আহলান সাহলান স্বাগতম হে রমজান। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও আত্মশুদ্ধি ও খোদাতা’য়ালার নৈকট্যের পয়গাম নিয়ে মুসলিম মিল্লাতের দুয়ারে এসেছে মাহে রমাদান। এক মাস সিয়াম সাধনার পর রোজাদারের ঈদের খুশির মত এত আনন্দের আর কোন অনুষ্ঠান জগতে নেই। রোজার আভিধানিক অর্থ উপবাস। আরেক অর্থ জ্বালিয়ে দেয়া, পুড়িয়ে দেয়া। আর সিয়াম শব্দটি এসেছে ‘সাওম’ থেকে, যার অর্থ বিরত থাকা। উষাকালের সামান্য পূর্ব থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সব ধরণের আহার ও কামাচার থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকাকে রোজা বলে। সুফিগণের মতে, সারাদিন উপোস থেকে নফসকে দূর্বল করে সর্বাবস্থায় আপন কলবে সমস্ত খেয়ালকে ডুবিয়ে রেখে স্রষ্টার ফায়েজ অন্তরে ধারণ করে জীবাত্মাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে পরমাত্মাকে বিকশিত করাই হাকিকতে রোজা। মোট কথা প্রকৃত রোজাদার জাহেরী হাত, পা, মুখ, চোখ ও দেহকে যেমনি সংযত করবে ঠিক তেমনি বাতেনী হাত, পা, চোখ, মুখ ও দেহ ইত্যাদিকেও সংযত করবে। এটাই রোজার শিক্ষা। ইসলামের অন্যসব আমলসমূহের মধ্যে রোজা হলো গোপন ইবাদত। কেউ রোজা না রেখে ‘হ্যাঁ’ বললেও বোঝার কোন উপায় নেই। তাই এটি কেবল আল্লাহ পাকের ভয় ও সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যই। আর সেজন্য আল্লাহ পাকও এ আমলের জন্য বরাদ্দ রেখেছেন বড়। হযরত সাহল ইবনে সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, বেহেশতে ‘রাইয়ান’ নামে একটি দরজা আছে। এই দরজা দিয়ে প্রবেশের জন্য রোজাদারদের ডাকা হবে। যারা রোজাদার তারা এই দরজা দিয়ে (বেহেশতে) প্রবেশ করবে। আর যে ব্যক্তি তাতে প্রবেশ করবে সে আর কখনও পিপাসিত হবে না” (তিরমিযী শরীফ)। হযরত আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত। রসূলে পাক (স.) বলেন, “যখন রমজান আসে তখন বেহেশতের দরজা সমূহ খুলে দেয়া হয়। দোজখের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয় এবং শয়তানকে জিঞ্জিরাবদ্ধ করে রাখা হয়” (মুসলিম শরীফ)। অন্যত্র রসূল পাক (স.) বলেছেন, “রোজা হল ঢাল সদৃশ”। অর্থাত্ রোজাই হবে জাহান্নাম থেকে বাঁচার অবলম্বন। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে আরও বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলে পাক (স.) এরশাদ করেছেন, “বান্দার প্রত্যেক আমল দশগুণ হতে সাতশতগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করে দেয়া হয়। আল্লাহ বলেন, রোজা আমার জন্য, আমি নিজেই এর প্রতিদান দেবো। কারণ সে আমারই উদ্দেশ্যে তার যৌনাচার এবং পানাহার পরিত্যাগ করে। রোজাদার ব্যক্তির জন্য দুটি খুশি। এক. ইফতারের সময় আর অপরটি হল তার প্রতিপালকের সাথে সাক্ষাত। রোজার কারণে মুখে যে দুর্গন্ধ হয় তা আল্লাহর নিকট কস্তুরির সুঘ্রাণের তুলনায়ও বেশি উত্তম”(মুসলিম শরীফ)। হযরত ইবন সালিম আল মুকাফফা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, “নবী করিম (স.) ইফতারের সময় বলতেন, তৃষ্ণা নিবারিত হয়েছে, শিরা-উপশিরা পরিতৃপ্ত হয়েছে এবং আল্লাহ ইনশাল্লাহ বিনিময় নির্ধারিত হয়েছে” (আবু দাউদ)। নবীজি (স.) জলদি জলদি ইফতার করার তাগিদ দিয়েছেন। হযরত আবু আতিয়্যাহ (রা.) বলেন, আমি ও মাসরুক (রা.) হযরত আয়েশা (রা.) এর নিকট গিয়ে তাঁকে বললাম, হে- উম্মুল মুমিনীন! মুহাম্মদ (স.) এর সাহাবীদের দু’ব্যক্তির মধ্যে এক ব্যক্তি ইফতারে ও নামাজে তাড়াতাড়ি করে এবং অপর ব্যক্তি ইফতার ও নামাজে বিলম্ব করে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, যে ইফতার ও নামাজে তাড়াতাড়ি করে, সে কোন ব্যক্তি? আমরা বললাম, তিনি আবদুল্লাহ মাসউদ (রা.)। তিনি বললেন, রসূলে পাক (স.) এরূপই করতেন” (মুসলিম শরীফ)। রোজার আরেকটি কর্মসুচি হল সেহরী খাওয়া। রাসুলে পাক (স.) এরশাদ করেছেন, “তোমরা সেহরী খাও। কেননা তাতে বরকত আছে।” অথচ এরশাদ হয়েছে, “আর তোমরা পানাহার কর যতক্ষণ না কালো রেখা থেকে ভোরের সাদা রেখা পরিষ্কার দেখা যায়। তারপর রোজা পূর্ণ কর রাত পর্যন্ত” (সুরা বাকারা : ১৮৭)। প্রকৃত রোজাদার কটু বাক্য, ঝগড়া-ঝাটি, খারাপ আচরণ, মানুষ ঠকানো, ঘুষ-দূর্ণীতি, চুরি, পরনিন্দাসহ সকল প্রকার রীপুর তাড়নামুক্ত থাকার চেষ্টা করে। রাসুলুল্লাহ (স.) এরশাদ করেছেন, “পাঁচটি বিষয় রোজাদারের রোজা বিনষ্ট করে দেয়- মিথ্যা বলা, কুটনামি করা, পশ্চাতে পরনিন্দা করা, মিথ্যা শপথ করা এবং খারাপ দৃষ্টিতে তাকানো।” নবীপাক (স.) এও বলেছেন, “রোজার দিনে কেউ তোমার সঙ্গে ইচ্ছে করে ঝগড়া করতে উদ্দ্যত হলে অথবা গালমন্দ করলে তাকে দুবার বলো আমি রোজাদার”(বোখারি শরীফ)। শুধুমাত্র উপোস ও কামাচারমুক্ত থাকলে রোজার প্রকৃত স্বাদ আস্বাদন করা যায় না। সঠিকভাবে রোজা পালনের জন্য আত্মশুদ্ধির পথ অন্বেষণ করা দরকার। আর আত্মশুদ্ধির একমাত্র পথ হলো অলিআল্লাহগণের তরীকা। কারণ কলবের কালিমা দূর করে আমরা যদি মোমেন হতে না পারি, তবে হাকীকতে রোজা পালন করা সম্ভব হবে না। আর আল্লাহর নৈকট্যও অর্জন হবে না। কাজেই রোজার পুরষ্কার যেন হয় আল্লাহকে লাভ করা।
