তারা দু’জন...

আপডেট : ২৫ জুন ২০১৪, ১৯:৪২
একজনকে মনে করা হয় বিশ্বের ইতিহাসের অন্যতম প্রতিভাবান খেলোয়াড়। আরেকজন হলেন সময়ের অন্যতম সেরা ফুটবলারদের একজন। তাদের উপরেই নির্ভর করছে আবার ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী দু’দল। সেই দেশ দু’টির নাম যখন ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা তখন দলের দুই প্রাণভোমরা লিওনেল মেসি ও নেইমারের দিকে দৃষ্টি রাখতেই হবে। বিশ্বকাপ ফুটবলে সবাই নেইমার-মেসির পেছনে ছুটছে। আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের পেছনে ছুটছে সবাই। যেখানে বিশ্বসেরা এই দু’দল। সেখানেই সবার ছুটে চলা। ফুটবল নিয়ে আলোচনা হলে সেটা ব্রাজিল-আর্জেন্টিনাকে নিয়েই হচ্ছে। অন্য কোনো দল খেললেও তাদের খবর নিজেদের দেশের লোকজন ছাড়া অন্যদের মুখে শোনা যাচ্ছে না। এখনও সেই একই প্রশংসা, ইরানের বিরুদ্ধে মেসির গোল নিয়ে বর্ণনা। ক্যামেরুনের ডিফেন্স ভেঙ্গে চুরমার করে দেয়া সেই সাতকাহন। হবেই না কেন। নিজেদের সেভাবে মেলে ধরেছেন বলেই তো এখন নেইমার-মেসিদের নিয়ে যত আলোচনা। ব্রাজিলের ব্রাসিলিয়া শহরটি গত কয়েকদিনে যতটা জমজমাট ছিল সেটা এখন নেই। ব্রাজিলের ম্যাচ ঘিরে যে উন্মাদনা সেটা যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। মঙ্গলবার ব্রাজিলের সময় বিকাল ৫টায় (বাংলাদেশ সময় রাত ২টা) গ্যারিঞ্চা স্টেডিয়ামে গিয়ে দেখা গেলো নীরব। স্টেডিয়ামের যে আঙ্গিনাটি আগের দিন ব্রাজিলের ম্যাচের পূর্বে যতটা জমজমাট ছিল, ছিল সাম্বা নাচ, আর মনমাতানো রঙের খেলা। পুরো এলাকা ছিল নেশার মত বুঁদ হয়ে। ম্যাচের পরদিন সেই স্থানটি ছিল জনমানবশূন্য। একজন এসেছিলেন ছবি তুলতে। এছাড়া দু’দিকে যতদূর চোখ যায় শুধুই শূন্যতা। স্বেচ্ছাসেবকদের তেমন কোনো ব্যস্ততা নেই। মিডিয়া সেন্টারটিতে জায়গা পাওয়াই ছিল দুষ্কর। আর ম্যাচের পরদিন ৬০০ আসনের মিডিয়া সেন্টারের প্রায় সবক’টি চেয়ার ফাঁকা ছিল। বাংলাদেশি কয়েকজন সাংবাদিক এসে নিজের কাজে মন দিলেন। ক্যাফেটেরিয়ায় বুফেতে খাবার পাওয়া যায়, ব্রাজিলীয়ান মুদ্রায় ৩২ টাকা হলেও বাংলাদেশি টাকায় সেটার দাম পড়ছে ১৩০০ টাকা। সংবাদ মাধ্যমের ভিড় হবে মনে করে খাবার প্রস্তুত করা হলেও বিক্রি হয়নি। ১২০ টাকা করে কয়েকটা পানির ছোট বোতল বিক্রি করা ছাড়া ক্যাশ কাউন্টার নিয়ে ম্যাচের দিনের মতো ব্যস্ত থাকতে হয়নি স্বেচ্ছাসেবকদের। সাংবাদিকরা ছুটেছেন আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের পেছনে। ব্রাজিল নক আউট পর্বের প্রথম ম্যাচ খেলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। চিলির বিরুদ্ধে ম্যাচটি বেলে হরিজোন্তের স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে খেলা। সংবাদ মাধ্যমও ছুটছেন সেদিকে। নাইজেরিয়ার বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনার ম্যাচ ফোর্তেলোজায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানেই ছিলেন সংবাদকর্মীরা। ফোর্তেলোজায় ম্যাচ শেষ করেই আবার অন্য ভেন্যুতে ছুটছেন সবাই। সাংবাদিক-খেলোয়াড়-দর্শক। বিশ্বকাপ ফুটবলের ১৭ দিন পার হয়ে গেছে। একটা করে দিন যাচ্ছে আর বিশ্বকাপের আকার ছোট হয়ে আসছে। নক আউট পর্বের লড়াইয়ের প্রস্তুতিও শুরু হয়ে যাচ্ছে। বিশ্বকাপের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন স্পেন আগেই বিদায় নিয়েছে। বড় আপসেট ছিল এটি। এবার তাদের বিদায়টা ছিল সবচেয়ে লজ্জাজনক। স্পেন তিন ম্যাচের মধ্যে শেষ ম্যাচে অষ্ট্রেলিয়াকে (৩-০) হারিয়েছে মাত্র। আর প্রথম দুটি ম্যাচে নেদারল্যান্ডস (৫-১) এবং মেক্সিকোর (২-০) কাছে হেরে বিদায়টা আগেই নিশ্চিত করে ফেলেছে। লজ্জার খবর আরো আছে। ফুটবল দুনিয়ায় ইংলিশ লিগ হচ্ছে সবচেয়ে ব্যয়বহুল একটি আসর। এই লিগে অনেকগুলো ক্লাব বড় বাজেটের দল গঠন করে। সবচেয়ে জনপ্রিয়তার দিক থেকেও এটি এগিয়ে আছে। অথচ এই ইংল্যান্ড সেই কবে (১৯৬৬) ঘরের মাঠে চ্যাম্পিয়ন হলো। যে বছর ফ্রান্স গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিয়েছিল। সেই ফ্রান্স ২৮ বছর পর নিজেদের ঘরে টুর্নামেন্ট আয়োজন করে চ্যাম্পিয়ন হলো। আয়োজক হিসাবেও সফলতার বাড়তি সার্টিফিকেট পেলো। আর ৪৮ বছরেও বিশ্বকাপ ফুটবলের দ্বিতীয় শিরোপা ঘরে নিতে পারলো না ইংল্যান্ড। দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপ ফুটবলে নক আউট পর্বে উঠলেও এবার তো রেজাল্ট আরো খারাপ। গ্রুপ পর্বে ইতালী (২-১) এবং উরুগুয়ের কাছে (২-১) হেরেই বিদায় নিতে হলো ইংলিশদের। বিদায়ের তালিকায় যখন ইতালীর নামটা যোগ হলো তখন তো ফুটবল পন্ডিতরা ব্রাজিল আর্জেন্টিনার দিকে মনোযোগটা আরো বাড়িয়ে দিলেন। ১৯৩৪, ১৯৩৮, ১৯৮২ এবং ২০০৬ বিশ্বকাপের চারবারে চ্যাম্পিয়ন ইতালীর বিদায়টা মেনে নেয়া যায় না। হতাশ হয়ে ইউরোপীয়ানরা রিটার্ন টিকিট নিয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। আর ক্রোয়েশিয়া এবং ক্যামেরুনের কথা বলেই বা লাভ কি। গ্রুপ পর্বে ব্রাজিলের সঙ্গী ক্রোয়েশিয়া। ১৯৯৮ ফ্রান্স বিশ্বকাপ ফুটবল সেমিফাইনাল খেলে যে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল, চমকে দিয়েছিল সেটা পরের আসরগুলোতে আর দেখা যায়নি। দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপ ফুটবলের চূড়ান্ত পর্বেই উঠতে পারেনি ক্রোয়েটরা। তার আগের দুটি আসরেও গ্রুপ পর্বেই বিদায় হয় ক্রোয়েশিয়ার। এবারও তাই হলো। সাফল্য বলতে ক্যামেরুনকে ৪-০ গোলে হারানোর পুঁজি। বিদায়ের ঘন্টাধ্বনিতে ফুটবল দর্শক, সংবাদমাধ্যমও ছুটছে নেইমার,মেসিদের পেছনে। এর সাথে গত মঙ্গলবার রাতে বিদায় নিল চারবারের শিরোপাজয়ী দল ইতালী। জিয়ানলুইজি বুফন ও আন্দে পিরলোদের শেষবারের মত পরখ করে নিলো বিশ্বকাপ। রোনালদের পতুর্গালেরও বিদায় নিশ্চিত হয়ে গেছে। সবমিলিয়ে বিশ্বকাপে এবার তাই লাতিন দলগুলোরই দাপট। আর দুই লাতিন নায়কের দিকেই থাকছে সকল দৃষ্টি। বিশ্বকাপটা দিয়েই কি কিংবদন্তী হয়ে উঠবেন এই দু’জন!