দূর আকাশে জ্বলজ্বল করে যে নক্ষত্র একদিন পতন হয় তারও। টানা দুই ম্যাচ হেরে স্পেন বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পড়ার পর, ইকার ক্যাসিয়াসকে চাইলে আপনি তুলনা করতে পারেন সেই ঝরে-পড়া নক্ষত্রের সঙ্গেও। স্পেনের লজ্জাজনক বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেকটা নিশ্চিত হয়ে গেছে ক্যাসিয়াসের বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের পরিসমাপ্তিও। শেষ পর্যন্ত যদি সেটাই হয়ে থাকে, তাহলে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সফল এক তারকার করুণ বিদায়ই দেখলো ফুটবল বিশ্ব।
সমীহ জাগানিয়া একটি দল, যারা কখনোই হয়তো শেষ বাধাটা পেরোতে পারবে না। সবসময়ই দারুণ প্রতিশ্রুতিশীল, দলে তারকারও অভাব নেই কিন্তু আসল সময়ে গিয়ে হঠাত্ করেই হারিয়ে ফেলা। বছরের পর বছর ধরে ফুটবলের সর্বোচ্চ অঙ্গনে স্পেনের পরিচয়টা ছিল এমনই। সেই সমীহ জাগানিয়া দল থেকে স্প্যানিয়ার্ডদের বিশ্বফুটবলের অবিসংবাদিত সেরা দল হওয়া এই ক্যাসিয়াসের নেতৃত্বেই। ইউরো ২০০৮ সালে স্পেনের সাফল্যকে কেউ যদি সাময়িক রাজত্ব বলে মনে করেও থাকেন, তাদের সেই ভুল ধারণা ভেঙ্গে যেতে বেশি সময় লাগেনি।
দক্ষিণ আফ্রিকায় গত বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ডে সুইজারল্যান্ডের কাছে হারার পর প্রবল পরাক্রমে বিশ্বকাপ জিতলো তারা। এরপর, ২০১২ সালে কিয়েভে ইউরোর গত আসরের ফাইনালে আবারো এলো শিরোপা। টানা দু’টি ইউরো এবং বিশ্বকাপ জেতা প্রথম ইউরোপিয়ান দলে পরিণত হল স্পেন। ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার, দিদিয়ের দেশমের পর ইতিহাসের মাত্র তৃতীয় অধিনায়ক হিসাবে টানা ইউরো এবং বিশ্বকাপ জেতার রেকর্ড গড়লেন ক্যাসিয়াস।
জাতীয় দলের পাশাপাশি রিয়ালের হয়ে অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৭-১২ সাল পর্যন্ত টানা ছয় বছর জায়গা পেলেন ইউরোপের বছর সেরা একাদশে। আর রিয়াল মাদ্রিদ সুপারস্টার থেকে ক্যাসিয়াস পরিণত হলেন বিশ্বের অন্যতম বড় সুপারস্টারে। মাঠের বাইরে সাদামাটা আচরণ, সাংবাদিকদের সামনে দারুণ বিনয়ী, সদাহাস্যময় কিন্তু মাঠে স্ট্রাইকারদের জন্য যেন সাক্ষাত্ যমদূত। তাদের যে কোন আক্রমণকে গলা টিপে হত্যা করতে প্রস্তুত সর্বক্ষণ। দলের সাফল্যের পাশাপাশি ক্যাসিয়াসের মাঠের পারফরম্যান্স তাকে পরিণত করলো খেলাটির সর্বকালের অন্যতম সফল একজনে।
একের পর এক সাফল্যে মানুষ ভুলেই গেলো তীব্র আলোকোজ্জ্বল দিনের পর রাতও আসবে একটা সময়ে। ভুলে গেলো মাত্র ১৯ বছর বয়সে জাতীয় দলের জার্সি পরা ক্যাসিয়াস সেদিনের সেই ছোট্ট ছেলেটি নেই আর। সাফল্যের সংখ্যার সাথে তাল রেখে বেড়েছে তার বয়সও। ৩৩ বছর বয়সী একজন গোলরক্ষকের কাছ থেকে নিশ্চয়ই ২০ বছরের তরুণের ক্ষিপ্রতা আশা করতে পারেন না!
ভক্তদেরও বা কি দোষ! দিনের পর দিন গোলপোস্টের নিচে ক্যাসিয়াসের অসামান্য পারফরম্যান্স দেখে ভক্তরা হয়তো তাকে অজেয়, অলঙ্ঘনীয়ই ভাবতে শুরু করেছিলেন। অনূর্ধ্ব ১৯ দলের অধিনায়ক হবার মাত্র দু’বছর বাদেই জাতীয় দলে জায়গা করে নেয়া। এরপর গত ১৪ বছর ধরে একনম্বর গোলরক্ষকের জায়গাটাকে বানিয়ে ফেলেছেন ব্যক্তিগত সম্পত্তি। ক্লাব আর জাতীয় দলের জার্সি গায়ে অসাধারণ ধারাবাহিকতার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১২ সালে জায়গা করে নেন ক্লাব এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সম্ভাব্য সকল শিরোপাজয়ীদের সংক্ষিপ্ত তালিকায়। ইউরোপিয়ান ক্লাব শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই চ্যাম্পিয়ন্স লিগে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলা গোলরক্ষক হিসাবে নিজের নামটা লিখে ফেলেছিলেন ২০১০ সালেই। আর গত চার বছরে, সেই রেকর্ডটাকে আরো সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি এবার রিয়ালের বহু আরাধ্য দশম চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা জেতায়ও রেখেছেন বড় ভূমিকা। ১৫৫ ম্যাচ খেলে স্পেন জাতীয় দলের জার্সি গায়ে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলার রেকর্ডটাও ক্যাসিয়াসের।
এত এত সব অর্জন কি হারিয়ে যাবে, কেবল একটি-দুটি ম্যাচে খারাপ খেলে? নেদারল্যান্ডস কিংবা চিলির ভুলে ক্যাসিয়াসের হাস্যকর ভুলেই হয়তো হেরে গেছে স্পেন, কিন্তু সেটা কি মুছে দিতে পারবে গত বিশ্বকাপে তার বিরোচিত পারফরম্যান্সকে!
তেমনটা মোটেই ভাবছেন না ব্রাজিল জাতীয় দলের গোলরক্ষক হুলিও সিজার। বরং ক্যাসিয়াসের উদ্দেশ্যে মানুষের মাত্রাতিরিক্ত সমালোচনায় বিরক্ত তিনি, ‘মানুষ যখন কারো সমালোচনা করে সেটা আমার মোটেই ভাল লাগে না। এটা আপনার মন খারাপ করে দেবে। আমি সবসময়ই এই সময়ের অন্যান্য গোলরক্ষক এবং আমার প্রতিপক্ষের খেলা বিশ্লেষণ করি। আমার মনে হয় যে কোন বিচারে ক্যাসিয়াসের সম্মান প্রাপ্য। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার অসাধারণ সব সাফল্য আছে এবং রিয়ালের জার্সি গায়ে সে অবিশ্বাস্য সব সেভ করেছে। এই মুহূর্তে তাকে যে সময়টা পার করতে হচ্ছে সেটা সবাইকেই পার করতে হয়। তবে তার অর্জনের জন্য তাকে আমি সবসময়ই শ্রদ্ধা করে যাবো।’
এবারের বিশ্বকাপে যাই হোক না কেন, বিশ্ব তাকে আজীবন সেইন্ট ইকার হিসেবেই মনে রাখবে, শ্রদ্ধা করবে। সিংহাসন হারালেও রাজার প্রতাপ তো চিরকালই থাকবে!
