পর্যটকদের জন্য এক কথায় থাইল্যান্ড হচ্ছে ‘স্বর্গরাজ্য’। পৃথিবীর খুব কম দেশেই এতো সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়। সবকিছুই সাজানো-গোছানো। অর্ডার দিলেই পাওয়া যায় কাঙ্ক্ষিত সেবা। ২০১৩ সালে পর্যটন থেকে সবচে’ বেশি আয় করা দেশগুলোর একটি হচ্ছে থাইল্যান্ড। প্রতিবছর গড়ে ৩০ মিলিয়ন বিদেশি পর্যটক আসে থাইল্যান্ডে, যা থেকে রাজস্ব আয় হয় ৪৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এ অবস্থায় চলতি বছরে পর্যটন রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৬৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। কিন্তু এখন সেটিকে বড় বেশি বলে মনে হচ্ছে। রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের কারণে দেশটি এখন অর্থনৈতিক সমস্যার মুখোমুখি। মালসামান গুছিয়ে পর্যটকরা ফিরে যেতে শুরু করেছে যার যার দেশে। রাত্রিতে কার্ফু থাকে বলে তারা সেখানে থাকার আর কোন মানে খুঁজে পাচ্ছে না। রাতের ব্যাংকক, পাতাইয়াই যে অনেক বেশি সুন্দর ও আনন্দময়।
মে মাসে সেনাবাহিনী ক্ষমতা গ্রহণের পর বলেছিল আইন-শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারে অভ্যুত্থানের কোন বিকল্প ছিল না এবং তাদের প্রধান লক্ষ্য স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। সে লক্ষ্যে আটক করা শুরু হয়েছে রাজনীতিবিদদের; বিধিনিষেধ জারীর করা হয়েছে মিডিয়ার উপর আর নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে আন্দোলন। লাল ও হলুদ শার্টধারীদের আন্দোলনে বহির্বিশ্বে ইমেজ ক্ষুণ্ন হচ্ছিল দেশটির। যেসব রাস্তায় জনপ্রিয় শপিং মল ও বারগুলো অবস্থিত, সেগুলোয় কিছুদিন আগেও বিদেশি পর্যটক গিজগিজ করতো; কিন্তু এখন সেগুলো প্রায় ফাঁকা থাকে। একটু পরপরই সেনাবাহিনী টহল দেয়। তবে এক উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পর্যটন শিল্পকে রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপই গ্রহণ করা হবে। বিশ্লেষকদের ধারণা, সামরিক অভ্যুত্থানের কারণে পর্যটন শিল্পের উপর যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে তা অব্যাহত থাকলে খুব শিগগিরই কমপক্ষে দশ লাখ লোক বেকার হয়ে পড়বে।
রাত দশটার পর বাইরে বেরোনো যাবে না, এ অবস্থাটাকে কিছুতেই মেনে নিতে পারে না পর্যটকরা। অবস্থা বেগতিক দেখে পাঁচতারা হোটেলগুলো পর্যন্ত কক্ষ ভাড়া ও খাবারের দাম প্রায় অর্ধেক কমিয়ে দিয়েছে। অভ্যুত্থানের কারণে তাদের অনেক বুকিং বাতিল করা হয়েছে। সব এয়ারলাইন্সেরই যাত্রীর সংখ্যা অনেক কমে গেছে। সবচে’ বেশি প্রভাব পড়েছে নাইট ক্লাব, উপহার সামগ্রীর দোকান ও ট্যাক্সি ক্যাবের উপর। গত সাত মাস ধরে থাইল্যান্ডে পর্যটকের সংখ্যা কমছে। যারা এসেছেন তারা দিনেরবেলা বেরুতে পারছেন না প্রচণ্ড গরমের কারণে আর রাতে বেরুতে পারছেন না কার্ফুর কারণে। এই পরিস্থিতির বার্তা তাদের কাছে খুব দ্রুতই পৌঁছে যাচ্ছে, যারা থাইল্যান্ড ভ্রমণের চিন্তা-ভাবনা করছিলেন। কথা হচ্ছিলো ট্যাক্সিচালক সমসাক জেইনদাক্রোর সঙ্গে। তিনি জানান, সামরিক অভ্যুত্থানের পর তার আয় অর্ধেকে নেমে এসেছে। আগে প্রতিমাসে কমপক্ষে ১ হাজার ডলার কামাতেন; কিন্তু মে মাসের রোজগার ছিল ৫০০ ডলারের কিছু বেশি। খাদ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে ভেবে অনেক দোকানেই সেল্ফ খালি রাখা হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, অভ্যুত্থানের থাইল্যান্ডের অর্থনীতির দৈনিক ক্ষতির পরিমাণ ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
অনেকদিন ধরেই অবশ্য থাইল্যান্ডের অর্থনীতির কোনো সুখবর নেই। এখনও দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে রপ্তানি; কিন্তু তা ক্রমাগতই কমছে। সত্যিকার অর্থে থাইল্যান্ডের অর্থনীতিতে সমস্যা চলছে গত আট বছর ধরে। থাইল্যান্ডের ন্যাশনাল এন্ড ইকোনোমিক এন্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট বোর্ড ইতিমধ্যে ২০১৪ সালের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ১.৫-২.৫% এ নামিয়ে এনেছে, যা আগে ছিল ৩ থেকে ৪ শতাংশ। এ বছরের প্রথম প্রান্তিকেও তাদের রপ্তানি কমেছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক সহিংসতা ও সামরিক অভ্যুত্থানের কারণে পর্যটকদের সংখ্যা কমে যাওয়াটা। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে পর্যটক কমেছে ৫ শতাংশ। আগের বছরের এ সময়ের তুলনায় ৪ লাখ পর্যটক কম এসেছে। দ্বিতীয় প্রান্তিকের অবস্থাটা যে আরো নাজুক হবে, তা বলাই বাহুল্য। কেননা এ সময়টাতেই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সবচে’ বেশি উত্তপ্ত। প্রথমে প্রধানমন্ত্রীকে পদচ্যুত করতে হলুদ শার্টধারীদের আন্দোলন আর এখন চলছে সামরিক শাসন। বিশ্লেষকরা বলছেন, থাইল্যান্ডের অর্থনৈতিক উত্তরণের জন্য প্রকৃত গণতন্ত্র খুবই জরুরি। সামরিক শাসন দীর্ঘায়িত হলে থাইল্যান্ডের উপর থেকে পর্যটকদের মুখ ফিরিয়ে নেয়াটাও অসম্ভব কিছু নয়। তারা এমনও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, গণতন্ত্র ফিরিয়ে দেয়ার নাম করে কয়েক বছর পর্যন্ত চলতে পারে সেনাশাসন। এমন হলে থাইল্যান্ডের অর্থনীতির জন্য দুঃসংবাদ কেবলই বাড়বে, সুসংবাদের তো প্রশ্নই আসে না। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, হলুদ শার্টধারীরা গণতন্ত্রের মূল সূত্রই মানতে নারাজ। সংসদ নির্বাচনে বেশি আসন লাভকারী দলটিই দেশ চালাবে, এ নীতিতে তারা বিশ্বাসী নয়। তাদের কথা হচ্ছে, অশিক্ষিত ও অসচেতন লোকজন সঠিক প্রতিনিধি ও দলকে বেছে নিতে পারে না। তারা চায় অভিজাতদের প্রতিনিধিরা দেশ চালাক কিংবা তাদের রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের অংশগ্রহণ থাকুক।
—আল জাজিরা ওয়েবসাইট অনুসরণে
