আহসান মালেক, নাসের মাহমুদ, বিলু কবীর, শফিক ইমতিয়াজ, আলী হাবিব—এই পাঁচ সৃজনশীল ব্যক্তির সৃষ্টিকর্মের সংগ্রহ নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে তিনখণ্ডের ‘পঞ্চপাণ্ডব’। এঁদের আলাদা করে প্রকাশিত গ্রন্থ রয়েছে; আর এঁরা প্রত্যেকেই পত্রপত্রিকার সঙ্গে জড়িত। কেউ কেউ সাংবাদিকতায় দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করেছেন। যেমন, আলী হাবিব। তবু প্রশ্ন জাগে তাঁদের সৃষ্টিকর্মের জনপ্রিয়তা কতটুকু; সাহিত্যে ছড়ার গুরুত্ব ফিকে হয়ে গেছে কি? বিশেষত কথাসাহিত্যের ব্যাপক জনপ্রিয়তার যুগে যেখানে কবিতা আর তেমন পঠিত হচ্ছে না সেখানে ছড়া রচনায় নিবেদিত এই পাঁচজনের সৃষ্টিকর্মের পাঠক কতজন সে সম্পর্কে আমাদের প্রশ্ন জাগাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মনে রাখা দরকার সাহিত্যের একটি আঙ্গিক কোনো কোনো সময় বেশি জনপ্রিয় হলেও অন্যান্য আঙ্গিকের চর্চা থেমে থাকেনি কখনো। বরং বলা যায়, কম পাঠক নিয়েও সেই আঙ্গিক সাহিত্যের একটি অনিবার্য রূপ হিসেবে টিকে থাকে। ছড়ার ক্ষেত্রে বাস্তবতা ঠিক এরকম নয়, কিন্তু অনেকটা সে পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। অথচ সাহিত্যের রূপকল্পে এই আঙ্গিকটি প্রাচীন। ‘পঞ্চপাণ্ডব’-এর প্রথম খণ্ডের ফ্ল্যাপে লিখিত বক্তব্য এজন্যই তাত্পর্যবহ : ‘সাহিত্যের এক প্রাচীন ও সমৃদ্ধ শাখা ছড়া। লোকসাহিত্যকে এর আদি উত্স ধরে নেওয়া হলেও আজকের দিনে ছড়া সম্পূর্ণ আধুনিক। একসময়ে ব্রাত্য মনে করা হলেও পাঠকপ্রিয়তা ছড়াকে নিয়ে এসেছে সামনের কাতারে। স্পষ্ট বক্তব্য, ছন্দের ঝংকার, সহজবোধ্যতা, অন্ত্যমিলে অভাবিত ও চমকপ্রদ আধুনিক শৈলী ছড়াকে পাঠকপ্রিয় করেছে।’ একথা যথার্থ যে ছড়াকে একসময় ছেলে ভুলানো, ঘুম তাড়ানো ‘শোলক’ হিসেবে গণ্য করা হতো। কিন্তু কালের বিবর্তনে বাংলা ছড়া বিশেষ মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়েছে। আমাদের স্বাধিকার আন্দোলনে, মিছিলের স্লোগানে কিংবা মুক্তিযুদ্ধের ময়দানে ছড়া হয়ে উঠেছিল একটি ধারাল শিল্প আঙ্গিক। তারপর সামরিক স্বৈরশাসকের আমলের অবিচার কিংবা সামাজিক অসঙ্গতিকে ব্যঙ্গ করে ছড়া রচিত হয়েছে বিস্তর। এমনকি প্রেম-ভালোবাসা, সেখানেও ছড়ার হালকা চাল অভিনন্দিত হয়েছে। আহসান মালেক, নাসের মাহমুদ, বিলু কবীর, শফিক ইমতিয়াজ, আলী হাবিব—এই পাঁচজন ছড়ার সেই গৌরবময় ভূমিকাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তাঁদের যৌথ প্রয়াস ‘পঞ্চপাণ্ডব’ বিচিত্র বিষয়ের ছড়ার সংকলন হিসেবে ইতোমধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
এই পাঁচজনের ছড়ায় ব্যক্ত হয়েছে মানুষের সংগ্রামী জীবনের নানা কথা। তাঁদের রয়েছে গরিবদুঃখী মানুষের প্রতি দরদ আর একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে সাহসী নানা উচ্চারণ। মানুষের প্রতি অন্যায় অত্যাচার শোষণ তাঁরা সহ্য করতে পারেননি। তাই প্রতিবাদ করেছেন, দাবি আদায়ের জন্য মানুষকে সংঘবদ্ধ করে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন ছড়ার মাধ্যমে। মানবতার জয় ঘোষণা এঁদের জীবনের অন্যতম ব্রত। কোনো কোনো ছড়াকার স্বাধীনতার ধারাবাহিক আন্দোলন, বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধকে মহিমান্বিত করেছেন। অসাধু সমাজপতিদের ব্যঙ্গ করেও ছড়া লিখেছেন তাঁরা। সিরিয়াস বিষয়ের পাশে শিশু-কিশোরদের জন্য লিখিত ছড়াগুলোতে সর্বজনীনতার স্বাদ রয়েছে। এদিক থেকে সেগুলো উত্কৃষ্ট রচনা। কারণ ‘মৌলিক শিশুগ্রন্থ তখনই উত্কৃষ্ট হয়, যখন তাতে সর্বজনীনতার স্বাদ থাকে।’ অর্থাত্ এঁরা ঠিক ছোটদের মতো করেই বলতে পারেন। ছোটরা নিজেরা যেরকম করে বলবে সেরকম অবশ্য নয়। কিন্তু যেমন বললে তাদের মনে হবে যে তাদের মতোই বলা হচ্ছে, ঠিক তেমনি করেই বলতে পারেন এসব ছড়াকাররা। অনেকগুলো ছড়া রচিত হয়েছে কৌতুক করে; সরস ব্যঞ্জনায়। প্রত্যেক ছড়াকারের সৃষ্টি ধরে ধরে উদ্ধৃতি দিলে এই আলোচনাটি দীর্ঘ হবে তাই পাঠককে অনুরোধ করছি ‘পঞ্চপাণ্ডব’ গ্রন্থ থেকে সেগুলো পড়ে নিতে।
বস্তুত বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে যোগ্য কারিগর হচ্ছেন আহসান মালেক, নাসের মাহমুদ, বিলু কবীর, শফিক ইমতিয়াজ, আলী হাবিব—এই পাঁচ ছড়া লিখিয়ে। তাঁদের হাতে বাংলা সাহিত্যের সনাতন ছড়া নতুন করে জেগে উঠেছে। আধুনিক কবির হাতে ছড়া বেরোতে পারে শুধু এই শর্তে যে, তাতে তিনি বক্তব্য কিছু দেবেন, অথচ সেটুকুর বেশি দেবেন না যেটুকু এই হালকা ছোটো চটুল শরীরে ধরে যায়। একেবারে সারাংশ কিছু না থাকলে তা নেহাতই শব্দের টুংটাং হয়ে পড়ে, আবার মাত্রা একটু বেশি হলেও ছড়া আর থাকে না। পঞ্চপাণ্ডব দু-দিকই ঠিক সামলে চলেছেন, তাঁদের ছড়ার একরত্তি রূপের মধ্যে একটি ফোঁটা বস্তুও তাঁরা বসিয়ে দেন, সঙ্গে দেন কৌতুকের সেই আমেজটুকু, যার স্বাদ জিভে লেগে থাকে। মূলত অন্ত্যমিলের কারুকাজ, ছন্দের নৈপুণ্য ও গঠনশৈলীর আধুনিকতায় ‘পঞ্চপাণ্ডব’ একটি ভিন্নস্বাদের ও অনবদ্য ছড়া সংকলন। আজকের দিনে ছড়ার আবেদন কোনোভাবেই খাটো করে দেখার উপায় নেই। কারণ, মানুষের আবেগের সহজ প্রকাশ ছড়ার ভেতর দিয়ে। ‘পঞ্চপাণ্ডব’ সংকলনে ছড়ার সেই সহজ প্রকাশটি উত্তরোত্তর জনপ্রিয় হয়ে উঠবে বলে আমাদের বিশ্বাস।
পঞ্চপাণ্ডব-১, ২, ৩ (আহসান মালেক, নাসের মাহমুদ, বিলু কবীর, শফিক ইমতিয়াজ, আলী হাবিব), আদিগন্ত প্রকাশন, ঢাকা, প্রকাশকাল : ২০১২, ২০১৩,২০১৪, প্রচ্ছদ : বিপ্লব চক্রবর্তী, দেওয়ান আতিকুর রহমান, মূল্য : ১৫০, ১২৫ ও ১৫০ টাকা।
