, তার মা, বাবার সাথে লটকে ছিল বলেই বাবা নিজের শরীরের অক্ষমতা ঢাকার কাজে জীবনভর নিজেকে ব্যস্ত রেখেছে। বেচারা তার বুদ্ধিমেধার সবটুক বৌকে ভেল্কি দেখানোর কাজে ব্যয় করেছে। আহ্, অক্ষম বাবা, বউয়ের কাছে অক্ষমতার লজ্জা ঢাকতে গিয়ে সে টাকা খরচ করে নিজের জন্য লম্পট নাম কিনেছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিলি ভাবে, আহারে বেচারা! নিজের অক্ষমতা ঢাকার জন্য এত শ্রম ঘাম! অথচ এই অক্ষমতার জন্য সে নিজে দায়ী নয়। প্রকৃতির বঞ্চনা মেনে নিলে বাবার কষ্ট অনেক কমে যেত। একটু চেষ্টা করলে মানুষটা নিজেকে মেলে ধরার আনন্দ কামাই করতে পারত। আহ্! কী অপচয়। তুচ্ছ একটি কাবিনের দাবি মেটাতে গিয়ে দুটো মানুষের জীবন অপচয় হয়ে গেল। বাবা-মা দুজনের জীবনে ভালো কিছু পাওয়া হলো না।
হলে ফেরার জন্য সিঁড়ির দিকে পা বাড়িয়ে মিলি দেখে, সুমন এগিয়ে আসছে। সুমনের মুখের দিকে চেয়ে তার মায়া হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু মিলির মনে মায়া কিংবা বিদ্বেষ কোনো অনুভূতি জাগে না। সুমন ধীর পায়ে এগিয়ে এসে মিলির সামনে দাঁড়ায়। বলে, ‘শোনো মিলি, তোমার কথাগুলো আমি অনেক ভেবে দেখেছি। তোমার বাবাকে তোমার মা নপুংশক বললেও আসলে সে কি তা-ই?’ মিলির দিকে আঙুল তাক করে বলে, ‘তোমার বাবাই যে তোমার জন্ম দিয়েছে সে কথা কি তোমার মা কোনোদিন অস্বীকার করেছে?’
‘সুমন, তুমি এখনো মায়ের পেটে। একটি ব্যর্থ দাম্পত্য কত নিষ্ঠুর, কত নির্লজ্জ হতে পারে সে সম্পর্কে তোমার কোনো ধারণা নেই। না পাওয়ার ব্যর্থতায় জ্বলতে থাকা একজন স্ত্রীর বিপরীতে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়ানো অক্ষম স্বামীর ফাঁপা গর্জন শুনে আমি বড় হয়েছি। নারী-পুরুষের শরীরের সুখ-অসুখের গুমর আমি তোমার চেয়ে হাজার গুণ বেশি জানি।’
মিলির মারমুখি কথা শুনে সুমন থমকে দাঁড়ায়। এত দিনের চেনা মিলি তার চোখে অচেনা ঠেকে। মিলির সামনে নিজেকে ভীষণ বোকা মনে হয়। সুমনের দিকে মিলির কোনো মনোযোগ নেই। সে ফিরে এসে বারান্দার রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়ায়। শূন্য চোখে সুমনের দিকে চেয়ে বলে, ‘বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে আমি প্রতি রাতে একটি নিষ্ঠুর নাটক মঞ্চস্থ হতে দেখেছি। কষ্টে আমার ঘুম আসত না। বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদতাম। এক সময় ক্লান্ত হয়ে নিজেই নিজেকে গুটিয়ে নিলাম। কানে বালিশ চাপা দিয়ে শুয়ে নিজের মনের মঞ্চে দারুণ একটি নাটক সাজানোর খেলায় মেতে উঠলাম।’
মিলির চেহারায় প্রাণ ফিরে আসে। ভুরু নাচিয়ে বলে, ‘ছোটবেলায় তুমি রাক্ষসের রূপকথা শুনেছ, তাই না? রাজপুত্র কেমন করে দুষ্টু রাক্ষসীকে মেরে বন্দি রাজকন্যাকে উদ্ধার করেছিল তোমার মনে আছে?’ সুমন চোখে জিজ্ঞাসা নিয়ে মিলির মুখের দিকে চেয়ে থাকে। ‘শোন, রাজপুত্র যখন রাক্ষসীর প্রাণ ভোমরার কৌটা খুলে পয়লা একটা পা ছিঁড়ল তখন রাক্ষসী একটা পা হারিয়ে চিত্কার করে ছুটে এসেছিল। রাজপুত্র ভোমরার হাত-পা ছিঁড়ে তার মাথাটা ঘাড় থেকে টেনে আলগা করে নিতেই রাক্ষসী মরে খতম, তাই না? আমি ছোট বেলায় নিজেকে রাজপুত্র বলে কল্পনা করতাম। ভাবতাম, একরাতে মা-বাবা যখন ঝগড়ায় মেতে উঠবে, আমি চুপি চুপি ওঘরে যাব। তারপর ঝটকা মেরে আলমারি খুলে ওদের বিয়ের কাবিনটা হাতে নিয়ে নিষ্ঠুর আনন্দে ছিঁড়ে কুচি কুচি করে জানালা দিয়ে উড়িয়ে দেবো। মা-বাবার দাম্পত্য নামের রাক্ষসী সঙ্গে সঙ্গে মরে মুখ থুবড়ে আমার পায়ের কাছে পড়বে। মা-বাবা দুজন মুক্তির আনন্দে প্রাণ খুলে হেসে উঠবে। ওদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে আমিও হাসব। দেখ সুমন, বাবা-মাকে আমি মুক্ত করতে পারিনি। ওরা কাবিনের খাঁচায় বন্দি আছে, থাক। আমার জন্য আমি মুক্ত জীবন বেছে নিলাম।
