আনন্দ উত্তেজনার ফুটবল বিশ্বকাপ শুরু হয়েছে। সেই সঙ্গে শুরু হয়ে যাবে রাতজাগার প্রহর। একদিকে রাতজেগে টিভিতে খেলা দেখা অন্যদিকে দিনের বেলায় দৈনন্দিন কাজকর্ম। একসঙ্গে দুটি কাজ ২/৪ দিন চালানো গেলেও টানা একমাস চালানো সম্ভব নয়। তাই রাত জেগে খেলা দেখার প্রভাব পড়ে দিনের কাজে। আর পছন্দের টীম যদি হেরে যায় তখন নেতিবাচক প্রভাবে আক্রান্ত হয় মনও। রাতজাগার প্রভাব কাটাতে রাতজাগা শরীরের এই ক্লান্তি কাটাতে ফলের রস সবচেয়ে ভালো কাজে দেয়। এছাড়া ১ গ্লাস পানিতে ৭৫ গ্রাম গ্লুকোজও খেয়ে নিতে পারেন। আর শরীরটাকে একটু মেলে ধরে, নিতে পারেন গোটাদশেক গভীর শ্বাস। রাত জাগার পরের দিন লাঞ্চটাও সারতে হবে সাদামাটাভাবে। কয়েকটুকরো সালাদ, সামান্যভাত কিংবা রুটি সাথে কিছুটা সবজি অথবা মাংস থাকতে পারে। তবে কোনভাবেই যেন দুপুরের খাবারটি ভরপেট না হয়। এতে ঘুম কম পাবে এবং স্বস্তিতে সেরে নেয়া যাবে দিনের প্রয়োজনীয় কাজকর্ম। ঘুম আসলে সুযোগ মত ঘুমিয়ে নিতে হবে।
দিবানিদ্রা ও গভীর শ্বাস
ঘুমুতে আপনাকে হবেই। তাই সুযোগ পেলেই ঘুমিয়ে নেবেন সুবিধা মত সময়ে। একেবারে ডিপস্লিপ দিতে পারলে আরো ভালো। শুয়ে গভীরভাবে লম্বা শ্বাস নিতে হবে এবং ছাড়তে হবে। এতে করে কম সময়ে শরীরে বিশেষ করে মস্তিষ্কে অক্সিজেন যাবে এবং শরীর তরতাজা লাগবে। আর কোন কারণে পুরোমাস জুড়ে ঘুম কম হলে শরীরে বিশেষ কোন ক্ষতি না হলেও কাজকর্মের পারফরমেন্স যে খারাপ হবে। কাজে মন বসবে না, মেজাজ খারাপ থাকবে, শরীরে ঝিমুনি আসবে, মাথা ব্যথা থাকতে পারে।
টিভি দেখার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
গরম-ঘাম-অনিদ্রা এবং ক্রমাগত টিভি দেখার কারণে ঘাড় ব্যথা, মাথা ব্যথা হতে পারে। গরমের অস্বস্তি এড়াতে রাতের গোসল কিছুটা স্বস্তি এনে দিলেও একটু আধটু সর্দি লেগে যেতে পারে। এ সময়ে মাথা ব্যথার জন্য একটি প্যারাসিটামল ট্যাবলেটই যথেষ্ঠ। সাথে মুখে পানির ঝাপটা দিয়ে হাত-পা ধুয়ে নিলে শরীরটা ভাল লাগবে। তবে যাদের মাইগ্রেনের ব্যথা রয়েছে তাদের কথা আলাদা। সে ক্ষেত্রে স্টিমিটিল ও প্যারাসিটামল জাতীয় ট্যাবলেট একটি করে একসঙ্গে খেয়ে নিয়ে আলোহীন ঘরে বিশ্রাম নিতে হবে। কমঘুমের জন্য মাইগ্রেন হলে সেক্ষেত্রে ব্যথার ওষুধ খেয়ে লাভ হবে না। তখন ঘুমটাও লাগবে। অনেকেরই ধারণা
একটানা রাত জেগে খেলা দেখলে চোখের ক্ষতি হতে পারে। আসলে এ ধারনা ঠিক নয়। তবে চোখে কিছুটা ব্যথা হতে পারে। এক্ষেত্রে কিছুটা সর্তকতা অবলম্বন করতে হবে। যেমন টিভি সেটটা অন্তত ৭-৮ ফুট দূরে থাকা উচিত। টিভি সেট রাখতে হবে চোখ যে উচ্চতায় রয়েছে একই উচ্চতায়। ঘাড় উঁচু নিচু করে খেলা দেখতে গেলে ঘাড়ে ব্যথা হতে পারে। ঘাড়ের এই ব্যথা চলে যেতে পারে মাথায় ও চোখে। খেলা দেখার সময় শরীরটাকে কীভাবে রেখে খেলা দেখছেন সেটাও জরুরী। শরীরের অবস্থানটা ঠিক না থাকলে কোমর ব্যথাও হতে পারে। কোমরের পিছনে একটা কুশন দিয়ে আরাম করে খেলা দেখুন। একেবারে শুয়েও দেখতে পারেন। মাঝেমধ্যে পাশ ফিরে নেবেন। মাঝেমধ্যে উঠে বসলেন। এত ভালো লাগবে। ঘর পুরো অন্ধকার করে টিভি দেখা ঠিক নয়। মশারির মধ্যে বসে টিভি দেখবেন না। যারা নিয়মিত খেলা দেখছেন তারা হাফটাইমের সময় চোখ বুজে শুয়ে থাকলে আরাম বোধ করবেন। অথবা বারান্দায় পায়চারি করতে পারেন।
রাতজেগে খেলা দেখা এবং খাবার
অনেকেই হয়ত জানেন ভাত খেলে ঘুম পায়। তাই এই সময়টাতে ভাতের পরিবর্তে রুটি খেলে কিছুটা লাভ হবে। তবে পেটে সহ্য হওয়ার একটা ব্যাপার আছে। যে কোন খাবারই হোক তা খেতে হবে কম করে। বেশি খাওয়া মানে বেশি ঘুম একথাটি মনে রাখতে হবে। খাবারে উল্টোপাল্টা হলে বদহজম হতে পারে, পেটে গ্যাস হতে পারে। রাতজাগার আরেকটি সমস্যা হচ্ছে বারবার ক্ষিধে পায়। ডায়বেটিস না থাকলে একটু আধটু বাড়তি খাবারে ঝামেলা নেই।
ডায়াবেটিস না থাকলে গ্লুকোজ পানি খেতে পারেন। এতে ক্লান্তি ও ক্ষিধে দুটোই কমবে। তবে অনেকেই চা বিস্কুুট চিপস্ চানাচুর ইত্যাদি নিয়ে বসেন। বয়স কম হলে এসবের কোন কিছুতেই সমস্যা হয় না। তবে যাদের পেটে গ্যাস হয় তাদের এগুলো ভেবে চিন্তে খেতে হবে। মুড়ি, পপকর্ন খেলে গ্যাস কম হয়। চানাচুর, চা-কফিতে কারো কারো গ্যাস বাড়তে পারে। তবে সিগারেটে পেটে গ্যাসসহ অনেক ধরনের অস্বস্তি হতে পারে। রাতে হালকা খাবার খেলে শরীর চাঙ্গা থাকবে। খাওয়ার সময়টা একটু এগিয়ে নিয়ে আসতে পারেন। রাত জাগলে এসিড নি:সরণ বাড়ে, অনেকের ঢেঁকুর উঠতে থাকে বুকজ্বলে- এটিকে বলে এসিড রিফ্লাক্স। এসব ক্ষেত্রে ইসমোপ্রাজল বা ওমিপ্রাজল জাতীয় ওষুধ খাওয়া যেতে পারে। কারো কারো ক্ষেত্রে এন্টাসিড জাতীয় ওষুধ খেলেই হয়। তবে একটু বেশি পানি কিংবা ফলের রস খেলে রাতের খেলা দেখার সময়টি ভালোই কাটবে। খাওয়া যেতে পারে আস্ত ফলও।
রোগ থাকলে বাড়তি সর্তকতা
প্রিয়দলের খেলা দেখার বাড়তি উত্তেজনা হার্ট অ্যাটাকের কারণ হতে পারে।
১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলের সময় ইংলান্ডের দর্শকদের ওপর পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, সেই সময়ে ইংল্যান্ডের সাথে অন্য কোন দলের খেলার দিন বা তার কয়েকদিনের মধ্যে দর্শকদের অনেকেই হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্ত্তি হয়েছেন। অন্যান্য দিনের তুলনায় সেবার ইংল্যান্ডের খেলা থাকার দিনে হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হওয়ার শতকরা ২৫ শতাংশ বেড়ে যায়। ২০০২ সালে ব্রিটিশ
মেডিকেল জার্নালে এই সমীক্ষার উপসংহারে বলা হয়ে প্রিয়দলের খেলা নিয়ে অতিরিক্ত মানসিকচাপ ও উত্তজনার কারণে হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের মত দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে। বিশ্বকাপ নিয়ে আরেক স্প্যানিশ গবেষণায় দেখা গেছে, খেলা দেখার সময় উত্তেজনা টেস্টোস্টেরন নামক হরমোনের নি:সরণ বেড়ে যায়। খেলা দেখার সময় এই টেস্টোস্টেরন বেড়ে গেলে দর্শক উত্তেজনার বশবর্তী হয়ে মারমুখী হয়ে ওঠে। আরেক গবেষণায় দেখা গেছে রাতজেগে খেলা দেখার কারণে সৃষ্ট উত্তজনায় রক্তে স্ট্রেস হরমোন কর্টিসলের মাত্রা বেড়ে যায়। ফলে মানসিকচাপ আরো প্রকট আকার ধারণ করে। সবকিছু মিলে খেলা দেখতে গিয়ে রাতজাগলে রক্তচাপ, ডায়াবেটিস
ইত্যাদির কষ্ট কিছুটা বাড়ে। এইসব রোগ স্ট্রেস এর সাথে সম্পর্কিত। খেলা দেখার সাথে সরাসরি স্ট্রেসের বিষয়টি জড়িত। এই স্ট্রেসের মধ্যে রয়েছে পজিটিভ স্ট্রেস এবং নেগেটিভ স্ট্রেস। প্রিয় দলে বিজয়ের আনন্দ একধরনের পজিটিভ স্ট্রেস। তবে এই স্ট্রেস টানা ৭ দিন চললেই কিন্তু ব্লাডসুগার বাড়বে। বাড়তে পারে ব্লাড প্রেসারও। এজন্য কোন ওষুধের ডোজ বাড়ানো ঠিক হবে না। বরং বিশ্রাম নিতে হবে। অসুখ বিসুখ নিয়ে বাঁধনহারা হলে কি চলে? দিনের ৮-৯ ঘণ্টা কাজের পর
৩-৪ ঘণ্টার খেলা দেখা সেরে বাকী সময়টাতে বিশ্রাম নিতে হবে।
তারপরও খেলা দেখুন
মনের ওপর বিশ্বকাপ ফুটবল প্রভাব অনেক। প্রিয়দলের বিজয়ে যেমন
একজন ফ্যান যেমন খুশিতে আত্মহারা হয়ে ওঠে, তেমনি পরাজয়ে ততটাই ভেঙ্গে পড়ে মানসিকভাবে। বিশ্বকাপ ফুটবেলের ওপর এক গবেষণায় দেখা গেছে, শতকরা ২৫ ভাগ ফুটবল ফ্যানরাই ফুটবলকে তাদের জীবনের একটি অংশ মনে করে। আর এই ফুটবল তাদেরকে মানসিক প্রশান্তি এনে দেয়। আরেক গবেষণায় দেখা গেছে বিশ্বকাপ ফুটবল চলার সময় হাসপাতাল- গুলোতে মানসিক রোগীর সংখ্যা কমে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে দলবেঁধে ফুটবল খেলা উপভোগের
কারণে মানুষের মধ্যে পরস্পরের প্রতি সহমর্মিতা গড়ে ওঠে। সেই সঙ্গে
একসাথে খেলার দেখার কারণে গড়ে
ওঠে সামাজিক সর্ম্পক। ফুটবল খেলা দেখার সময় গড়ে ওঠা এই সামাজিক বন্ধনকে ইতিবাচক হিসাবে দেখেন মনরোগ বিশেষজ্ঞরা। শুধু সমাজই নয় বিশ্বকাপ ফুটবলকে ঘিরে পরিবারের মধ্যেও নতুন করে বন্ধন গড়ে ওঠে। অনেক পিতামাতাই সন্তানদের সাথে একসঙ্গে বসে খেলা উপভোগ করেন। পরিবারে সকলে মিলে উপভোগ করার এই সময়টি তাদের প্রত্যেকের জীবনেই অতি মূলবান সময় হিসাবে গণ্য করে থাকেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ সন্তানদের কাছে বাবা-মা’র সাথে বসে বিশ্বকাপ
ফুটবল উপভোগর এই স্মৃতি তার জীবনের স্মরণীয় সুখকর ঘটনা হয়ে সারাজীবন তাকে উদ্ব্বেলিত করবে। গবেষণায় দেখা গেছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাবার সঙ্গে ছেলেরা ফুটবল খেলা দেখে থাকেন। খেলা দেখার মাধ্যমে পিতা-পুত্রের মধ্যে সম্পর্কের যে উন্নয়ন ঘটে অন্য
কোনভাবেই এতটা স্বতস্ফূর্ত ও সাবলীলভাবে তা সম্ভব হয় না। কাজেই মনের ফুটবলের ইতিবাচক প্রভাবে মানসিক স্বাস্থ্য উন্নত হয়, যার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে শরীরের ওপর।
ডা. সজল আশফাক
সহযোগী অধ্যাপক, নাক কান গলা বিভাগ,
হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিক্যাল
কলেজ হাসপাতাল
