গত ৫ জুন জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী ২০১৪-১৫ অর্থ বছরের বাজেট পেশ করেছেন। বাজেট পেশ করার পর থেকে শুরু হয়েছে আলোচনা। তবে আলোচনা বা সমালোচনা যাই বলা হোক, প্রকৃত সমস্যা কিন্তু কেউ সেভাবে চিহ্নিত করছে না বা এড়িয়ে যাচ্ছে। আলোচনা সীমাবদ্ধ রয়েছে যথারীতি বাজেট উচ্চাভিলাষী কিনা, বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা এই সরকার বা প্রশাসনের রয়েছে কিনা ইত্যাদি।
এবারের বাজেটের আকার স্বভাবতই আগের বছরগুলোর থেকে বেড়ে গেছে। সামগ্রিকভাবে বাজেটের পরিমাণ ২.৫০ লক্ষ কোটি টাকার উপরে। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ১.৮৯ লক্ষ কোটি টাকা। উন্নয়ন বাজেটের আকার ৮০ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতি হবে প্রায় ৬৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। উল্লেখ্য, রাজস্ব ব্যয় ও উন্নয়ন ব্যয় মেটাতে গিয়ে যদি দেখা যায় ু রাজস্ব আয় কম, তবে যে অঙ্ক কম থাকে সেটাই ঘাটতি। সরকার এই ঘাটতি মেটাতে ঋণ করবে। ঋণ নেয়া হবে আভ্যন্তরীণ উত্স থেকে যেমন, সঞ্চয়পত্র বিক্রি ও ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে। অবশিষ্ট অর্থ আসবে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে। ব্যবসায়ীরা বলছে, সরকার যদি এত টাকা ব্যাংক থেকে ঋণ নেয় তবে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকারীরা প্রয়োজনীয় ব্যাংক ঋণ থেকে বঞ্চিত হবে। আবার অনেকে আশঙ্কা করছে যে, দেশের সার্বিক রাজনীতি- অর্থনীতির যে চিত্র তাতে বৈদেশিক অনুদান যথাযথভাবে মিলবে তো?
এগুলোই হল মোটা দাগে বাজেটের চিত্র। এই চিত্র দেখতে দেখতে আর আলোচনা শুনতে শুনতে জনসাধারণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। অথচ প্রকৃত চিত্র তারা দেখতে পাচ্ছে না বা কেউ তাদের বোঝানোর চেষ্টা করছে না।
এবারের বাজেটে করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো হয়নি। আয়করের স্লাভেও আনা হয়েছে অনেক পরিবর্তন। ব্যাপকভাবে বাড়ানো হয়েছে ভ্যাটের আওতা এবং হার। এবার এনবিআর খাত থেকে দেড় লক্ষ কোটি টাকা আয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে তার মধ্যে আয়কর থেকে আসবে ৫৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা আর ভ্যাট থেকে আসবে ৫৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা যা আগের বছরের থেকে অনেক বেশি। মজার ব্যাপার হল, বিগত বছরগুলোতে শুল্ক খাতে বর্ধিত আয়ের যে টার্গেট দেয়া হত এবার কিন্তু তার পরিমাণ মোটেই বাড়ানো হয়নি। এই খাতে প্রায় আগের বছরের ন্যায় টার্গেট রাখা হয়েছে ৩৫ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। দেখা যাচ্ছে, বর্ধিত করের সবটাই তোলা হবে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে। অবশ্য এর মধ্যে সেই অর্থে অন্যায় কিছু নেই। সরকারি এবং উন্নয়ন ব্যয় মেটাতে জনগণ কর দেবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যে বিষয়টার অভাব রয়েছে তাহলো সরকারের দায়বদ্ধতা। আয়কর একটি প্রত্যক্ষ কর। এই কর দেয়া সাধারণ নাগরিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। ভ্যাট সর্বসাধারণ প্রদান করে থাকে। রাস্তার ফকির থেকে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত সকলকেই এই ভ্যাট পরিশোধ করতে হয়। এবার একদিকে যেমন ভ্যাট এর আওতা বাড়ানো হয়েছে তেমনি ভ্যাটের হারও বাড়ানো হয়েছে ব্যাপকভাবে। সেবা খাতের প্রায় সবগুলোতেই সংকুচিত ভিত্তি মূল্য তুলে দিয়ে গ্রস ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আদায়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ বছর উত্পাদন খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোতে সংকুচিত ভিত্তি মূল্যের ব্যবস্থা রাখা হলেও আগামী বছর থেকে তুলে দেয়া হবে। আইএমএফ-এর তত্ত্বাবধানে ২০১২ সালে যে ভ্যাট আইন প্রবর্তন করা হয়েছে তাতে সেভাবেই বলা হয়েছে। উত্পাদন খাতে এবার সংকুচিত ভিত্তিমূল্য তুলে দেয়া না হলেও অনেক কর অব্যাহতিপ্রাপ্ত নিত্য পণ্যের উপর ভ্যাট বসানো হয়েছে। অনেক পণ্যের ট্যারিফ মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। আবার অনেক পণ্যের উপর বিক্রয়মূল্য তথা টার্নওভারের উপর ১৫% হারে সরাসরিভাবে ভ্যাট ধার্য করা হয়েছে। এক্ষেত্রে ভ্যাট এর বিধান চূড়ান্তভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে। ভ্যাটের বিধানে বলা হয়েছে, ভ্যাট নির্ধারিত হবে: বিক্রয় মূল্য-উপকরণ মূল্য= ভিত্তি মূল্য ঢ ১৫%= আরোপিত ভ্যাট। ভ্যাট আদায়ের মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে ঠিকই। তবে জনসাধারণের প্রাণ ওষ্ঠাগত হবে। কারণ ভ্যাট তাদেরকেই প্রদান করতে হবে।
আবার আগের কথায় ফিরে আসি। বাজেট বাস্তবায়ন কিভাবে হবে। উচ্চাভিলাষী, লক্ষ্য বিলাসী বা স্বপ্ন বিলাসী যাই বলা হোক না কেন, বাজেট বাস্তবায়ন আদতেই কোন সমস্যা নয়। আমাদের দেশে বাজেট বাস্তবায়নের পরিমাপ নির্ধারিত হয় আয় বা ব্যয়ের বিবেচনায়। রাজস্ব আয়ের দায়িত্ব থাকবে মূলত এনবিআর-এর হাতে। সরকার এনবিআর-এর চেয়ারম্যানকে টার্গেট নির্ধারিত করে দিয়েছে। চেয়ারম্যান সাহেব সেটা সার্কুলার করে পাঠাবে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছে। এইসব কর্মকর্তারা জনসাধারণ এবং ব্যবসায়ীদের গলায় গামছা বেঁধে কর আদায় করবে। নিজস্ব ক্ষমতা প্রয়োগ ছাড়াও রাষ্ট্র প্রদত্ত ক্ষমতা ব্যবহার করা হবে। যার মধ্যে রয়েছে সার্টিফিকেট মামলা। সার্টিফিকেট মামলার পরিমাণ ব্যাপকভাবে বেড়ে যাবে। তাছাড়া সম্পদ জব্দ করার ক্ষমতা তো থাকছেই।
ব্যয় যেহেতু উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নের প্রধান মাপকাঠি, তাই যথারীতি উন্নয়ন প্রকল্পের দরপত্র আহ্বান করা হবে, কার্যাদেশ দেয়া হবে। পরবর্তী জুন মাসের মধ্যে ঠিকাদারদের যাবতীয় বিলও পরিশোধ করে দেয়া হবে। এবছরের প্রথম দশ মাসে খরচ হয়েছে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির ৫৫%। কিন্তু নিশ্চিতভাবে ধরে নেয়া যায়, পরবর্তী ২ মাসে তা বেড়ে ৯৮-৯৯% হবে। এভাবে বাজেট বাস্তবায়িত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহল কৃতিত্ব নেবে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির মধ্যে আগের বছরের প্রকল্পই থাকে অধিক। সুতরাং, এগুলোর ধারাবাহিকতা রক্ষা করা কঠিন কাজ হবে না। আর রাজস্ব আয় যদি কম হয় তবে অন্য দেশের মত কৃচ্ছতা তো করা হবে না। কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ বা দামি গাড়ি কেনা কোনটাই বন্ধ হবে না। স্রেফ উন্নয়ন ব্যয় কমিয়ে সহজ সমাধানের পথ বেছে নেয়া হবে, এবছর যা করে দেখানো হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হল, এভাবেই কি আমরা উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিমাপ করতে থাকব। নাকি গুণগত বাস্তবায়ন হল কিনা তা বিবেচনা করব। ধরা যাক একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি করা হল। সেখানে ফার্নিচার এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কিনে দেয়া হল। কিন্তু শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হলো না যথাযথভাবে। ছাত্ররা সেখান থেকে যথেষ্ট শিক্ষা পাচ্ছে কিনা তা মনিটরিং করা হল না। অথবা একটি হাসপাতালের অবকাঠামো তৈরি করে দেয়া হল। এ্যাম্বুলেন্স ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সরঞ্জামও সরবরাহ করা হল। কিন্তু চিকিত্সকরা সেখানে যোগ্যতর সেবা দিচ্ছে কিনা, যন্ত্রপাতিগুলো আদৌ বসানো হয়েছে কিনা বা রোগীরা সেই যন্ত্রপাতি ব্যবহারের মাধ্যমে উপকৃত হচ্ছে কিনা কিংবা নতুন সড়ক বা সেতু নির্মাণের পর নির্ধারিত আয়ুষ্কাল পর্যন্ত সেগুলো টিকে থাকছে কিনা তা কিন্তু লক্ষ্য করা হচ্ছে না। আমরা কেবল অর্থ ব্যয়টাকেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাপকাঠি হিসেবে চিহ্নিত করছি। সরকারের আইএমইডি বিভাগ যেমন তা করে থাকে তেমনি আজ যারা বাজেট নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করছেন তারাও এর ব্যতিক্রম নন।
