ঝুলবারান্দায় মেঘ
মোহীত উল আলম
প্রচ্ছদ :গোলাম কবির
প্রকাশক :একাডেমিক প্রেস এন্ড পাবলিশার্স লাইব্রেরি
প্রথম প্রকাশ :১৩ ডিসেম্বর, ২০১২
মূল্য :১৫০ টাকা
আধুনিকতাবাদীদের দৃষ্টিতে, ইংল্যান্ডের শিল্পবিপ্লবের পর এবং এনলাইটেনমেন্টের ফলে যুক্তিবাদী পৃথিবীতে বদলেছে সম্পর্কের ধরন-ধারণ। জৈবিক সংহতি (অর্গানিক সলিডারিটি) থেকে যান্ত্রিক সংহতিতে (মেকানিক্যাল সলিডারিটি) প্রবেশ করেছে মানুষ। যন্ত্রসভ্যতা আর পুঁজির বিকাশের ফলে ক্রমাগত সামষ্টিক চৈতন্য ভেঙে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যে পুষ্ট ‘একাকী’ মানুষ অস্তিত্বশীল হয়ে সারসত্তা (অ্যাসেন্স) গঠন করতে শুরু করেছে। দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা চলে, এককালে সুদূর আফ্রিকার জঙ্গলে ঝড়ে ঘর পড়ে গেলে দলবদ্ধ হয়ে আবার তা নির্মাণে এগিয়ে আসতো মানুষেরা। তাদের এই মিলেমিশে করি কাজের প্রবণতাকেই চিহ্নিত করা হয়েছে জৈবিক সংহতি নামে। আর আধুকিতাক্রান্ত পৃথিবীর পথে পথে যখন আর কেউ কারো জন্যে এগিয়ে আসছে না কিংবা আসার সময়-সুযোগ করতে পারছে না—এই লক্ষণের নাম যান্ত্রিক সংহতি। ইউরোপীয় সমাজ বাস্তবতায় এই সংহতির সুর উনিশ শতকে বেজে উঠলেও ভারতবর্ষে শোনা গেছে বিলম্বে। এর মূল কারণ, এখানে পুঁজির বিকাশ ও যুক্তিবাদের কালবিলম্ব। ফলে এক-দেড়শ বছর পর থেকেই আজকের একুশ শতকের দক্ষিণ এশিয়া কিংবা এই স্বাধীন বাংলাদেশে যান্ত্রিক সংহতির হাওয়া বিরাজ করছে। বিশেষ করে নগরজীবনে মানুষে মানুষে সম্পর্কের রূপটি অতীত আর ঐতিহ্যকে সমর্থন করছে না। তারা আবেগের ঐক্যের বদলে অনেক বেশি যুক্তিবশত বিচ্ছিন্নতায় গমনশীল।
এখানকার মানুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ঘটে যাওয়া এমনই একটি মৌল ও দৃশ্যমান প্রবণতাকে কাব্য করে তুলেছেন কবি মোহীত উল আলম। তাঁর চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ ‘ঝুলবারান্দায় মেঘ’ মূলত জৈবিক সংহতিমূলক সম্পর্কের নস্টালজিক ডিসকোর্স। নর-নারী, প্রেমিক-প্রেমিকা, স্বামী-স্ত্রী, মা-ছেলে, ভাই-বোন অথবা আত্মীয়-অনাত্মীয় মিলে যে বন্ধনসূত্র, তার বিনির্মাণের রূপটিও অন্যতম অন্বিষ্ট এই কাব্যগ্রন্থের। প্রকৃতির ছায়া সুনিবিড় পথে প্রেমের বয়ানে রোমান্টিক আবহে তৈরি কবিতার পঙিক্তমালায় সুগভীর অনুধ্যানে কবি প্রেমানুভূতিতে সিক্ত। সম্পর্কের নানামাত্রিক রূপ যেমন, সম্পর্কের সূচনা, সম্পর্কের পরিণতি, সম্পর্কের ভাঙন কিংবা জীবনে সম্পর্কের ফেলে যাওয়া দাগ—সবমিলিয়ে তুমুল সম্পর্কমুখর ব্যাখ্যান হাজির হয়েছে কবিতার পরতে পরতে। আবার কখনো কখনো সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে সম্পর্কে চিড় ধরায় যে শ্যামসমান মৃত্যু তার করুণ-কঠিন বক্ররূপটিও উপভোগযোগ্য।
এবার দেখা যাক, কাব্যগ্রন্থটিতে সম্পর্কের স্বরূপ—
যে মানুষটি পৃথিবীতে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত অবস্থান করে এবং অন্যান্য মরণশীল মানুষদের সঙ্গে তার সম্পর্ক হয়, কবি সেই ব্যক্তি মানুষটিকে পরিচিত করে তোলেন ‘ভুলতে পারি না’ কবিতায়।
কবি জানান, এই মানুষটির এই যে জীবন তা অর্থহীন যতক্ষণ না পর্যন্ত সে অন্যের ভেতরে প্রবেশ করে। অন্যের ভেতরে চলে গেলেই কি শান্তি! কবির কাছে প্রেমিক-প্রেমিকার সম্পর্কের রূপ কখনো কখনো অভিসার। প্রেমিক বা প্রেমিকা প্রিয় মানুষের চিঠির জন্য অপেক্ষারত। ঝুল-বারান্দায় একলা দাঁড়িয়ে, ওদিকে আকশে চাঁদ, দুদিকে দু’জন একা। বারান্দা নাগরিক জীবনে নিঃসঙ্গতা আর একাকীত্বের প্রতীক।
এই সম্পর্কের ভেতর দিয়েই কবি প্রবল রাজনীতি-সচেতন। ‘এ ভাবে ভালো থাকা, কী করব বল’ কবিতায় প্রাণপ্রিয় সন্তানের মৃত্যুর আশঙ্কার কথা বলতে বলতে কবি প্রবেশ করেন রাজনীতির ময়দানে। তিনি উচ্চারণ করেন—‘যদি হতশ্রী দেশকে ফেলে রাষ্ট্রনেতা যায় সুখের ভ্রমণে, যদি বন্দুকের গুলিতে রাজপথে মারা পড়ে সুশীল নাগরিক।’ এছাড়া এর পরিণামে অস্তিত্বহীন ব্যক্তি মানুষকেও কবিতায় তুলে ধরতে পিছপা হননি কবি। তিনি জানান, ‘আর তুমি যে ভয় পাচ্ছ ঝুলবারান্দায় দাঁড়িয়ে, যেন ব্যাঙের সর্দি সেটা।’
এ প্রসঙ্গে জ্যাঁ পল সার্ত্রের সেই মন্তব্য মনে পড়ে। তিনি বলেছিলেন, ‘ব্যক্তি স্বাধীন হয়েও পরাধীন, কারণ তার সামনে বিকল্প ফলাফলসহ হাজির থাকে না।’ এখানেও ঝুলবারান্দায় দাঁড়ানো ব্যক্তিটি হতবিহ্বল, সে কী সিদ্ধান্ত নেবে ভেবে পাচ্ছে না। মূলত, এই কারণেই ব্যক্তি মানুষটি অস্তিত্বহীনভাবে একা। তার সামনে ফলাফল সহ কোনো সম্ভাবনা হাজির না থাকায় সে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারছে না। ‘মা জেগে থাকেন ঠিকই’ কবিতায় ধরা আছে মা ও ছেলের চিরাচরিত বাঙালিয়ানার সম্পর্ক। কবিতার শুরুতে পাখির উপমা ব্যবহার করে মায়ের বর্তমান শারীরিক অবস্থার বর্ণনা দেন কবি। মা ও তাঁর সংসারের বিগত দিনের ভাবনা সামনে আনেন কবি। তারপর মা ছেলের বাড়ি ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকেন। মা ও ছেলের এই সম্পর্কের রূপটিও মূলত জৈবিক সংহতিমূলক। ‘নির্বিবাদ’ কবিতায় গদ্য ঢংয়ে কবি সম্পর্কের এমন একটি দুঃসহ সংবাদ দেন যাতে গা শিউরে ওঠে। যেমন—‘ভাবী রান্নাঘর থেকে বের হতে পারেন/ না। ভাইয়া ভাবীকে তলপেটে লাথি মেরেছে। তাঁর/ তিনবার গর্ভপাত হলো এ নিয়ে।’
তবুও সম্পর্ক তৈরির মূলসূত্র আছে। কর্তব্য করলেই অধিকার আপনা আসে। অধিকারের ধরনই ঠিক করে সম্পর্কের রূপ। এখনো পর্যন্ত সম্পর্ক বিষয়ে মোদ্দাকথা, সম্পর্ক একটা ক্ল্যাসিক দাসত্ব জেনেও মানুষ একে অন করে রাখে। এমনকি সম্পর্ক ভেঙে গেলে কেউ কেউ একে যাপন করে। নাগরিক একাকীত্বের ঘোরে ফেসবুকে বসে মানুষ ভাবে—‘আহা! পৃথিবীটা গ্লোবাল ভিলেজ।’ আর, আর তার একটা ঝুলবারান্দা আছে! পুরো কাব্যগ্রন্থে বার বার উচ্চারিত হয়েছে ‘ঝুলবারান্দা’ শব্দটি। কাব্যে এটি প্রতীক। কীসের? এটি নাগরিক একাকীত্বের প্রতীক।
আসলে, মানুষে-মানুষে সম্পর্কগুলোর একটা আদর্শ রূপরেখা হয়তো আছে, কিন্তু মানুষের মনের অন্তর্নিহিত লোভ, সীমাহীন আশা-আকাঙ্ক্ষা ও প্রভুত্ব করার বাসনা সেই সম্পর্কগুলোর বিবর্তন ঘটিয়েছে—ক্রমশ অস্বচ্ছ করেছে। অবশেষে দ্বিচারিতার মাধ্যমে অবিশ্বাস ও সন্দেহের কুয়াশায় আবৃত হয়ে তাদের মূল তাত্পর্য আর নেই। তারা দলে দলে ভাগ হয়ে যায় অথবা যাচ্ছে। তবুও মানুষ সম্পর্ক গড়তে চায়। এটা তার আদিম বাসনা। তা প্রাগৈতিহাসিক।
