শুরু হচ্ছে মুসলমানদের বহু কাংখিত পবিত্র সিয়াম সাধনার মাস মাহে রমজান। এই মহাপবিত্র মাসে বাংলাদেশসহ বিশ্বের কোটি
কোটি ধর্মপ্রান মুসলমানগণ রোজা পালন করে থাকেন। অনেক অসুস্থ ব্যক্তিও রোজা পালন করেন। রোজাদারগণ যাতে সুস্থ থেকে রোজা পালন করতে পারেন এবং ইফতার ও সাহরীতে স্বাস্থ্য সম্মত আহার করেন এসব বিষয়ে এবার ইত্তেফাকের স্বাস্থ্য পাতা সাজানো হয়েছে প্রখ্যাত লিভার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মবিন খানের নানা পরামর্শ নিয়ে।
কালেমা, নামাজ, রোজা, হজ্জ্ব ও যাকাত- এ পাঁচটি প্রধান স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে আছে ইসলাম। একজন ব্যক্তির প্রকৃত মুসলিম হওয়ার প্রাথমিক শর্তাবলী এগুলো। এর মধ্যে রোজা এমন একটি ইবাদত যা দীর্ঘ একমাস ধরে পালন করতে হয়। রমজান মাসে রোজা রাখা একজন মুসলমারে অবশ্য পালনীয় কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। রোজাকে আবশ্যক তথা ফরয করে আল্লাহ তাআলা কোরআনে সুরা বাকারার ১৮৩ নং আয়াতে বলেছেন: “হে ঈমানদারগণ, তোমাদের উপর রোজা ফরয করা হয়েছে যেমন ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যেনো তোমরা খোদাভীতি অর্জন করতে পার।”
রোজা পালন করতে গিয়ে মানুষ নিজের রিপু ও ক্ষুধাকে দমন করতে শিখে। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও যৌনইচ্ছাপূরণ থেকে নিজেকে বিরত রাখার মধ্য দিয়ে নিজের প্রবৃত্তির উপর নিয়ন্ত্রণ অর্জন করার যোগ্যতা তৈরী হয়। ফলে নিজের জীবনকে শৃংখলাপূর্ণ আচরণ ও পরিকল্পিতভাবে পরিচালনা করার প্রশিক্ষণও পাওয়া যায়। তদুপরি, রোজা এমন একটি ইবাদত যার প্রতিদান আল্লাহ তাআলা নিজে দিবেন বলে ঘোষণা করেছেন। হাদীসে কুদসীতে এসেছে, আল্লাহ বলেন, “রোজা আমার জন্য এবং আমিই এর প্রতিদান দেব”। সুতরাং রোজা যেমন একদিকে রহমত, বরকত ও নাজাতের বারতা নিয়ে আসে, তেমনি আসে যথাযথভাবে আদায়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির সুসংবাদ নিয়ে। মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সা)-এর কথার মধ্য দিয়ে আমরা জেনেছি, যে ব্যক্তি রমজান মাসে শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আখিরাতের কল্যাণ লাভের আশায় রোজা পালন করবে আল্লাহ তার পূর্ববর্তী সকল সগীরা গুনাহ মাফ করে দেবেন। কিন্তু রোজা রেখে মিথ্যা বললে, গীবত চর্চা করলে রোজা নষ্ট হয়ে যায়। রোজা দ্ব্বারা শরীর ও মনকে পবিত্র রাখার অন্যতম শর্ত হল জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে হালাল-হারামের বিধান মেনে চলা।
রোজা যে শুধু আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে তাই নয়, শারীরিক উন্নতি সাধনে রোজার কোন তুলনা নেই। বিশেষ করে আধুনিক যুগের ফাস্টফুড কালচারে অভ্যস্ত স্থূলদেহী তরুণ-তরুণী উপবাস থাকার প্রয়োজনীয়তা খুব ভালো বুঝে। শরীরের প্রয়োজনের অতিরিক্ত ওজন যেমন শারীরিক সৌন্দর্যের জন্য অপ্রীতিকর তেমনি ডায়াবেটিস, উচ্চ-রক্তচাপ, মেটাবলিক সিনড্রোম নামক জটিল ও দীর্ঘমেয়াদী ব্যাধির অন্যতম প্রভাবক।
এমনকি, পরিণামে ব্রেইন-স্ট্রোক ও হার্ট-এটাকের মত কঠিন অবস্থাগুলোর জন্য দায়ী এই অতিরিক্ত ওজন। আর দীর্ঘ একমাসে নিয়মমাফিক রোজা রাখলে ওজন পরিমিত পরিমাণে হ্রাস হবেই। কিন্তু, আমাদের দেশে রমজান মাস এলে ইফতার থেকে শুরু করে সেহরী পর্যন্ত খাওয়া-দাওয়ার যে ধুম পড়ে, রকমারী-বাহারী খাবার দাবার আয়োজনের যে অঘোষিত প্রতিযোগিতা শুরু হয় তা কি পুরোপুরি স্বাস্থসম্মত? আমরা এ প্রবন্ধটির মধ্য দিয়ে সে বিষয়টি জানতে চেষ্টা করবো। রমজানে এ অঞ্চলের খাদ্যাভ্যাস নিয়ে আলোচনা থাকবে এবং একই সাথে, যারা স্বল্প বা দীর্ঘমেয়াদী লিভার সমস্যা, ডায়াবেটিস, উচ্চ-রক্তচাপ, পেপটিক আলসার ও হাঁপানি রোগে ভুগছেন তাদের খাদ্যাভ্যাস কেমন হবে, তারা কিভাবে ওষুধ সেবন করবেন এবং তারা আদৌ রোজা রাখতে পারবেন কি না এ বিষয়েও আলোচনা থাকবে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মুসলিমরা একই নিয়ম মেনে রোজা পালন করেন। তবে স্থান, কাল, পাত্রভেদে খাবারদাবারের ধরণের তারতম্য লক্ষ্যণীয়। আমাদের এই আলোচনায় আমরা বাঙ্গালীদের খাবারের অভ্যাস নিয়ে আলোচনা করবো। তবে তার আগে আসুন সংক্ষেপে জেনে নেই রমজানে রোজার শারীরবৃত্তীয় উপকারিতাগুলো কি কি?
