ব্রাজিলের অন্য সমর্থকের মতোই অরনাল্ডো হলুদ জার্সি গায়ে, চোখে সানগ্লাস। দেখে বুঝার উপায় ছিল না ৩৪ বছর বয়সের এই মানুষটি দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। হাতে সাদা ছড়ি দেখার পর নিশ্চিত হলাম। বেলে হরিজোন্তে শহর থেকে রাতের বাসে ব্রাসিলিয়ায় এসেছিলেন ব্রাজিল-ক্যামেরুনের ম্যাচ দেখবেন বলে। আগ্রহ নিয়ে কথা বলতে গেলে তার হাসিখুশি আনন্দ মুহূর্তেই ভুলিয়ে দেয় অন্ধত্বের ব্যাপারটি। চোখ ছাড়া খেলা দেখবেন কিভাবে জানতে চাইলে অন্যদিকে তাকিয়ে অরনাল্ডো বলেন, ‘আমি চোখ ছাড়াই ভালো দেখতে পাই। সৃষ্টিকর্তা আমার চোখ কেড়ে নিলেও আমি থেমে নেই। ছড়ি হাতেই গ্যারিঞ্চা স্টেডিয়ামে খেলা দেখছি।’ অরনাল্ডের তো চোখ নেই। আরেক তরুণী এসেছেন তার পা নেই। ডান পা কেটে নিতে হয়েছিল একটি দুর্ঘটনার কারণে। তাই বলে থেমে নেই তার জীবন। পায়ের দিকে না তাকালে বুঝার উপায় নেই সুন্দর এই মেয়েটি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। ক্র্যাচের উপর ভর করেই তার বাকি জীবনটা চলতে হবে। ব্রাসিলিয়া বসবাস করেন এই লুসিয়ানা। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রী লুসিয়ানা দারুন চটপটে। ফুরফুরে মেজাজের মেয়ে। স্টেডিয়ামে এটাই ছিল তার প্রথম খেলা দেখতে আসা। বিশ্বকাপের স্মৃতি তার জানা নেই। দাদা-দাদীর কাছে শুনেছেন ব্রাজিল এর আগেও বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজন করেছিল। এটি তাদের দ্বিতীয় আয়োজন। স্মৃতির ফ্রেমে নিজেকে বিশ্বকাপ ফুটবলের সাথে জড়িয়ে রাখতে স্টেডিয়ামে এসেই লুসিয়ানা প্রথমে ছবি তুললেন। ব্রাজিলের ফুটবল কিংবদন্তী গ্যারিঞ্চার নামটা যেখানে লেখা সেখানে দাঁড়িয়ে ছোট ভাই আর বড় ভাই ও তার স্ত্রীর সাথে দাঁড়িয়ে একটার পর একটা ছবি তুললেন। লুসিয়ানার ছবি তুলতে চাইলাম বলে ভীষণ খুশি হয়েছে মেয়েটি। তাদের মুখের হাসি দেখে ভাই-ভাবিও সাংবাদিকদের সাথে ছবি তুলতে চাইলেন। জানতে চাইলেন দেশের নাম।
মেয়েটির কোমরের নিচ থেকেই পা কেটে ফেলতে হয়েছে। ফুটবল উত্সবে মেতে উঠার জন্য তার সাজসজ্জা ছিল লক্ষণীয়। ঠোঁটে লাল লিপস্টিক, কানে ব্রাজিলের পতাকার আদলে বানানো রিং, ব্র্রাজিলের জার্সি গায়ে, আর হাতের ক্র্যাচ, যেটি তার সর্বক্ষণের সঙ্গী, সেই ক্র্যাচটিও ব্রাজিলের রং সবুজ আর হলুদে ভরা। অনেকেই তার সাথে ছবি তুলে স্মৃতিতে রাখতে চাইলেন। শারীরিক অক্ষমতাকে কিভাবে জয় করে চলেন জানতে চাইলে বোঝালেন,‘আমার কোনো সমস্যা হচ্ছে না। একটা পা নেই তো কি হয়েছে। আর সবই তো সুস্থ। আমি তো চোখে দেখছি তাই না। ওই দিকে চেয়ে দেখুন। লোকটির দৃষ্টিশক্তি নেই। তারপরও মনোবল আছে। সেই তুলনায় আমি তো অনেক ভালো আছি।’ নিজে থেকে বললেন,‘আমার পরিবার মনে করে একটা পা নেই বলে আমার জীবন অচল। আমি তা মনে করি না। সবাই তো পৃথিবীর সব কিছু পায় না।’ প্রশ্ন করেছিলাম যদি পা থাকতো তাহলে কি করতেন ? হেসেই খুন মেয়েটি। হাসতে হাসতে বললেন, ‘বুঝলেন না ফুটবল খেলতাম, ফুটবল’।
