তার পায়ের জাদু নিয়ে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। ইনজুরি নিয়েও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দুটি গোলই তার প্রমাণ। সেই লুইস সুয়ারেজকে মনে করা হয় সময়ের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকারদের একজন। কিন্তু কেবল ফুটবলের জন্যই নয়, মাঠে অফুটবলীয় নানা কারণেও নিয়মিতই সংবাদের শিরোনামে চলে আসেন উরুগুয়ের এই তারকা। প্রায় অসম্ভব সম্ভাবনাকে তিনি যেমন গোলে পরিণত করতে পারেন, তেমনি আবার কখনও অখেলোয়াড়সুলভ অসংখ্য আচরণ — একই মানুষের অনেক রূপ যে হতে পারে সেটা সুয়ারেজকে দেখলেই অনুমান করা যায়। লিখেছেন এ কে এম মুজিব
ইচ্ছাকৃত হ্যান্ডবল (২০১০)
২০১০ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল। ঘানার বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ের শেষ মিনিটে গোললাইনে দাঁড়িয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে হাত দিয়ে বল ঠেকিয়েছিলেন সুয়ারেজ। সেটা গোল হয়ে গেলে জিতে যেতো ঘানা। সাথে সাথেই শাস্তি পান সুয়ারেজ। লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয় তাকে। ঘানা অবশ্য পেনাল্টি থেকে গোল আদায় করতে পারেনি। শট নিতে আসা ঘানার আসোমোয়া জিয়ান বল ক্রসবারে লাগিয়ে পাঠিয়ে দেন বাইরে। খেলোয়াড়দের বের হয়ে যাওয়ার পথ দিয়ে চলে যাওয়ার সময় সুয়ারেজের উল্লাসের মত আর কোন কিছুই হয়তো এতো নিষ্ঠুর মনে হয়নি ঘানার খেলোয়াড়দের। এরপর পেনাল্টি শ্যুট আউটে ৪-২ ব্যবধানে অভাবনীয় এক জয় নিয়ে সেমিফাইনালে চলে যায় উরুগুয়ে। ম্যাচ শেষেও বিন্দুমাত্র অপরাধবোধ ছিল না সুয়ারেজের কণ্ঠে, ‘সত্যটা এখানে মূল্যহীন। বল নয়, আমি দলকে সেভ করেছি।’
কামড়ের সূচনা (২০১০)
বিশ্বকাপের বছরেই কামড়-কাণ্ডের সূচনা ঘটান সুয়ারেজ। নভেম্বর মাসে ডাচ লিগে প্রথম আয়াক্সের হয়ে খেলার সময় কামড়ে দিয়েছিলেন পিএসভি আইন্দোভেনের মিডফিল্ডার অটোমান বাক্কালকে। সেজন্য সাত ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা মাথা পেতে নিতে হয় তাকে। ডি বক্সের ভিতরে সেবারের সেই ঘটনায় মোক্ষম এক ডাক নাম পেয়ে যান সুয়ারেজ - ‘আয়াক্সের রাক্ষস!’
বর্ণবাদী আচরণ (২০১১)
বাকি সব যাই হোক না কেন গোল দেয়ার কাজটা বেশ ভালই পারেন বলে তার ডাক আসে লিভারপুল থেকে। কিন্তু ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে এসেও স্বভাব বদলালো না সুয়ারেজের। ২০১১ সালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে এক ম্যাচে ফরাসী ডিফেন্ডার প্যাট্রিক এভরাকে আট বার বর্ণবাদী গালি দিয়েছিলেন তিনি। ইংল্যান্ডের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন তাকে আট ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ ও ৬২ হাজার ডলার অর্থ জরিমানা করে। সুয়ারেজ অবশ্য আত্মপক্ষ সমর্থন করতে গিয়ে বলেন, উরুগুয়েতে এই ধরনের শব্দ ইতিবাচক অর্থে ব্যবহূত হয়। মৌসুমে আবারও যখন দুই দলের দেখা হয়, তখন এভরার সঙ্গে করমর্দনে অস্বীকৃতি জানিয়ে বিতর্কের জন্ম দেন লিভারপুল তারকা।
দ্বিতীয় কামড় (২০১৩)
পরের দু’বছর টুকটাক কুকর্ম করলেও বড় কোন ঝামেলায় জড়াননি সুয়ারেজ। মাঠেও ক্রমে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছিলেন তিনি। কিন্তু কথায় আছে না — ‘ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে!’ প্রবাদের প্রমাণ দিতেই কি না, ২০১৩ সালের ২১ এপ্রিল ঘটালেন আরেক অভাবনীয় ঘটনা। চেলসির ইভানোভিচকে আচমকা কামড়ে বসলেন! কেন ওভাবে কামড়ে ছিলেন লিভারপুল স্ট্রাইকার, সে রহস্যও পরে উন্মোচন করেছেন নিজেই। না, ইভানোভিচ কোনো উসকানি দেননি, কোনো পূর্বশত্রুতাও ছিল না তাদের মধ্যে। তাহলে কেন অমন করলেন? সুয়ারেজ জানান, কারণ কিছুই নয়, হঠাত্ই মেজাজ বিগড়ে গিয়েছিল তার! ওই ঘটনার কিছুক্ষণ আগে সুয়ারেজের হাতে বল লাগায় পেনাল্টি পেয়েছিল চেলসি। সে কারণে মেজাজ বিগড়ে গিয়েছিল তার। যার রেশ ধরে পেনাল্টি বক্সে ইভানোভিচের সঙ্গে বলদখলের লড়াইয়ে গিয়ে কামড়ে দেন তার বাহুতে। এজন্য ১০ ম্যাচ নিষিদ্ধ হয়েছিলেন লিভারপুল তারকা। এবার অবশ্য নিজের দোষ স্বীকার করেছিলেন সুয়ারেজ, ‘আমি বুঝতে পেরেছি, আমার এই ধরনের কর্মকাণ্ড ফুটবল মাঠে গ্রহণযোগ্য নয়!’
বিশ্বকাপে কামড় (২০১৪)
সুয়ারেজ খেলছেন বিশ্বকাপ, আর সেখানে কোন অপকর্ম হবে না, তা কি করে হয়? নিজের নামের প্রতি সুবিচার করতে কি না নিজেই এগিয়ে এলেন সুয়ারেজ। ইতালির বিপক্ষে গত মঙ্গলবার নাতালে দেখা গেল তার তৃতীয় কামড়-কাণ্ড! ৭৯ মিনিটে ইতালির ডিফেন্ডার জর্জিও চিয়েলিনির কাঁধে কামড় বসিয়ে দিয়েছেন উরুগুয়ের এই স্ট্রাইকার। এই ঘটনার পর ফুটবল বিশ্বে উঠেছে বিতর্কের ঝড়। এবারও সুয়ারেজ নিজের আত্মপক্ষই সমর্থন করছেন, ‘মাঠে এরকম ঘটনা ঘটতেই পারে। তার কাঁধে আমার দাঁত লেগেছে। এর বেশি কিছু না।’ অধিনায়ক ডিয়েগো গডিনও আছেন সুয়ারেজের পক্ষেই, ‘আমি কিছুই দেখিনি। তাই এই ব্যাপারে আমার পক্ষে এখন মন্তব্য করা সম্ভব নয়।’ তবে, ফিফার তদন্তের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন সুয়ারেজ। বিবিসি রেডিও ফাইভ লাইভকে ফিফার কর্মকর্তা মিশেল ডি’হজ জানিয়েছেন ঘটনাটাকে গুরুত্বের সাথেই দেখছে ফিফা, ‘খুব সম্ভবত সুয়ারেজকে শুনানির মুখোমুখি হতে হবে। খেলাটা ফুটবল। এর সাথে কামড় দেখার কোন সম্পর্ক আমরা খুঁজে পাই না।’
