সা ক্ষা ত্ কা র

‘একজন মানুষের জাতিসত্তার পরিচয় আগে’

আপডেট : ২৬ জুন ২০১৪, ১৯:৩৫
সেলিনা হোসেন আমাদের বর্তমান কথাসাহিত্যের অন্যতম প্রধান কথাশিল্পী। তিনি লিখে চলেছেন প্রায় পাঁচ দশক ধরে। তাঁর লেখালেখির একটি প্রধান অংশ জুড়ে রয়েছে দেশভাগ। দেশভাগ তাঁর লেখনিতে একটি ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। সাতচল্লিশের দেশভাগের ফলে সৃষ্ট নানা মানবিক বিপর্যয় এবং আন্তঃরাষ্ট্র সম্পর্ক তাঁর লেখায় উঠে এসেছে সমাজের প্রতিচিত্র হয়ে। এর বাইরে তাকালে দেখা যায়, সেলিনা হোসেনের লেখায় রয়েছে বাংলাদেশের মানুষ, তার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। তাঁর সৃষ্ট চরিত্রকে আমরা দেখি দেশভাগের যন্ত্রণায় দগ্ধ হয়ে পরিচয় সংকটে ভুগতে। আবার দেখি একটি বিশেষ জাতীয় পরিচয়ের জন্য জীবন দিতে। তাঁর লেখালেখিতে দেশভাগ, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন এবং একাত্তরের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বাধীনতাকে দেখি একই সূত্রে আবদ্ধ। ইতিহাসকে কেন্দ্র করে যেমনি তিনি রচনা করেছেন ঐতিহাসিক উপন্যাস, তেমনি রয়েছে নানা মিথকে আশ্রয় করে রূপক উপন্যাস। বাংলার লোক-পুরাণের উজ্জ্বল চরিত্রসমূহ আমরা দেখি তাঁর লেখনিতে নতুন এক উপস্থিতি জানান দেয়। যা বিষয় ও বৈশিষ্ট্য বিচারে একান্তই সেলিনা হোসেনের নিজস্ব স্টাইলের ঘোষণা করে। সেলিনা হোসেনের লেখালেখির পরিমাণ বিপুল এবং বিষয় বৈচিত্র্যে ভরপুর। কেবল কথাসাহিত্যেই নয়, শাণিত ও শক্তিশালী গদ্য নির্মাণেও রয়েছে তাঁর অসামান্য অবদান। তাঁর লেখা গল্প ও উপন্যাস ইংরেজি, হিন্দি, মারাঠি, কানাড়ি, রুশ, মালে, ফারসি প্রভৃতি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। সেলিনা হোসেনের সাথে কথোপকথনে উঠে এসেছে তাঁর কয়েকটি উপন্যাস রচনার পেছনের কথা। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন—এহ্্সান মাহ্মুদ এহ্্সান মাহ্মুদ : আপনার জন্ম দেশভাগের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে। দেশভাগ নিয়ে আপনার কোনো স্মৃতি রয়েছে কিনা? সেলিনা হোসেন : আমার জন্ম দেশভাগের উত্তাল দিনগুলোতে। তখন আমাদের পরিবার ছিল রাজশাহীতে। ঠিক দেশভাগের স্মৃতি বলতে যা বোঝায় তা আমার নেই। তবে দেশভাগের ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে আমার দুটি প্রত্যক্ষ স্মৃতি রয়েছে যা উল্লেখ করা যেতে পারে। আমার বাবার ছিল বদলির চাকরি। দেশভাগের পরে বাবা বদলি হয়ে বগুড়াতে চলে আসেন। সাথে আমাদের পুরো পরিবারও। বগুড়াতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করার পরে আমাকে ভিএম স্কুলে ভর্তি করানো হয়। সেখানে ছন্দা নামে আমার একজন ঘনিষ্ঠ বান্ধবী ছিল। আমরা দুজন ছিলাম খুবই অন্তরঙ্গ বন্ধু। আমরা স্কুলে গিয়ে একসাথে বসতাম। একসাথে খেলতাম। টিফিনের সময়ে একসাথে খাবার খেতাম। একদিন স্কুলে গিয়ে দেখি ছন্দা আসেনি। ভাবলাম কোনো কারণে হয়তো আসেনি। কিন্তু পরের দিনও স্কুলে গিয়ে দেখি ছন্দা আসেনি। এভাবে কয়েকদিন যাওয়ার পরে ওদের বাড়িতে খোঁজ নিই। পরে ওদের পাশের বাড়ির লোকজনের কাছ থেকে জানতে পারি ওদের পুরো পরিবার ইন্ডিয়াতে চলে গেছে। আমার বিশ্বাসই হচ্ছিল না যে ছন্দা আমাকে না বলে চলে যেতে পারে। আমার মনে প্রশ্ন জেগেছিল—তবে কি ছন্দা আমাকেও বিশ্বাস করতে পরেনি? আমাকে বলে গেলে কি ওদের পরিবারের কোনো সমস্যা হতো ? ওর মনে কি কোনো ভয় ছিল? এমনি চিন্তা আমাকে এখনো কষ্ট দেয়। পরবর্তী সময়ে বুঝতে পারি দেশভাগের জন্যই এমনটি হয়েছিল। দেশভাগ মানুষকে এমনি করে বদলে দিতে পারে সেটা ছন্দাদের পরিবার এভাবে চলে না গেলে কখনো আমার জানা হতো না। দেশভাগের ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতির সৃষ্ট আরেকটি স্মৃতি আমি উল্লেখ করতে পারি। দেশভাগের পরে বাবার কলিগের এক আত্মীয় চলে এসেছিল মালদহ থেকে। তার ছিল তিনটি ছেলে। তার কোনো ছেলেই পড়াশোনা করত না। স্কুলে যেত না। ঘরের ছেলেদেরকে দিয়ে তারা কাজের লোকের মতো কাজ করাতো। কারণে অকারণে তাদের মারধর করত। একদিন সোহরাব নামের বড় ছেলেটিকে তার বাবা গরু বাঁধার খুঁটা দিয়ে প্রচণ্ড মারধর করে। এর পরের দিন সবাই ছেলেটিকে আবিষ্কার করে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের পেয়ারা গাছের সাথে গলায় ফাঁস লাগানো অবস্থায়। ওরকম ভয়াবহ মৃত্যু আমি আর দেখিনি। প্রশ্ন : আমাদের অন্যান্য লেখকদের ক্ষেত্রে দেশভাগ বিষয়টি যেভাবে এসেছে, যেমন—মাহমুদুল হকের ‘কালো বরফ’-এর কথা বলা যেতে পারে। জীবনস্মৃতি নিয়ে আপনার এমন কোনো লেখা রয়েছে কিনা? উত্তর : আমার জন্ম তো দেশভাগের সময়ে। তখন আমার যে বয়স ছিল তাতে করে জীবনস্মৃতি থাকার কথা না। তাই দেশভাগের ঘটনা নিয়ে হাসান আজিজুল হক বা মাহমুদুল হকের যেমন জীবনস্মৃতি রয়েছে আমার তা নেই। দেশভাগের সময়টির মধ্য দিয়ে তাঁরা এসেছেন। তাই তাঁদের লেখায় সেসব বিষয় এসেছে। আমার লেখার ক্ষেত্রে যেটি হয়েছে—দেশভাগের ফলে সৃষ্ট নানা ঘটনার বর্ণনা, কার্যকারণ এবং আমার পাঠ ও পরিস্থিতি বিশ্লেষণ এবং অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। প্রশ্ন : কিন্তু আমি দেখেছি যে, আপনার চারটি উপন্যাস ‘যাপিত জীবন’, ‘গায়ত্রী সন্ধ্যা’, ‘ভূমি ও কুসুম’ এবং ‘সোনালী ডুমুর’-এ দেশভাগ বিভিন্নভাবে উঠে এসেছে। উত্তর : হ্যাঁ দেশভাগ নিয়ে আমি আমার উপন্যাসে বেশি কাজ করেছি। আমার কাছে মনে হয়েছে দেশভাগের সম্প্রসারণই হচ্ছে ভাষা আন্দেলন এবং এর ধারাবাহিকতায় স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্যদিয়ে স্বাধীনতা লাভ। আমার ‘যাপিত জীবন’ উপন্যাসে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন নিয়ে কাজ করেছি। উপন্যাসের জাফর চরিত্রটি শহীদ বরকতের ছায়া অবলম্বনে নির্মাণ করেছি। যেখানে উপন্যাসের নায়ক পরিবারের সঙ্গে দেশভাগের ফলে মালদহ থেকে ঢাকায় চলে আসে। ‘গায়ত্রী সন্ধ্যা’ উপন্যাসে মুর্শিদাবাদ থেকে চলে আসা একটি পরিবারের কথা বর্ণিত হয়েছে। এখানে নায়ক আলী আহম্মদ যে পরিচয় সংকটে পড়ে তা তুলে ধরেছি। এর মধ্য দিয়ে রিফিউজি কিভাবে তার আইডেনটিটি তৈরি করেছে তা তুলে ধরেছি। দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভাগ হওয়া দেশে সে প্রথমে বাঙালি, পরে মুসলমান। একজন মানুষের জাতিসত্তার পরিচয় আগে, তারপরে তার ধর্মীয় পরিচয়। উপন্যাসের নায়ক আলী আহম্মদ নিজের পরিচয় গড়ে তোলার পর তাকে বাঙালি হওয়ার অপরাধে একাত্তরে পাকিস্তানি সেনাাহিনী খুন করে। উপন্যাসে ’৪৭ থেকে ’৭৫ পর্যন্ত সময়টি তুলে ধরেছি। ‘ভূমি ও কুসুম’ উপন্যাসে দেখিয়েছি দেশভাগের ফলে সৃষ্টি হওয়া ছিটমহল সমস্যার কথা। দেশভাগ না হলে ছিটমহলের সৃষ্টি হতো না। ছিটমহলের ফলে আন্তঃরাষ্ট্র সমস্যার সূচনা হয়। মানুষের মানবেতর জীবনযাপনের গল্প বর্ণিত হয়েছে ‘ভূমি ও কুসুম’ উপন্যাসে। ‘সোনালী ডুমুর’ উপন্যাসটিও দেশভাগের পটভূমিতে লেখা। এখানে ’৪৬ সালে দাঙ্গার পরে শান্তি মিশন নিয়ে মহাত্মা গান্ধী যে নোয়াখালীতে এসেছিলেন তার উল্লেখ আছে। শত্রু-সম্পত্তি আইন কিভাবে হিন্দু জনগোষ্ঠীকে পীড়িত করেছে তা উঠে এসেছে। আন্তঃরাষ্ট্র সম্পর্ক কিভাবে জনজীবনকে নিপীড়ন করে তাও গল্পের মধ্যে এসেছে। প্রশ্ন : কিন্তু আমাদের এখানে দেশভাগ নিয়ে যেসব লেখা রয়েছে তাতে দেখা যায় বেশিরভাগই এপার থেকে ওপারে চলে যাচ্ছে। সেই জায়গায় ‘সোনালী ডুমুর’কে আমি দেখি ভিন্নভাবে। এই উপন্যাসের হিন্দুরা যেতে চাইনি ওপারে... উত্তর : দেশভাগের সময় ওপারে না গিয়ে নিজের ভূমি আঁকড়ে পড়ে ছিল এমন ঘটনা নিশ্চয়ই আছে। এই উপন্যাসে ডা. নন্দীর কথা বলা যেতে পারে। যিনি নিজের ইচ্ছায় দেশ ত্যাগ করেননি। তার বাড়ি শত্রু-সম্পত্তির অধীনে দখল করে তাকে চলে যেতে বাধ্য করে। প্রশ্ন : আপনার ‘ঘুম কাতুরে ঈশ্বর’ উপন্যাসে নারী-পুরুষ সম্পর্কটি যেভাবে উঠে এসেছে তাতে আমরা অভ্যস্ত নই। বিশেষ করে একজন স্বামী তার স্ত্রীকে একরাতের জন্য গণিকাবৃত্তি করে উপার্জন করতে বলে। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য জানতে চাচ্ছি... উত্তর : ঘুমকাতুরে ঈশ্বর চরজীবনের পটভূমিতে লেখা। হতদরিদ্র মানুষের দিনযাপনের চিত্রই এখানে তুলে ধরেছি। আর আমরা যেটি শুনে বা দেখে অভ্যস্ত সেটি হচ্ছে পতিতাবৃত্তি করে তৃণমূলের সেসব নারীরা যারা স্বমী পরিত্যাক্ত। অর্থ উপার্জনের জন্য বা বেঁচে থাকার জন্য তারা নিজের দেহ বিক্রি করে। আর আমি এখানে দেখিয়েছি যে একজন স্বামী তার স্ত্রীকে বলছে, একরাতের জন্য গণিকাবৃত্তি করে তাদের ঘরে চাল জোগাড় করার জন্য। তখন স্ত্রী বলে, আমাদের ভালোবাসা? স্বামী স্ত্রীকে বুঝিয়ে বলে, আমাদের ভালোবাসা ঠিকই থাকবে, আবার আমরা একসাথে থাকব। তুমি কেবল একটি রাতের জন্য তোমার দেহ বিক্রি করে ক্ষুধা মেটাবার জন্য প্রয়োজনীয় চালের ব্যবস্থা করো। এই যে একজন পুরুষের আর নারীর সম্পর্ক এর মাধ্যমে বেঁচে থাকার জন্য নারীও যে অবলম্বন হতে পারে সেটি দেখিয়েছি। নারী-পুরুষের সম্পর্কের প্রথাগত বেড়ি ভাঙার চিত্র দেখিয়েছি। পুরুষতন্ত্রের আধিপত্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছি। প্রশ্ন : আপনার ‘চাঁদবেনে’ উপন্যাসে আমরা একটি মিথের ব্যবহার লক্ষ করি। যেখানে আপনি চাঁদ সওদাগরের মিথটি ব্যবহার করেছেন। কিন্তু এই মিথটিকে সাহিত্যে পরিবর্তিত করে কী অর্থ বোঝাতে চেয়েছেন? উত্তর : তুমি ঠিকই ধরেছো এহ্্সান। ‘চাঁদবেনে’ উপন্যাসে আমি চাঁদ সওদাগর আর মনসা দেবীকে নিয়ে যে মিথটি রয়েছে সেটিকে ব্যবহার করেছি। গল্পে চাঁদ সওদাগর দেবী মনসাকে পুজো দিতে অস্বীকৃতি জানায় বলে তার সপ্তডিঙা ডুবিয়ে দেয়। মনসা দেবীর চরিত্রটি হচ্ছে শোষকের আর চাঁদসওদাগরের চরিত্রটি হচ্ছে প্রজার। আর চাঁদবেনে উপন্যাসে এটিকেই রূপকে পরিবর্তন করে দেবী মনসারূপী মহাজনকে হাজির করা হয়েছে। অপরদিকে প্রতিবাদী চাঁদ সওদাগরের চরিত্রকে প্রতিবাদী কৃষকরূপে দেখানো হয়েছে। যুগ যুগ ধরে মহাজনেরা কৃষকদের নিপীড়ন এবং শোষণ করে আসছে এই গল্পই ‘চাঁদবেনে’। প্রশ্ন : ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ উপন্যাসে দেখি একজন মা তার প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিশ্চিত মৃত্যুর কথা জেনেও পাকবাহিনীর হাতে তুলে দিচ্ছেন। এখানে মায়ের এই চরিত্রটির দ্বারা কী বোঝাতে চেয়েছেন? ব্যাখা করবেন... উত্তর : উপন্যাসটি মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে একজন নারীর গল্প। উপন্যাসের নায়িকা বুড়ি। তার একটি সন্তান প্রতিবন্ধী। যুদ্ধের সময় দুজন মুক্তিযোদ্ধা তাদের কাছে আশ্রয় চায়। কারণ একটা ক্যাম্প আক্রমণ করে তারা পরাজিত হয়ে পালিয়ে আসে। পেছনে তাড়া করে পাকসেনারা। পাকসেনারা বুড়ির ঘরের দরজায় ধাক্কা দিলে তার মনে হয় স্বাধীনতা লাভ করতে হলে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ ক্ষেত্রে ফেরত পাঠাতে হবে। প্রতিবন্ধী ছেলেটা তো যুদ্ধ করতে পারবে না। এই চিত্রই ছিল মুক্তিযুদ্ধকালীন রিয়ালিটি। একজন নারী সেই সময়টিকে নিজের মতো করে নিয়ন্ত্রণ করেছেন।