গ্যারিঞ্চায় অনুপ্রাণিত নেইমাররা

আপডেট : ২৪ জুন ২০১৪, ২১:৫১
এখানকার গ্যারিঞ্চা স্টেডিয়ামে ব্রাজিল ফুটবল দল মাঠে নামার আগে স্টেডিয়ামের বড় পর্দায় দেখানো হচ্ছিল গ্যারিঞ্চার ফুটবল কীর্তির গৌরব গাথা সব তথ্যচিত্র। এক একটা চিত্র পর্দায় ভেসে উঠতেই দর্শক উল্লাসে মেতে উঠছিল। বাংলাদেশের এই প্রজন্মের ফুটবল দর্শক গ্যারিঞ্চাকে হয়তো চিনবেন না। এমনটা হওয়ার কথা ছিল ব্রাজিলেও। কিন্তু সেটা হয়নি। শিশু কিশোর ছাড়া আর সব বয়সের ফুটবল দর্শক এই কিংবদন্তীকে জানে এবং ভালোভাবেই জানে। রবীন্দ্রনাথ পরে যেভাবে মনের আঙ্গিনায় তাকে শ্রদ্ধার আসনে বসিয়ে রাখেন পাঠক। তেমনি ব্রাজিলে ফুটবল কিংবদন্তীরাও দর্শক মনের উচ্চাসনে আছেন। নতুন প্রজন্মের ফুটবল দর্শক গ্যারিঞ্চাকে পাশের মানুষটি হিসাবেই চেনেন। ব্রাজিল ক্যামেরুন ম্যাচে দর্শক গ্যারিঞ্চার বড় ছবির ব্যানার নিয়ে মাঠে গিয়েছিলেন। বড় পর্দায় ভেসে উঠা গ্যারিঞ্চার ছবি আর পেছন থেকে ইতিহাসের বর্ণনা শুনে ব্রাসিয়ালিয়ায় গ্যারিঞ্চা স্টেডিয়ামের দর্শকরা যেন নস্টালজিক হয়ে পড়েন। ব্রাজিলের ফুটবল এতো ঐতিহ্যবাহী। সাদাকালো যুগে যে ফুটবলটা খেলে গেছেন গ্যারিঞ্চারা সেটাকেই কাঁধে নিয়ে এগিয়ে চলেছেন কিংবদন্তী খেলোয়াড়টির উত্তরসূরী নেইমাররা। গ্যারিঞ্চার একটা স্থির ছবি বেশ কয়েক মুহূর্ত টিভির বড় পর্দায় ধরে রাখা হয়। ছবিটা না সরিয়ে ফেলা পর্যন্ত স্টেডিয়ামের ৬৯ হাজার দর্শক গগন বিদারী উল্লাস করলেন। ড্রেসিং রুম থেকে বেরিয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে নেইমারের চোখ আটকে থাকলো গ্যারিঞ্চার ছবির দিকে। আলভেস, মার্সেলোরাও এসে নেইমারের সাথে দাঁড়ালেন। গ্যারিঞ্চার ছবিটা যেন নেইমারদের প্রেরণা দিল। ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ জিততে না পারার কষ্টটাও মনে করিয়ে দিল। আর যেন ১৯৫০ সালটা ফিরে না আসে। তাই নেইমারদের ফুটবল শৈলীটা দেখে সেটাই মনে হয়েছে। একজন ফুটবল দেবতাতুল্য মানুষের ছবিটা যে কখনো কখনো সঞ্জীবনী শক্তি যোগায় তার প্রমাণটা মেলে ধরেছেন নেইমাররা। ক্যামেরুনের বিরুদ্ধে জয়টা বড় ব্যবধানেই আসবে। সেটা ধারণা ছিল দর্শকদের। যে কারণে অনেক দর্শক আসেননি বলে গ্যালারিতে অনেক চেয়ার শূন্য ছিল। আর যারা জানতেন গ্যারিঞ্চাকে স্মরণীয় করে রাখতে পারেন নেইমাররা, তারাই বিশ্বাস নিয়ে গিয়েছিলেন মাঠে। আত্মতৃপ্তি নিয়েই ফিরেছেন। ক্যামেরুনের বিরুদ্ধে ৪-১ ব্যবধানের জয়ে দুই গোলই নেইমারের। হ্যাটট্রিক করার কোনো আগ্রহ দেখা গেলো না। ৭১ মিনিট পর্যন্ত নেইমারকে মাঠে রাখলেন কোচ লুইস ফিলিপ স্কোলারি। ঝুঁকি নিলেন না নকআউট পর্ব আছে বলে। এর আগে ব্রাজিল গ্রুপ পর্বে আরো দুটি ম্যাচ খেলে ক্রোয়েশিয়া এবং মেক্সিকোর বিরুদ্ধে। কিন্তু ক্যামেরুনের এই ম্যাচ ছিল অসাধারণ। ব্রাজিল চাইলে কি করতে পারে সেটাই একটুখানি দেখিয়ে দিয়েছে। পাতলা শরীরের নেইমার প্রতিপক্ষের রক্ষণ দুর্গে ফুটবল পায়ে যেন ‘সন্ত্রাসীর’ মতো আচরণ করেছেন। ক্যামেরুন একটিবারও নেইমারকে আটকাতে পারেনি। ক্যামেরুন যেন নেইমারের বিরুদ্ধেই খেলছিল। এক নেইমারই প্রতিপক্ষের স্বপ্ন ভেঙ্গে দেয়ার জন্য যথেষ্ট হতে পারেন। সেটাই তুলে ধরেছেন ক্যামেরুনের ম্যাচে। ব্রাজিলিয়দের আদরের সন্তান নেইমার একটু মাটিতে পড়ে গেলেই দর্শক কষ্ট পান। ক্যামেরুনের নিওনের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া বলটা নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে পড়ে গিয়েছিলেন নেইমার। ছিটকে গিয়ে পড়লেন কর্নার ফ্ল্যাগের সামনে। ফটো সাংবাদিকদের হাত ছোঁয়া দূরত্বে। কেন এটা হলো। তাতেই ব্রাজিলীয়ানরা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন। এতো কড়াকড়ির পরও নিরাপত্তা উপেক্ষা করে ক্যামেরুনের ফুটবলারকে বোতল ছুঁড়ে মারেন। শান্ত থাকতে অনুরোধ করেন নেইমার। খেলা চলাকালীন নেইমার যেন সারাক্ষণ দর্শকদের সাথে যোগাযোগ রাখেন। ইশারায় কথা হয় তার সাথে। দর্শকদের সাথে কেমন যেন একটা মায়াবী বন্ধন তার। প্রয়োজনের সময় তিনি দর্শকদের উল্লাস করতে ইশারা দিচ্ছেন। আবার প্রয়োজনের সময় নেইমার দর্শকের কাছে গিয়ে কি যেন বলতে চাইছেন। কর্নার করতে গিয়ে নেইমার ইশারায় দর্শককে বলছেন, অপেক্ষা করো গোল দেখতে পারবে। দেখে মনে হতেই পারে দর্শকরাও যেন নেইমারের সাথে ফুটবল খেলছে। বল পায়ে নেইমার এক সেকেন্ডেরও কম সময়ের মধ্যে দেখে বুঝে ফেলেন তিনি বলটা কাকে দেবেন। কে কোথায় দাঁড়িয়ে। নাকি নিজেই গোলপাস্টে শট করবেন। ক্যামেরুনের বক্সের উপরে ব্রাজিলের মার্সেলো, ফ্রেড, গুস্তাভো, অস্কারদের বিদ্যুত্ গতির চারটা পাস খেলে দারুণ একটা শট করেছিলেন নেইমার। সেটা যদি গোল হতো তাহলে ব্রাজিল বিশ্বকাপ ফুটবলের সবচেয়ে সুন্দরতম আক্রমণ হয়ে থাকতে পারতো। ফ্রেমে বেঁধে রাখার মতোই দুর্দান্ত স্মৃতি ছিল এটি। এমন জাদু আগের দুই ম্যাচে দেখেননি ব্রাজিলের দর্শক। গ্যারিঞ্চার মাঠে গ্যারিঞ্চাকে এভাবেই স্মরণীয় করে রাখবেন নেইমাররা এটাই তো স্বাভাবিক। মনে রাখার মতো খেলেছে ব্রাজিল আর ব্রাজিলের নেইমার। গ্যারিঞ্চা বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই মাঠে থাকতেন। দেখতেন কিভাবে নেইমাররা তাদের ঐতিহ্য বয়ে বেড়াচ্ছেন। গ্যারিঞ্চা বেঁচে থাকলে হয় তো নেইমারদের মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করতেন। এখন যেমনটা করছেন অন্তরাল থেকে।