আমাদের পৈতৃকবাড়ি চাঁদপুরে হলেও বাবার সরকারি চাকরির সুবাদে দেশের বিভিন্ন জায়গায় থাকতে হতো। বাবা ছিলেন রেলওয়ের বড় চিকিত্সক। ছোটবেলায় কোনো এক রেলওয়ে ইনস্টিটিউটে বড় লাইব্রেরিতে ঢুকে পড়ি। পড়তে শুরু করি ডিটেকটিভ বই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলে যেত। তবু পড়ার মোহ কাটত না। আমরা তিন ভাই, এক বোন সবাই মিলে পড়তাম—মোহন সিরিজ, লহরীসহ এ ধরনের বিভিন্ন আকর্ষণীয় বই। খুবই ভালো লাগত। যখন যা পেতাম সব পড়তাম। এভাবে একদিন বইসংসারী হয়ে যাই। পরে যখন পঞ্চাশের দশকে কলেজ পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখি, তখন তো রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনসহ গোটা বিশ্বে আন্তর্জাতিকতার আবহাওয়া বিরাজমান। সকলে টিএস এলিয়টসহ, মার্ক্স, লেনিন পড়ছে। যুক্ত হচ্ছে প্রগতিশীল ধারা। সে সময় রণেশ দাশ গুপ্ত, মুনীর চৌধুরী এঁরা ছিলেন এ ধারায়। পড়তে শুরু করি ‘পরিচয়’, ‘নতুন সাহিত্য’, ‘ব্যাঙ’ পত্রিকা, ‘অচলপত্র’সহ ফজলে লোহানীর ‘অগত্য’। নিয়মিত যেতাম সওগাত পত্রিকার পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ মাসিক আড্ডায়।
রহস্য সিরিজের পরে যে বইটি প্রথম পড়ি—এরিক মারিয়া রেমার্ক-এর যুদ্ধবিষয়ক উপন্যাস থ্রি কমরেড্স। এছাড়াও রেমার্ক-এর ‘অল কোয়াইট অন দ্যা ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’, ‘আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ‘ফেয়ার ওয়েল টু আর্মস’ খুব প্রিয় ছিল। প্রিয় ছিল বাংলা সাহিত্যের রবীন্দ্রনাথের ‘শেষের কবিতা’, মানিকের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’, অচিন্ত্য কুমার সেনগুপ্তের ‘কল্লোলযুগ’, নীহার রঞ্জন রায়ের ‘বাঙালির ইতিহাস’, সুধীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দের রচনা। তবে তখনো পর্যন্ত নজরুল পড়িনি। অথচ আজ নজরুলের কাজে ব্যস্ত সময় কাটে।
২০১৪ সালে আমার সবচেয়ে বড় কাজ বাংলা একাডেমি থেকে আসছে ‘নজরুল ইনডেক্স’ যার বাংলায় নাম দিয়েছি ‘নজরুল নির্দেশিকা’র দ্বিতীয় সংস্করণ। সাহিত্যপ্রেমী মানুষ বা নজরুলপ্রেমীরা এক নিমেষে এক মলাটে জাতীয় কবির সবকিছুই পেয়ে যাবেন। সম্প্রতি বাংলা একাডেমি থেকে আসছে আমার ‘প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যাহারিক ব্যাকরণ’।
মূলত বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে আমার সিরিয়াস কাজগুলো হয়। ষাটের দশকে সাংস্কৃতিক আন্দোলনে প্রচুর সময় ব্যয় এবং ভাষাবিজ্ঞানে পড়াশোনা করে শিক্ষকতা শুরু করি। তারপর সময়ের পরিক্রমায় ঢাবিতে শিক্ষকতার শেষ প্রান্তে এসে ইউল্যাবের শুরু থেকে দায়িত্ব পালন করে আসছি। তবে ঢাবিতে এখনো সপ্তাহে একটা ক্লাস নিই। সম্প্রতি ইউল্যাবে শুরু করেছি নতুন ধারার ইলেক্টিভ কোর্স। এখান থেকে আমরা প্রথম আলোচিত যে কাজটি এবার করেছি রবীন্দ্রনাথের ‘গীতাঞ্জলী’র ওপরে, সেটির নাম—Centenary of Rabindranath’s Nobel Prize ‘Gitanjali’।
আমি বর্তমানে নজরুল ইনস্টিটিউটের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান। এখানে নিয়মিত অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করাসহ প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনায় যুক্ত থাকতে হয় আমাকে। করতে হয় টিভি চ্যানেলে প্রোগ্রাম। গত পাঁচ বছর নিয়মিত করছি নজরুলের গানের অনুষ্ঠান ‘গীতিশতদল’ নামে। এটি প্রচার হচ্ছে বিটিভিতে প্রতিমাসে দুইবার, প্রথম এবং শেষ রবিবার রাতে।
লেখক :ভাষাবিদ ও নজরুল গবেষক
গ্রন্থনা :ইমরান মাহফুজ
